দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই বেঁচেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। গ্রাফিক : সময়ের আলো বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। দেশভাগের ক্ষত ঋত্বিক ঘটকের জীবন ও শিল্পচিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা তিনি আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। সেই ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, শেকড় হারানোর হাহাকার এবং দুই বাংলার বিচ্ছেদের স্মৃতি বারবার উঠে এসেছে তার চলচ্চিত্রে। দেশভাগের ক্ষতই যেন হয়ে উঠেছিল তার সৃষ্টির অন্যতম প্রেরণা।
ঋত্বিক ঘটকের সৃজনশীলতার শুরু কবিতা ও গল্প লেখার মধ্য দিয়ে। মানুষের প্রতি গভীর মমতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও প্রতিবাদের চেতনা তাকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। তিনি লিখেছেন-
‘মানুষ, তোমাকে ভালোবাসি।
এইভাবে পৃথিবীর ইতিহাস বারবার বদলে গেছে,
তবুও মানুষ সবসময় বেঁচেছে।
মানুষ, তোমাকে ভালোবাসি।’
‘আমাদের ফেলো না’ কবিতায় এভাবেই মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও জীবনবোধের কথা তুলে ধরেছেন ঋত্বিক ঘটক।
একসময় তিনি যুক্ত হন মঞ্চনাটকে। পরে সম্পৃক্ত হন গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে। সেখান থেকে পা রাখেন চলচ্চিত্রের জগতে। তার কাছে চলচ্চিত্র ছিল একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। তিনি বলতেন, ‘একসঙ্গে লক্ষ মানুষের কাছে নিজের কথা এখুনি বলতে চলচ্চিত্রই একমাত্র মাধ্যম।’
ঋত্বিকের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কখনো সিনেমার প্রেমে পড়েননি। বরং নিজের কথাগুলো যত কম সময়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, সেই মাধ্যমের সন্ধান করেছেন। চলচ্চিত্রের চেয়েও কার্যকর কোনো মাধ্যম পেলে সিনেমাকে ছেড়ে দিতেও তার আপত্তি ছিল না।
বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের শিল্পচিন্তা ও নির্মাণশৈলী দিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন স্বতন্ত্র এক জগৎ। প্রায় ৫০ বছরের জীবনে আটটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও শুধু সংখ্যার বিচারে তার শিল্পীসত্তাকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। ঋত্বিক ঘটকের কাছে চলচ্চিত্র ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। তিনি মনে করতেন, শিল্পীর প্রধান দায়িত্ব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য ছিল, ‘প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। শিল্প ফাজলামি নয়। যারা প্রতিবাদ করছে না, তারা অন্যায় করছে। শিল্প দায়িত্ব। আমার অধিকার নেই সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার। শিল্পী সমাজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সে সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে তবে সে ছবি করবে।’
ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রজীবনের অন্যতম ব্যতিক্রমী কাজ ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিকে তার আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র নীলকণ্ঠ বাগচী। একজন মাতাল বুদ্ধিজীবী এই চরিত্র নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করতে চান না। নীলকণ্ঠের ভূমিকায় অভিনয় করেন ঋত্বিক নিজেই। ছবিটিতে শুধু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলন নয়, উঠে এসেছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও। সময় ও সমাজের নানা অসংগতিকে নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক।
ছবির একটি দৃশ্যে লেখক সত্যজিৎ বসু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানান। জবাবে নীলকণ্ঠ বাগচী উপহাসের সুরে বলেন, ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’ ঋত্বিক ঘটকের এ কথা খুব বিখ্যাত।
এই কিংবদন্তি নির্মাতার জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার জিন্দাবাজারের হৃষিকেশ দাশ লেনের একটি বাড়িতে। তার পুরো নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। ডাকনাম ছিল ‘ভবা’। মা ইন্দুবালা দেবী। বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। চাকরির পাশাপাশি কবিতা ও নাটক লিখতেন। বাবা-মায়ের ১১ সন্তানের মধ্যে ঋত্বিক ছিলেন সবার ছোট।
শিক্ষাজীবনে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে আইএ এবং বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর কোর্সে ভর্তি হলেও পরীক্ষা না দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দেন।
তার বড় ভাই মনীশ ঘটক ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক, লেখক ও সমাজকর্মী। তিনি ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন এবং তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মনীশ ঘটকের মেয়ে মহাশ্বেতা দেবী পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও সমাজচিন্তক হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ঋত্বিকের পরিবার পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনা তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ- এই তিন ঘটনা ঋত্বিক ঘটকের জীবনদর্শন ও শিল্পচিন্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশভাগের কারণে শরণার্থী হয়ে কলকাতায় চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তার মধ্যে তৈরি হয় বিদ্রোহী মনোভাব। মানুষের দুর্দশা, বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা পরবর্তী সময়ে তার চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। তার সিনেমায় তাই ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি প্রতিফলিত হয়েছে একটি সময়ের সামষ্টিক অভিজ্ঞতা।
বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি ঋত্বিক ঘটক। দুই বাংলার মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আলাদা করে দেখার বিরোধিতা করতেন তিনি। দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষোভ কখনো কখনো প্রকাশ পেত তার কথাবার্তা ও আচরণে। একবার ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘মাতামাতি! বাংলাকে ভেঙে চুরমার করে দিল, আর মাতামাতি! বিক্ষুব্ধ সময়ে মুজরো করব? এটা বদমাইসি! চাই, খুব বেশি করে চাই দুই বাংলার সংস্কৃতিকে এক ফ্রেমে আঁটতে। প্রতিবাদ করাটা দরকার। কিন্তু শালা বুঝল না কেউ।’
এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দেশভাগ নিয়ে তার গভীর ক্ষোভ এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা। তার কাছে চলচ্চিত্র ছিল সেই প্রতিবাদ ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দেশভাগের বেদনা- সব মিলিয়েই গড়ে উঠেছিল ঋত্বিক ঘটকের স্বতন্ত্র শিল্পীসত্তা।
সময়ের আলো/মহু