যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রুয়া রোমান। ছবি : মিডল ইস্ট আই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় পেয়েছেন হিজাব পরা পাঁচ মুসলিম নারী। ইসলামবিদ্বেষী প্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিদ্রূপের মুখেও নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন তারা। বিজয়ীদের মধ্যে চারজন অঙ্গরাজ্য সিনেটর এবং একজন কংগ্রেস প্রতিনিধি হিসেবে মার্কিন আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করবেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে তাদের এই অর্জনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটিতে ডানপন্থি গোষ্ঠী ও ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া মুসলিম নারী প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয়, পোশাক ও অভিবাসী পটভূমি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আক্রমণ করা হয়। রিপাবলিকান নেতাদের পাশাপাশি অনলাইনেও তাদের নিয়ে বিদ্রূপ ও নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়।
নির্বাচনের আগে মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল কট্টর ডানপন্থিদের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটি আশঙ্কা করেছিল, এ ধরনের প্রচারণায় মুসলিম ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। তবে এসব আশঙ্কা উপেক্ষা করে তরুণ ও প্রকাশ্যে মুসলিম পরিচয় তুলে ধরা প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে জনমত এবং ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের যে ঢেউ তৈরি হয়েছে, এই জয়কে তারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিজয়ী মুসলিম নারী প্রার্থীরা
রুয়া রোমান (জর্জিয়া) : জর্জিয়ার রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রুয়া রোমান। অঙ্গরাজ্যটির আইনসভায় প্রথম হিজাব পরা মুসলিম নারী হিসেবে স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালের ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে কমলা হ্যারিসসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের কাছে ফিলিস্তিনি বক্তা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান রুয়া।
আবের কাওয়াস (নিউইয়র্ক) : ফিলিস্তিনি অভিবাসী আবের কাওয়াস নিউইয়র্কের স্টেট সিনেটে যাচ্ছেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ওপর নজরদারির অংশ হিসেবে তার বাবা অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা আইসিইর হাতে গ্রেপ্তার হন। তিন বছর আটক থাকার পর তাকে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়। আইসিইর দমন-পীড়ন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নাগরিক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েই রাজনীতিতে এগিয়েছেন কাওয়াস।
নাবিলা সৈয়দ (ইলিনয়) : মাত্র ২৭ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাবিলা সৈয়দ রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এর মাধ্যমে ইলিনয় আইনসভায় নিজের আসন ধরে রেখেছেন তিনি। শিকাগো ট্রিবিউনের সমর্থন পাওয়া নাবিলা ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ওয়াশিংটনে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে লেখা একটি ঐতিহাসিক চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন।
মরিয়ম খান (কানেকটিকাট) : পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মরিয়ম খান কানেকটিকাটের স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। দলের প্রাথমিক নির্বাচনে একজন প্রভাবশালী নেতাকে হারিয়ে উঠে আসেন তিনি। এর আগে বিশেষ শিক্ষা সংক্রান্ত কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন মরিয়ম। কর্মস্থলে নিজের জন্মভূমির পতাকা রাখা নিয়ে রিপাবলিকানদের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, নিজের ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ দেশের প্রতি অঙ্গীকার কমে যাওয়া নয়।
ইলহান ওমর (মিনেসোটা) : সোমালি বংশোদ্ভূত মুসলিম নারী রাজনীতিক ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে টানা পঞ্চমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার এই নেত্রী ২০১৯ সাল থেকে কংগ্রেসে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন এবং প্রথম সোমালি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য। ফিলিস্তিনিদের অধিকার, অভিবাসীদের সুরক্ষা ও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কঠোর সমালোচনার কারণে তিনি মার্কিন রাজনীতিতে আলোচিত।
এই মুসলিম নারীদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় প্রতিনিধিত্বের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় ও অভিবাসী পটভূমির মানুষের অংশগ্রহণের নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ