সংগৃহীত ছবিতরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘উদ্যোগ’ নামে বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ কর্মসূচির আওতায় একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অনুদান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আবেদনকারীর সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৮ বছর নির্ধারণ করায় এ সুবিধা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন ৩০ ঊর্ধ্ব বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। তাদের দাবি, বয়সের সীমাবদ্ধতা শিথিল করে যোগ্যতা, দক্ষতা ও ব্যবসায়িক পরিকল্পনার ভিত্তিতে অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া হোক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে দেশের ৫৬ জেলার সব উপজেলায় এ কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। আগ্রহীরা ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে এবং যে উপজেলার জন্য আবেদন করবেন, সেই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। ব্যবসা করার পরিকল্পনা বা ভালো ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেই আবেদন করা যাবে; আগে থেকে ব্যবসা থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
তবে আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া ব্যক্তি, ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এ সুবিধা পাবেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বয়সসীমা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন শিবচরের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের চেয়ে আগ্রহ, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শিবচরের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ফয়সাল আহমেদ বলেন, আমি নিজের উদ্যোগে কিছু করতে চাই। কিন্তু যেকোনো ব্যবসা শুরু করতে গেলে প্রথমেই প্রয়োজন মূলধন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ আমাদের মতো মানুষের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। কিন্তু বয়স ২৮ বছরের বেশি হলে যদি আবেদন করার সুযোগ না থাকে, তাহলে আমরা কোথায় যাব? আমার মতো ৩০ ঊর্ধ্ব যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান, তাদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনার দাবি জানাই।
আবুল বাশার বলেন, আমি মনে করি, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বয়সের চেয়ে ইচ্ছা, যোগ্যতা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ ২৮ বছর বয়সেই ব্যবসা শুরু করতে পারেন, আবার কেউ ৩৫ বছর বয়সে এসে নিজের উদ্যোগ গড়ে তোলার সাহস ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। আমারও নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে অনেক কিছুই শুরু করা যাচ্ছে না। সহজ শর্তে ঋণ পেলে ব্যবসার পরিসর বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাই ৩০ ঊর্ধ্বদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রানা মিয়া বলেন, আমাদের মতো যারা নিজেরা কিছু করতে চান, তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পুঁজি। অনেক সময় ভালো পরিকল্পনা ও কাজ করার আগ্রহ থাকলেও টাকার অভাবে পিছিয়ে যেতে হয়। আমি চাই, নিজের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে স্বাবলম্বী হতে। কিন্তু বয়সের কারণে যদি ঋণ পাওয়ার সুযোগ না থাকে, তাহলে আমাদের জন্য এই উদ্যোগের সুফল পাওয়া কঠিন হবে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আমার অনুরোধ, বয়সের বিষয়টি বিবেচনা করে ৩০ বছরের বেশি বয়সীদেরও ঋণের সুযোগ দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি আবুল খায়ের খান বলেন, একজন শিক্ষার্থী ছাত্রজীবনেই উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে যদি ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে না পারেন, তাহলে তার সামনে কয়েকটি বড় সংকট তৈরি হতে পারে। একদিকে বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপ, অন্যদিকে লেখাপড়ায় বিঘ্ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে অল্প বয়সে এমন আর্থিক ঝুঁকি নেওয়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের এ সুবিধার আওতায় আনা হলে তারাও নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন। বেকারত্ব ও হতাশা থেকে অনেকে জীবিকার সন্ধানে ঝুঁকিপূর্ণ পথে, এমনকি সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। দেশে সহজ শর্তে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। তাই বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করে ৩০ ঊর্ধ্বদেরও অর্থায়নের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে শুধু বয়সকে মানদণ্ড না করে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, বাজার সম্পর্কে ধারণা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে ৩০ ঊর্ধ্ব বেকার ও চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য আলাদা অর্থায়ন সুবিধা চালু করা যেতে পারে।
তাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ ব্যাংক ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির বয়সসীমা পুনর্বিবেচনা করে ৩০ ঊর্ধ্বদের জন্যও অর্থায়নের সুযোগ উন্মুক্ত করবে। এতে একদিকে বেকার মানুষের আত্মকর্মসংস্থানের পথ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি।
সময়ের আলো/জোই