বেতন বাড়েনি, বেড়ে চলেছে বাসা ভাড়া

আদিল সরকার

জাতীয়

পঞ্চাশোর্ধ্ব রাবেয়া খাতুনের সংসারে দুই মেয়ে ও এক নাতি। মেয়েদের একজন বাকপ্রতিবন্ধী। অন্যজনের কোলে ১৪ মাসের শিশুসন্তান। এই চারজনের সঙ্গে

2026-11-06T00:43:02+00:00
2026-11-06T00:43:02+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
বেতন বাড়েনি, বেড়ে চলেছে বাসা ভাড়া
আদিল সরকার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
পঞ্চাশোর্ধ্ব রাবেয়া খাতুনের সংসারে দুই মেয়ে ও এক নাতি। মেয়েদের একজন বাকপ্রতিবন্ধী। অন্যজনের কোলে ১৪ মাসের শিশুসন্তান। এই চারজনের সঙ্গে একই কক্ষে থাকেন আরও এক মধ্যবয়সি নারী। বাড়তি কিছু আয়ের আশায় তাকে ওই কক্ষেই সাবলেট দিয়েছেন রাবেয়া।

পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রাবেয়া খাতুন। গৃহকর্মীর কাজ করেন তিনি। দুমুঠো অন্ন আর মাথা গোঁজার সামান্য আশ্রয়ের প্রয়োজন মেটাতে এক বাসা থেকে আরেক বাসায় ছুটতে হয় তাকে। দিন-রাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মাসে তার আয় হয় সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। তার এই সীমিত আয়ের বড় একটি অংশই চলে যায় ঘর ভাড়ায়। এক কক্ষের জন্য তাকে মাসে দিতে হয় সাড়ে আট হাজার টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে আলাদা বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ। সব খরচ মিটিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়েই চারজনের মুখে খাবার তুলে দিতে হয় তাকে।

গত রোববার দুপুরে বাসার সামনে নাতিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় রাবেয়া খাতুনকে। তখন বাড়তি বাসা ভাড়া, খাবারের খরচসহ নিত্যদিনের জীবনযাপনের নানা সংকট ও আক্ষেপের কথা এ প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন তিনি। এ সময় জরাজীর্ণ বাসাটির সামনে ছোট ছোট পায়ে হাঁটছিল ১৪ মাস বয়সি শিশুটি। তার পরনে ছিল না কোনো কাপড়। শিশুটির গায়ে অ্যালার্জির কারণে সৃষ্ট কয়েকটি লালচে দাগ দেখিয়ে রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘এই বাচ্চাটাকেও টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারি না। ছোট মানুষ, কতই না কষ্ট হয়!’

কিছুক্ষণ পর কথা হয় বাসা ভাড়া নিয়ে। বাড়ি ভাড়া ও সংসারের খরচ সামলাতে না পারার আক্ষেপ ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘খামুই বা কী, সবই তো বাসাত দিয়া দেওন লাগে। এই এক রুমের বাসা ভাড়া দিয়াই টাকা শেষ হইয়া যায়। আবার শুনতাছি, সামনে বছর ভাড়া বাড়াইব। আমাদের আর উপায় নেই। জীবনটা এই খেয়ে না খেয়েই পার করতে হবে। আমাদের কথা আর কে ভাবল!’

রাজধানীর কলাবাগান থানার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের নর্থ সার্কুলার এলাকার ওই বাসার বাড়তি ভাড়ার জাঁতাকলের চিত্রই শুধু এমন নয়। নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত— সব শ্রেণির মানুষকেই এই রাজধানীতে বাসা ভাড়া নিয়ে এমন অসহায় অবস্থায় পড়তে হয়। এদিকে নতুন বছরকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে নভেম্বরের শুরুতেই বিভিন্ন বাসায় টানিয়ে দেওয়া হয়েছে ভাড়া বৃদ্ধির নোটিস। কোথাও কোথাও ভাড়াটেদের হাতে দেওয়া হয়েছে ছোট্ট একটি নোটিস। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামলাতে এমনিতেই হিমশিম খাচ্ছেন ঢাকার লাখ লাখ পরিবার। এর মধ্যেই ভাড়া বৃদ্ধির নোটিস যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এদিকে বর্ধিত ভাড়া দিতে না পারলে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেওয়ার শর্তও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে কোনো কোনো নোটিসে।

রাজধানীর মিরপুর, কাজীপাড়া, শনিরআখড়া, হাতিরপুল, কলাবাগান ও কাঁঠালবাগান এলাকার বেশ কয়েকটি বাসায় খোঁজ নিয়ে এমন ভাড়া বাড়ানোর চিত্র পাওয়া যায়। ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে, এমন বেশিরভাগ বাসায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ থাকেন বলে জানা গেছে। তবে উচ্চমূল্যের বাসাগুলোতে ওঠার সময়ই ভাড়াটেদের সঙ্গে ভাড়া বাড়ানোর সময় নিয়ে চুক্তি হয়ে থাকে বলে জানা যায়।


মিরপুর ৬ নম্বর এলাকার বাসিন্দা তোফাজ্জল হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমাদের প্রতি বছরই এক হাজার টাকা করে ভাড়া অটো বাড়ানো হয়। এ ছাড়া অন্যান্য খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সার্ভিস চার্জও বাড়িয়ে নেয়। কোনো ফ্যাসিলিটিজ কিন্তু বাড়ে না। তাই এক হাজার টাকা কিন্তু কম না। আমার তো বেতন প্রতি বছর বাড়ে না। একবার বাড়লে আর চার-পাঁচ বছর খবর থাকে না।’

শনিরআখড়া এলাকায় ভাড়া থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী হুসাইন প্রতিবেদককে বলেন, ‘সামনের বছর থেকে বাসা ভাড়া বাড়াবে কি না, তার নোটিস এখনও পাইনি। তবে ইতিমধ্যে গত মাস থেকে বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে নিয়েছে বাড়িওয়ালা। তাই আশঙ্কা করছি, তারাও শিগগিরই অন্য বাসার মতো নোটিস দিয়ে দেবে। প্রতি বছর ভাড়া বাড়ালে আমরা টিকব কী করে? এগুলো নজরদারির আওতায় আনা দরকার।’

এদিকে কাজীপাড়া এলাকার নয়ন হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বছরের শুরুতে বলে কথা না, গত আগস্ট মাসেই ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। নিয়মিত এভাবে ভাড়া বাড়ালে কীভাবে হবে? আর কম খরচে থাকার জন্য ৮-১০ জন শিক্ষার্থী মিলে একটা বাসায় থাকি। তাও তারা কোনো বাড়তি সুবিধা না দিয়েই ঠিকই নিয়ম করে টাকা আদায় করে নেয়। বাড়িওয়ালাদের জন্যই মনে হয় এই ঢাকা শহর!’ এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও অনেক ভাড়াটেকে ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

এদিকে শহরে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ সাল থেকে থাকলেও তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ। আইন অনুযায়ী, বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সময় পরপর ভাড়া বাড়ানো যায়। তবে বার্ষিক ভাড়া সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বাসা ভাড়া নেওয়ার তারিখ থেকে অন্তত দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে ভাড়া বাড়ানো বেআইনি হলেও এসব নিয়ম মানছেন না অনেক বাড়িওয়ালা। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত গত চার বছরে দেশের গড় বাসা ভাড়া প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাসা ভাড়া বেড়েছে ৫.২৫ শতাংশ। এদিকে শুধু ঢাকা বিভাগেই বছরের ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫.৪৮ শতাংশ।

তবে বাড়িওয়ালারা বলছেন, তাদেরও বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়েছে। পানির মোটরপাম্প, লিফটের সার্ভিসিং, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল, রং করানোসহ সবকিছুর খরচই বেড়েছে। এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার বিষয়টিকে সামনে এনে ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন তাদের কেউ কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাড়ির মালিক বলেন, ‘সম্প্রতি বাসার মেইনটেন্যান্স খরচ কিছুটা বেড়েছে। এ ছাড়া বাজারের সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী। ভাড়াটেরা যেখান থেকে বাজার করেন, আমাদেরও একই জায়গা থেকে বেশি দামে বাজার করে খেতে হয়। সব মিলিয়ে আমাদেরও তো পোষাতে হবে।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, ‘নতুন বছরকে ঘিরে বাসা ভাড়া বাড়ানোর একটা প্রবণতা থাকে। আবার মালিকদেরও কস্টিংয়ের বিষয় আছে। ভাড়ার এই বিষয়টা মালিক ও ভাড়াটে— দুপক্ষেরই মিউচুয়ালিটির বিষয়। আর ওঠার সময় এগ্রিমেন্ট করে নিলে এসব সমস্যা কম হয়। এ ছাড়া বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে। যারা এই আইন ভঙ্গ করবে, তাদের বিষয়ে অভিযোগ পেলে ক্যাব ব্যবস্থা নেবে।’


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   বেতন  বেড়ে  বাসা ভাড়া 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: