সংগৃহীত ছবিদীর্ঘদিনের পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী নীতি পুনর্বিবেচনা করছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হুমকি এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে নিহত হওয়ার আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২০০৩ সালে একটি ধর্মীয় নির্দেশ জারি করেছিলেন। এতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুমকির কারণে পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি পরিবর্তনের বিষয়টি এখন ‘বাস্তব একটি বিষয়’ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘অন্য পক্ষ সেই ব্যক্তিকে হত্যা করেছে, যিনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ধর্মীয় নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
তবে বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সবসময় শান্তিপূর্ণ ছিল এবং এখনো শান্তিপূর্ণ রয়েছে। ইরানকে হুমকি হিসেবে তুলে ধরার জন্য তিনি ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলকে দায়ী করেন।
বাঘাই জানান, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য রয়েছে এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তবে ইসরায়েল কখনো এতে স্বাক্ষর করেনি।
উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে ইরানের শর্তগুলোও পুনর্ব্যক্ত করেন বাঘাই। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের বৈধ দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া কিংবা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, আলোচনার টেবিলে ইরানের দেওয়া সাত দফা পরিকল্পনাই একমাত্র প্রস্তাব। এটি দুই দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়। একই সঙ্গে দেশটির নেতৃত্বের বড় একটি অংশকে হত্যা করা হয়। এরপর থেকেই ইরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি নিয়ে বিতর্ক চলছে।
বহু বছর ধরে ইরানের ঘোষিত অবস্থানের ভিত্তি ছিল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জারি করা ধর্মীয় নির্দেশ। ওই নির্দেশে গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে ইসলামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। নিজের অবস্থান সংক্ষেপে তুলে ধরতে তিনি বলেছিলেন, ‘সবার জন্য পারমাণবিক শক্তি, কারও জন্য পারমাণবিক অস্ত্র নয়।’ অন্য এক বক্তব্যে পারমাণবিক বোমাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলেও অভিহিত করেছিলেন তিনি।
তবে এখন ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই এই নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। গত সপ্তাহে তেহরানের অন্তর্বর্তীকালীন জুমার নামাজের ইমাম মোহাম্মদ জাভাদ হাজ আলি আকবারি এক খুতবায় পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি সংশোধন এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি একে ‘জাতীয় দাবি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কোনো সূত্র উল্লেখ না করেই তিনি দাবি করেন, জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরানের ৭০ শতাংশ মানুষ এই নীতি পরিবর্তনের পক্ষে। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব তৈরির আহ্বানও জানান তিনি। এসব প্রস্তাব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মোজতবা খামেনির কাছে জমা দেওয়ার কথা বলেন।
বাবার হত্যাকাণ্ডের পর মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশটির আইনপ্রণেতা আহমদ নাদেরি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো ও বোমা তৈরির পক্ষে কথা বলে আসছেন। তাঁর ধারণা, মোজতবা খামেনির অবস্থান তাঁর বাবার অবস্থান থেকে ভিন্ন হতে পারে।
নাদেরি বলেন, নীতি পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে ‘শহিদ নেতা ভুল ছিলেন’। বরং এর অর্থ হলো, ‘পরিস্থিতি বদলে গেছে। তখন আমাদের ওপর হামলা হয়নি, এখন হয়েছে।’
তবে ইরানের নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক নীতি পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আবার যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কি আগের সেই পুরোনো নীতিতেই থাকতে চাই?’ আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের সঙ্গে সহযোগিতা করার পরও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে কেন বোমা হামলা চালানো হয়েছে, তা নিয়েও দেশটির জনগণের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান তিনি।
রেজায়ি বলেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে এবং ওয়াশিংটন ইরানকে আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে ইরান তার সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
তিনি নিশ্চিত করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি তিনি পেয়েছেন। তবে এখনো এর জবাব দেননি। চিঠিটির ভাষা ও সুরে ‘সম্পূর্ণ পরিবর্তন’ এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ‘খুবই ভালো একটি লক্ষণ’।
তবে ইরানের সবাই মনে করেন না, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ দেশটির স্বার্থ রক্ষা করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাদের বাস্তানি সতর্ক করে বলেছেন, হঠাৎ করে পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবিতে যে সম্মিলিত আওয়াজ উঠেছে, তা ‘আবেগনির্ভর অবস্থান’। এতে মূলত শত্রুপক্ষের স্বার্থই রক্ষা হচ্ছে। এর ফলে ইরানকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের যৌক্তিকতা তৈরিতেও এটি সহায়তা করতে পারে।
বাস্তানি বলেন, ‘অন্যদের মনে ইরানকে নিয়ে ভয় তৈরি করে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত নয়।’ তাঁর মতে, এর পরিবর্তে তেহরানের উচিত পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার তুলে ধরা, যাচাইযোগ্য নিশ্চয়তা দেওয়া এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি পারমাণবিক জোট গঠনের প্রস্তাব সামনে আনা।
অন্যদিকে, ইরানি বিশ্লেষক কিয়োমার্স আশতারিয়ান এই বিতর্কের পেছনে থাকা প্রতিরোধমূলক যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পারমাণবিক বোমা তৈরি করা হলে তা ‘পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধে কাজে আসবে, প্রচলিত যুদ্ধ প্রতিরোধে নয়’। অর্থাৎ, সাধারণ যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য নয়, বরং ইরানের ওপর পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যেই এমন অস্ত্র তৈরি করা হতে পারে।
তবে এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার মুখেও পড়তে পারে দেশটি। তাঁর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে—এমন সম্ভাবনাও এখন আর পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মার্কিন সম্প্রচারক টাকার কার্লসনের একটি বক্তব্যের পর এই আশঙ্কা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বহুল প্রচারিত এক পোস্টে কার্লসন দাবি করেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘চাপের মুখে’ ট্রাম্প প্রশাসন ‘কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে’।
কার্লসনের লেখায় বলা হয়, হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পারমাণবিক স্থাপনা।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ