প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:০৭ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলোসরাসরি আরবি থেকে জাপানি ভাষায় প্রথম কুরআন অনুবাদ করেছেন যে মুসলিম, তার নাম মর রিওয়াইচি মিতা। ১৮৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাপানের ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের চোফু শহরে জন্মগ্রহণ করেন রিওয়াইচি মিতা। বৌদ্ধ পরিবারের সন্তান তিনি, পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছিল সামুরাই বংশের ঐতিহ্য। এই ছেলেটিই যে একদিন আরবি কুরআনকে জাপানি ভাষায় রূপ দেবেন এবং ইতিহাসে পরিচিত হবেন জাপানের প্রথম মুসলিম কুরআন-অনুবাদক হিসেবে, সেদিন তা কারও কল্পনায়ও ছিল না।
তরুণ বয়সে পেশাগত কাজে তিনি চীনে যান, আর সেখানেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। চীনা মুসলিম সমাজের সংস্পর্শে এসে তিনি দেখেন এক ভিন্ন জীবনচর্চা; মসজিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা পাড়া, দিনে পাঁচবার নামাজের আহ্বান, বাজারে হালাল খাবারের আয়োজন। কৌতূহল শুধু ধর্মতত্ত্বে আটকে থাকেনি। এই মানুষগুলোর বিশ্বাস, মূল্যবোধ আর দৈনন্দিন জীবন তাকে গভীরভাবে টানতে থাকে। দেশে ফিরে তিনি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং জাপানের মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বছরের পর বছর অনুসন্ধানের পর ১৯৪১ সালে বেইজিংয়ে, আটচল্লিশ বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নাম রাখেন ওমর। ইসলাম যে সমাজে প্রায় অপরিচিত, সেখানে বড় হয়ে জীবনের মধ্যবয়সে এসে বিশ্বাস বদলানো কোনো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না।
ইসলাম গ্রহণের পর ওমর মিতা তার জীবনের বড় একটি অংশ ব্যয় করেন ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামের পরিচয় তুলে ধরা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নয়নের কাজে। ১৯৫৭ সালে তিনি পাকিস্তান সফর করেন, সেখানে ইসলামের জ্ঞান আরও গভীরভাবে অর্জন করেন এবং আরবি ভাষা শেখায় মনোযোগ দেন। পরের বছর ১৯৫৮ সালে তিনি হজ পালন করেন। এরপর ১৯৬০ সালে জাপান মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি সাদিক ইমাইজুমির মৃত্যু হলে ওমর মিতা সংগঠনটির দ্বিতীয় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ঠিক এ সময়েই তিনি হাত দেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজে। জাপানি ভাষায় কুরআনের অনুবাদ তখন একেবারে নতুন ছিল না। ১৯২০, ১৯৩৭, ১৯৫০ ও ১৯৫৭ সালে বিভিন্ন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই কোনো মুসলিমের করা নয়, আর বেশিরভাগই ছিল ইংরেজি অনুবাদের ওপর নির্ভর করে লেখা। ফলে জাপানি পাঠক কুরআনের কাছে পৌঁছাতেন অন্যের চোখ দিয়ে, মূল আরবির সরাসরি স্পর্শ ছাড়াই। ওমর মিতা সিদ্ধান্ত নেন, মূল আরবি থেকে একজন মুসলিম হিসেবে তিনি নিজেই এই কাজ করবেন।
প্রায় ১৯৬০ সালে শুরু হওয়া এই কাজের পাণ্ডুলিপি সম্পন্ন হয় ১৯৬৮ সালে। তবে তখনও পথ বাকি ছিল। আরবি ভাষা ও ইসলামি শাস্ত্রে দক্ষ পণ্ডিতদের হাতে পাণ্ডুলিপির যাচাই ও সংশোধনের কঠিন ধাপ পেরোতে হয়। মক্কাভিত্তিক মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনুবাদটি পরীক্ষিত হয় এবং পরে ছাপার কাজ সম্পন্ন হয় হিরোশিমায়। অবশেষে ১৯৭২ সালের ১০ জুন আরবি পাঠসহ জাপানি অনুবাদের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তখন তার বয়স ঊনআশি বছর। প্রায় এক যুগের নীরব সাধনার ফল পৌঁছে যায় পাঠকের হাতে, আর জাপানি ভাষাভাষী মুসলমান ও সাধারণ পাঠক প্রথমবারের মতো একজন মুসলিমের করা অনুবাদে মাতৃভাষায় কুরআনের অর্থ বোঝার সুযোগ পান।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই