আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ১৫ অক্টোবর রিয়াদে জোটের এক সংবাদ সম্মেলনে সিসিটিভি ফুটেজটি পর্দায় প্রদর্শন করা হয়। ছবি : এএফপিইয়েমেনে যুদ্ধ বন্ধ করতে সৌদি আরবের কাছে ৫১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং দেশটির বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করেছে ইরানপন্থি হুতি গোষ্ঠী। নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকিতে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও শহরগুলো ঝুঁকিতে পড়ায় রিয়াদ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলের পর হুতিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয় সৌদি আরব। সংঘাতের অবসান ঘটাতে আলোচনার সময় হুতিরা এসব দাবি জানায়।
আলোচনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কয়েক বছরের বিমান হামলা এবং ইয়েমেনে দীর্ঘদিনের অবরোধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই অর্থ চেয়েছে হুতিরা। তবে আলোচনায় ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নিয়ে বিভিন্ন পরিমাণের কথাও এসেছে। ফলে সম্ভাব্য আর্থিক সমঝোতার পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি ডলার হতে পারে।
তবে অর্থের দাবিই সৌদি আরবের একমাত্র উদ্বেগ নয়। হুতিরা ইয়েমেনের বৈধ শাসক হিসেবে সৌদি আরবের স্বীকৃতিও চায়। এমন স্বীকৃতি দিলে রিয়াদের সমর্থনপুষ্ট আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের দক্ষিণ সীমান্তে ইরানঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠীর অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতার ঘোষণা আসেনি। সৌদি আরবও প্রকাশ্যে কোনো দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানায়নি।
মদিনার দিকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি
এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার সৌদি আরব নতুন করে নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়ে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, হুতিদের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র মদিনা অঞ্চলের দিকে যাওয়ার সময় প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় পবিত্রতম শহর মদিনা এই অঞ্চলে অবস্থিত।
এ ছাড়া সৌদি কর্তৃপক্ষ লোহিত সাগর উপকূলের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ইয়ানবুতে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্কতা জারি করে। ইয়েমেন সীমান্তের কাছে শারুরাহ এলাকার বাসিন্দাদেরও জরুরি সতর্কবার্তা পাঠায় দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ।
এর আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার সৌদি আরব সফরের সময় রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার দাবি করেছিল হুতিরা। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে হুতিদের হামলার পরিধি বাড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
কেন ৫১ বিলিয়ন ডলার দাবি করছে হুতিরা
হুতিদের দাবি, সৌদি সামরিক অভিযান এবং ইয়েমেনের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে দেশটির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, প্রস্তাবিত ক্ষতিপূরণের অর্থ তা পূরণে ব্যয় করা হবে।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে হুতিদের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে সহায়তা দিতে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরব। পরবর্তী সময়ে সংঘাত কিছুটা কমে এলেও নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ায় সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি বেড়েছে।
এদিকে হুতিরা দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এডেনের দিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা সম্প্রসারণ করেছে। এডেন বর্তমানে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কার্যক্রমের কেন্দ্র।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, হুতি বাহিনী এডেন থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। এতে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন অবশিষ্ট ভূখণ্ড রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও সংঘাতকে নতুন কৌশলগত মাত্রা দিয়েছে। এই সংকীর্ণ জলপথ লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দাবি মেনে নিতে পারবে সৌদি আরব
রিয়াদের জন্য আর্থিক সমঝোতায় পৌঁছানো সৌদি ভূখণ্ডে হামলা কমানোর একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হুতিদের দাবি মেনে নিলে ভবিষ্যতে সামরিক চাপ সৃষ্টি করে আরও ছাড় আদায়ের প্রবণতা বাড়তে পারে।
সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাজেদ আল-মাধাজি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এমন একটি নজির তৈরি হওয়া, যেখানে হুতিরা সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে অতিরিক্ত ছাড় বা অর্থ আদায় করতে পারবে।
ইয়েমেনের শাসক হিসেবে হুতিদের স্বীকৃতি দেওয়ার রাজনৈতিক পরিণতিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সৌদি আরবকে। এমন সিদ্ধান্ত দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের ভবিষ্যৎ এবং সৌদি আরবের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করবে।
রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের সংঘাতের তুলনায় বর্তমানে সৌদি আরবের ঝুঁকি অনেক বেশি। বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার প্রভাব এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
সামরিক সহায়তা খুঁজছে রিয়াদ
হুতিদের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে সামরিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতার মুখে রয়েছে সৌদি আরব।
হুতি হামলা বাড়তে থাকায় আত্মরক্ষার পাশাপাশি আক্রমণাত্মক সামরিক সহায়তাও চেয়েছে দেশটি।
মিসর সৌদি আরবকে ইয়েমেন থেকে আসা হুমকি মোকাবিলায় সহায়তার জন্য সামরিক ভূমিকার অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুমোদনের দিকে এগোচ্ছে তুরস্ক। তবে এই উদ্যোগ এখনো হুতিদের বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণে রূপ নেয়নি।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে পাকিস্তান। নতুন করে সৌদি সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নিতেও রাজি হয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস ইরানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে ইয়েমেনের এই গোষ্ঠীকে সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধের আহ্বান জানান। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ