নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রচার দলের সদস্যদের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য নিচ্ছেন নর্থ ক্যারোলিনায় ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। ছবি : গালফ নিউজ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। একই সঙ্গে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথেও এগিয়ে রয়েছে দলটি। মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের এই অগ্রগতিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিএনএন ও সিএনবিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। এর ফলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ আটকে দেওয়ার পাশাপাশি তার প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে বড় পরিসরে তদন্ত চালানোর ক্ষমতা পাবে বিরোধী দল। প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দুই বছর এই নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ— এসব বিষয় নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য চাপ তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ট্রাম্পের জনসমর্থনও রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে।
নির্বাচনের অন্যতম বড় চমক ছিল দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও শিশু চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজের জয়। সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া গ্রাহাম তার ভাই ও দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর ওই আসনে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৮ সালের পর কোনো সিনেট নির্বাচনে জয় পায়নি ডেমোক্র্যাটরা।
এর আগে নর্থ ক্যারোলিনাতেও সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের হার হয়। সেখানে ট্রাম্পের পছন্দের প্রার্থীকে পরাজিত করেন জনপ্রিয় সাবেক গভর্নর রয় কুপার।
এদিকে জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট নেতা জন ওসফ এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারে ক্রিস পাপাস জয় পেয়ে নিজ নিজ দলের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট আসন ধরে রেখেছেন। সাবেক সিনেটর জন সুনুনুকে হারিয়েছেন পাপাস।
নির্বাচনের আগে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন নিট বাড়াতে হতো। ইতোমধ্যে রিপাবলিকানদের দুটি আসন নিজেদের দখলে নেওয়ার পরও উচ্চকক্ষের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ধারায় ‘ব্লু ওয়েভের’ ইঙ্গিত
প্রতিনিধি পরিষদের ফলাফলেও রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কার চিত্র উঠে এসেছে। সাধারণত রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাতেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।
ইন্ডিয়ানায় আলোচিত একটি আসনে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেডি ফোর্ড। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওই আসনে ট্রাম্প ১৭ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ওই আসনে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয়কে ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্যের আগাম সংকেত হিসেবে দেখেছিলেন।
নর্থ ক্যারোলাইনাতেও রিপাবলিকানদের দখলে থাকা প্রতিনিধি পরিষদের একটি আসন নিজেদের করে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে ফ্লোরিডার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে রিপাবলিকানরা যে সুবিধা পাওয়ার আশা করেছিল, তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
জর্জিয়ায় আটলান্টার সাবেক মেয়র ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে গভর্নর হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জর্জিয়ায় ২৪ বছরের রিপাবলিকান শাসনের অবসান ঘটেছে।
তবে রিপাবলিকানদের কিছু জয়ও এসেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর। ট্রাম্প-সমর্থিত বায়রন ডোনাল্ডস ফ্লোরিডার গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হয়েছেন তিনি। অন্যদিকে সিনেট আসন ধরে রেখেছেন রিপাবলিকান অ্যাশলি মুডি।
ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর জন ওসফ বলেন, এসব ফলাফল ট্রাম্পের ‘নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার’ বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রত্যাখ্যানের প্রতিফলন।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান ‘অনমনীয়’
নির্বাচনের ফল নিয়ে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের আশপাশের পরিবেশে ‘অনমনীয়’ মনোভাব রয়েছে। নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ট্রাম্প ‘উগ্র বামপন্থীদের’ বিরুদ্ধে অবস্থান অব্যাহত রাখবেন বলে সতর্ক করেন ওই কর্মকর্তা। তার ভাষায়, ‘প্রস্তুত থাকুন।’
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি ইরান যুদ্ধ, ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তদন্তের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন আইন পাসের উদ্যোগও বাধার মুখে পড়তে পারে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণও হারালে ট্রাম্পের বিচার বিভাগীয় মনোনয়ন এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হবে।
নির্বাচনী প্রচারে ভোটারদের কাছে দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় ছিল অন্যতম প্রধান বিষয়। লস অ্যাঞ্জেলেসের ২৪ বছর বয়সী ভোটার টেলর কুক এএফপিকে বলেন, ‘বাড়িভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ইউটিলিটি বিল এবং সম্পত্তিকর—সবকিছুর দাম বাড়ছে। আমি কংগ্রেসে এমন প্রতিনিধি চাই, যারা মানুষের ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।’
নির্বাচনের আগে মঙ্গলবার টেলিভিশনে দেওয়া শেষ সাক্ষাৎকারে নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি শুল্কনীতি, অভিবাসনবিরোধী অভিযান এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রশংসা করেন।
৮০ বছর বয়সী ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান রাখতে হবে। এখন আমরা মহান। দুই বছর আগে আমরা ভয়াবহ অবস্থায় ছিলাম।’
বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস যাওয়ার সম্ভাবনা আগেই বিবেচনায় নিয়েছিলেন ট্রাম্প। সোমবার প্রকাশিত এক পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সবকিছুতে ভেটো দিই।’ তবে পরে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও স্বীকার করেন তিনি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ