সংগৃহীত ছবিমৃগীরোগের ওষুধের মাত্রা কমাতে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ অনুসরণের পর যুক্তরাষ্ট্রে ৩১ বছর বয়সী এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনায় ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তার মা-বাবা। তাদের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি শুধু ওষুধের মাত্রা কমানোর পরিকল্পনাই দেয়নি, চিকিৎসকের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রাখতেও উৎসাহিত করেছিল। এ ঘটনায় চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পরামর্শের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
মৃত তরুণীর নাম বাওয়েন ওয়ান। ৩১ বছর বয়সী এই চীনা নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার পরিবারের দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটির দেওয়া চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকলে এই মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, বাওয়েন মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন। খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে তিনি ল্যামোট্রিজিন নামের ওষুধ সেবন করতেন। এই ওষুধে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে গত জানুয়ারিতে তিনি চ্যাটজিপিটির শরণাপন্ন হন।
বাওয়েনের আশঙ্কা ছিল, ওষুধ সেবনের কারণে তার কথা বলার দক্ষতা কমে যাচ্ছে। এতে চাকরির সাক্ষাৎকারে নিজের যোগ্যতা যথাযথভাবে তুলে ধরতে সমস্যা হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে তিনি ওষুধের দৈনিক মাত্রা কমানোর উপায় জানতে চান।
পরিবারের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি তাকে কয়েক সপ্তাহ ধরে ধাপে ধাপে ওষুধের মাত্রা কমিয়ে একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা দিয়েছিল। এমনকি ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ে রক্ত পরীক্ষা না করানোর সিদ্ধান্তেও চ্যাটবটটি সমর্থন দিয়েছিল।
ওষুধের মাত্রা কমানোর পর বাওয়েন বিভ্রান্তি, স্মৃতির অসংলগ্নতা ও শরীরে অস্বাভাবিক অনুভূতির কথা চ্যাটজিপিটিকে জানান। পরিবারের দাবি, এসব উপসর্গকে সম্ভাব্য বিপদের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত না করে চ্যাটবট তাকে আশ্বস্ত করেছিল। ওষুধের পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় এমনটা হতে পারে বলেও জানিয়েছিল।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মৃত্যুর দুই দিন আগে ১১ ফেব্রুয়ারি মাথাব্যথার কারণ জানতে চ্যাটজিপিটিকে বার্তা পাঠান বাওয়েন। জবাবে চ্যাটবট ব্যথাটিকে বিপজ্জনক নয় বলে উল্লেখ করে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
বাওয়েনের চিকিৎসক ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ নিকোলাস পুলুস জানিয়েছেন, রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনায় তিনি কখনোই তাকে ওষুধ বন্ধ করার পরামর্শ দিতেন না। তার মতে, কোনো ওষুধে রোগীর শারীরিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে থাকলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া সেটি বন্ধ করা উচিত নয়।
বাওয়েনের মা-বাবার দাবি, প্রেসক্রিপশনের ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন কিংবা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তে চ্যাটজিপিটির পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই কেউ যাতে ওষুধ পরিবর্তনে উৎসাহিত না হন, সে জন্য এআই চ্যাটবটের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে ওপেনএআই বাওয়েনের মৃত্যুর ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ ঘটনায় ব্যবহৃত চ্যাটজিপিটির সংস্করণটি পুরোনো ছিল। নতুন মডেলগুলো জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে, এমন পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।
বাওয়েনের মৃত্যুর ঘটনা এআইনির্ভর চিকিৎসা পরামর্শের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ তথ্য বুঝতে এআই সহায়ক হলেও চিকিৎসকের বিকল্প নয়। বিশেষ করে মৃগীরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা কমানো কিংবা বন্ধ করা গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান
সময়ের আলো/জোই