পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের তৃতীয় দিনেও সহিংসতা

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে তৃতীয় দিনেও থামেনি সহিংসতা। রাজধানীর মিরপুরে সড়কে অবরোধ ঠেকাতে পারলেও দুটি পোশাক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর

2026-11-03T00:46:00+00:00
2026-11-03T00:46:00+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের তৃতীয় দিনেও সহিংসতা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৬ এএম 
সাভারে কাভার্ড ভ্যানে আগুন নেভানোর চেষ্টা। ছবি : সংগৃহীত
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে তৃতীয় দিনেও থামেনি সহিংসতা। রাজধানীর মিরপুরে সড়কে অবরোধ ঠেকাতে পারলেও দুটি পোশাক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গাজীপুরে পুলিশের তিনটি গাড়ি ভাঙচুর ও একটিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। আশুলিয়ায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে কাভার্ড ভ্যানে। 

মিরপুরে অবরোধের চেষ্টা ও ভাঙচুর : মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে গতকাল শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয় পুলিশ। পাশাপাশি টিয়ার গ্যাসের কয়েকটি শেল ছোড়ে তারা। পরে মিরপুর-২ নম্বরে শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকাতেও শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করেন। তাদেরও সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। এদিন সকাল থেকেই আন্দোলন দমাতে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে পুলিশের দাঙ্গা দমনের যান, জলকামানসহ বিভিন্ন যানবাহন প্রস্তুত রাখতে দেখা যায়।

তবে সড়কে নামতে না পারলেও এদিন দুটি পোশাক কারখানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় একটি কারখানা ভাঙচুরের পর আরেকটিতে সেখানকার শ্রমিকদের কাজ করতে দেখায় সেখানেও হামলা চালান আন্দোলনকারীরা। প্রতিষ্ঠান দুটির দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হামলার সময় প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মীরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন। পরে প্রতিষ্ঠানের সামনে আন্দোলনকারীরা জড়ো হয়ে হামলা চালান। তবে, হামলা-ভাঙচুরের আগ মুহূর্তে আন্দোলনকারীরা জড়ো হলে কর্মীদের ছুটি ঘোষণা করে কারখানা থেকে বের করে দেওয়া হয়। সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে মিরপুর-২ নম্বর বড়বাগ এলাকার সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড ও দেশওয়ান অ্যাপারেলস নামে দুটি পোশাক কারখানায় এমন ঘটনা ঘটে।

এদিকে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের দায় স্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া রাজিব চন্দ্র দাসকে আটক করেছে পুলিশ। গত রোববার রাতে রাজধানীর উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টর থেকে তাকে আটক করে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি খালিদ মনসুর বলেন, গতকাল রাতে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টর থেকে রাজিব চন্দ্র দাসকে আটক করা হয়েছে। মিরপুরে আন্দোলনের সময় পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় পল্লবী থানায় নির্দিষ্ট মামলা থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে পল্লবী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বলেন, মিরপুরে ট্রাফিক বক্স ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আজও কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার বিষয়ে পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে তার থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার বাদী পুলিশ। প্রতিটি মামলায় দুই থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে (অজ্ঞাতপরিচয়) আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

গাজীপুরে সহিংসতা ও গ্রেফতার : শ্রমিক আন্দোলনে গতকালও উত্তপ্ত ছিল গাজীপুরের দুটি মহাসড়ক। পরিস্থিতির কারণে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারখানার শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে একাধিকবার সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের তিনটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এতে সাংবাদিকসহ বিজিবির সদস্য আহত হয়েছেন।

সোমবার সকাল থেকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর পল্লীবিদ্যুৎ ও চন্দ্রা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। বেলা ১১টার দিকে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও বিজিবি ধাওয়া দিলে আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন।

অন্যদিকে দুপুর ১২টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর, ভোগড়া বাইপাস এলাকায় পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। এর আগে ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়কের সাইনবোর্ড ও মালেকের বাড়ি আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এর আগেও একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

অপরদিকে গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের চলমান অসন্তোষ ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

কালিয়াকৈর থানার ওসি সহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে নয়, বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সাভারের আশুলিয়ায়ও গতকাল বিক্ষোভ করছেন পোশাকশ্রমিকরা। পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করেন।

সকালে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্প-কারখানাগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সকাল ৯টার পর থেকে অস্থিতিশীল হতে থাকে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন এলাকার কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
দুপুর ১টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পুলিশ। পরে দুজনকে আটক করা হয়।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকালে কর্মবিরতি পালন করে নিউএইজ গ্রুপের কারখানার শ্রমিকরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানা থেকে বের হয়ে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানান। পরে তারা অন্য কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় ওই এলাকার বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে বিক্ষোভ করতে যান। সেখানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর থেমে থেমে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের এক সদস্য আহত হন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা হা-মীমের শ্রমিকদের বাইরে বের হওয়ার জন্য বলি। প্রশাসনের লোক সেখানে উপস্থিত ছিল। একপর্যায়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে। অনেক গ্যাস মেরেছে। অনেকে আহত হয়েছে।’


সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুলিয়ার জিরাবো এলাকা থেকে কাঠগড়া সড়কের পাশে বেঙ্গল প্লাস্টিক পাইপস লিমিটেডের কারখানার সামনে ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক বিক্ষোভ করেন। পরে তারা কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা জিরাবো থেকে কাঠগড়া সড়কের পাশে বিভিন্ন কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এসব কারখানার শ্রমিকদেরও বের হয়ে আসার আহ্বান জানান। এ সময় বেশ কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

এ দিকে সকাল ১০টার দিকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের ঘোষবাগ এলাকায় বিভিন্ন কারখানার সামনে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে তাদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে শ্রমিকরা সড়কে বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে অবরোধ করেন। পুলিশ ধাওয়া ও লাঠিপেটা করে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   পোশাকশ্রমিক  মজুরি বৃদ্ধি  আন্দোলন  সহিংসতা 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: