কলাবতী শাড়ি বুনন করছেন রাধাবতী দেবী। ছবি : সময়ের আলো মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে মণিপুরি অধ্যুষিত প্রত্যন্ত গ্রাম ভানুবিল মাঝেরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রাধাবতী দেবী। ২০২৩ সালের এপ্রিলে বান্দরবান গিয়ে কলার তন্তু থেকে শাড়ি বুনন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে শাড়ি উপহার দিয়ে তিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। সে সময় প্রধানমন্ত্রী খুশি হয়ে তাকে ১ লাখ টাকা ও তার সঙ্গে থাকা অন্যদেরও সম্মাননা দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও তহবিলের অভাবে সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনা এখন বিলুপ্তির পথে। পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রশিক্ষণের অভাবে নতুন করে কাজ করতে পারছেন না তিনি।
রাধাবতী দেবী জানান, ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। অবিবাহিতা রাধাবতী দেবী থাকেন ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষক রঞ্জীত সিংহের পরিবারের সঙ্গে বাবার বাড়িতে। তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১০ জন। তিনি তাঁতবস্ত্র তৈরি করে সংসার চালাতে ভাইকে সহায়তা করেন। তিনি ১৯৭৫ সাল থেকে বাড়িতে টকটকি (বড় তাঁতে) মণিপুরি বস্ত্র বুনন করেন। তাঁতবস্ত্র তৈরিতে ১৯৮৬ সালে প্রথম ভারতের মণিপুরের ইম্ফলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। এরপর কমলগঞ্জের মাধবপুরে মণিপুরি ললিত কলা একাডেমিতে ২০১০ সালে দুইবার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখন মণিপুরি তাঁতবস্ত্র বুননে এলাকায় অভিজ্ঞ হয়ে গেছেন। মাফলার, ওড়না, শাড়ি, গামছা, থ্রি-পিস তৈরি করতেন। কোনো তাঁতবস্ত্র দোকানের চাহিদা আসলেই সে হিসেবে তৈরি করে দিতেন।
রাধাবতী দেবী আরও বলেন, গত ২০২৩ সালে বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরিজি তাকে বান্দরবানে নিয়ে যান। বলা হয় কলাগাছের সুতা দিয়ে একটি শাড়ি বুনন করে দিতে। প্রথমে এই সুতা দিয়ে শাড়ি বানানো যাবে না বললেও পরবর্তীতে কলাগাছের সুতা সঙ্গে এনে কমলগঞ্জে নিজ বাড়িতে তাঁত সুতার সঙ্গে মিশিয়ে প্রথমে একটি ওড়না বুনন করেন। এরপর নিজ বাড়ির তাঁত সঙ্গে নিয়ে বান্দরবান গিয়ে শুরু করেন শাড়ি বুনন। এক কেজি কলার সুতার সঙ্গে তাঁত সুতার সংমিশ্রণ করে ৩ জন সহযোগীর সহায়তায় টানা ১৫ দিনে কলার সুতার শাড়ি বুনন করে চমকে দিয়েছিলেন। শিল্পীর নামের অংশের মিল রেখে শাড়িটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘কলাবতী’। দেশে শাড়ির বাজারে নতুন যোগ হয় কলাগাছের সুতার শাড়ি।
সেই সময় মূলত বান্দরবান জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে কলা গাছ থেকে সুতা তৈরি, বিভিন্ন হস্তজাত শিল্পের পাশাপাশি শাড়ি বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সুতা তৈরি করার পর শাড়ি তৈরির জন্য কমলগঞ্জ থেকে তাঁতশিল্পী রাধাবতী দেবীকে নিয়ে গিয়ে ‘কলাবতী’ শাড়ি তৈরি করানো হয়েছিল। বান্দরবান জেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণে প্রথম শাড়ি বুনন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মাত্র ৯টি ‘কলাবতী’ শাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। একটি শাড়ি তৈরিতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় এবং ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়।
রাধাবতী দেবী জানান, সরকার বা ব্যক্তি উদ্যোগে কলাগাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরির কোনো প্রশিক্ষণ বা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে শিল্পটি অনেকটাই আলোর মুখ দেখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা আর হয়ে ওঠেনি। এই শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে ও বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার সহায়তা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, যে কলাগাছ থেকে সুতা বের হয়, এসব কলাগাছ আমাদের সিলেট অঞ্চলে নেই। বান্দরবানের পাহাড় থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে সুতা বের করা হয়। আমি এখন বিছানার চাদর তৈরি করি। এসব চাদর দেশে ও দেশের বাইরে বিক্রি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ওই বছর সেপ্টেম্বরে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া গ্রামের ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর নারীদের নিয়ে ২০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে ৩০ জন নারীকে কলাগাছ থেকে সংগ্রহ করা সুতা দিয়ে শাড়ি বুনন শেখানো হয়। এখানে ৪টি শাড়ি তৈরি করি। একই বছর বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা ৬০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে ৫০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ওখানে ৪টি শাড়ি তৈরি করেছিলাম। এরপর থেকে এই বিষয়ে আর কেউ কোনো খোঁজ করেনি।
বান্দরবান বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. শামীম আলম বলেন, কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরি পুরোপুরি বন্ধ আছে। আমরা দুই মাসের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। তবে এই প্রকল্পটি সাফল্য পায়নি, এজন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ থেকে শুরু করে সবকিছু অনেক বেশি ব্যয় হয়।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড থেকে জানা যায়, কলা গাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারে আনার জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। এজন্য দুই মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে তা বাজারে আনার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। একটি শাড়ি তৈরি করতে অনেক টাকা খরচ হয়। শাড়ি তৈরির পর আরামদায়ক ও মসৃণ হয় না। কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ি বাজারে আনতে সুতার মিশ্রণ, মসৃণতা ও খরচ কমানো নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এসিসিআর ও মার্কেটিং) রতন চন্দ্র সাহা বলেন, কলা গাছের সুতায় তৈরি শাড়ি এখনো বাজারে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। শাড়িটি বাজারে আনতে গবেষণার প্রয়োজন। একটি শাড়িতে কতটুকু কলা গাছের সুতা ব্যবহার হবে, এছাড়া অন্য সুতা কতটুকু ব্যবহার হবে তা সুস্পষ্ট হয়নি। এছাড়াও মসৃণ ও আরামদায়ক হতে হবে। এসব নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শুধু বান্দরবান নয়, এসব শাড়ি অনেকেই বানানোর চেষ্টা করছেন। তাঁত বোর্ডের কাছে যদি এ বিষয়ে কেউ সহযোগিতা চায় তাহলে আমরা সহযোগিতা করব।
সময়ের আলো/জোই