ছবি : সংগৃহীত পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলার বাদী এবং এক আসামির কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অডিওতে শোনা যায়, মামলার এক আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে নগদ টাকা দাবি করেছেন বাদী।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে ফেসবুকে অডিওটি প্রকাশ করা হলে তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল হওয়া এই অডিও নিয়ে জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া অডিও মামলার বাদী উপজেলা মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক মো. মানিক মৃধা এবং মামলার ১৯ নম্বর আসামি মো. সুমন আল মামুনের (সুমন ফকির) কথোপকথন বলে জানা গেছে। মানিক মৃধা উপজেলার সদর ইউনিয়নের কলাতলা গ্রামের মৃত আশরাফ আলী মৃধার ছেলে এবং সুমন ফকির উপজেলার বানিয়ারী গ্রামের রিয়াদুল ইসলামের ছেলে।
ভাইরাল হওয়া অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, সুমন ফকির প্রথমে ফোন করে কুশল বিনিময় করে বলেন, ‘ভাই, আপনি যখন মোটরসাইকেল চাইছিলেন, তখন আমার কাছে কোনো টাকাপয়সা ছিল না। একটা গাড়ি দেখছি ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকার মধ্যে; এখন কালকে পাঠিয়ে দেবো, না কি ক্যাশ দিয়ে পাঠিয়ে দেবো?’
উত্তরে মানিক মৃধা বলেন, ‘তোমার নাম যে ওই জায়গায় আছে, তা আমি জানলে তোমার নাম ঢুকতেও দিতাম না। তুমি এতে কী দিলা আর কী না দিলা, সেটা বড় কথা না। ওদের উদ্দেশ্য হয়েছে তোমারে এদিকে আনা, এই যুক্তি আটছে ওরা। এই মামলার বাদী হইলাম আমি। এটা আমি জানলে তুমি কি মনে কর, জীবনে আমি সই করি? লগে ওসি সাহেবের অলরেডি কথা হইছে। আমারে ওসি সাহেব বলছে, এটা যে কোনো কায়দায় উনি ম্যানেজ করে দেবেন। আমারে তিনি আশ্বস্ত করেছেন। আমি ওনাকে কইছি, এ তো দেশেই থাকে না, ফাও ফাও দাপড়াইয়া লাভ কী? ওর চেয়ে কয়টা টাকা নিয়া ভাগেন। কারণ আপনি জীবনে কোনো দিন ধরতেও পারবেন না, ও তো থাকে ময়মনসিংহে না হয় টাঙ্গাইলে। এসব বাদ দিয়া কয়টা টাকা আনি—কয়, ভাই ঠিক আছে, এটা একটা সিস্টেম কোরবানি। আমি কথা দিলাম তো, এ মামলায় আপনার নাম থাকবে না।’
প্রত্যুত্তরে সুমন ফকির বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে ভাই, এখন কী গাড়ি নিবেন? পালসার দেবো না প্লাটিনা দেবো?’
জবাব দিয়ে মানিক বলেন, ‘গাড়ি আছে কোন জায়গায়, এটা দেখছেন?’ সুমন ফকির বলেন, ‘গাড়ি আছে ঘোনাপাড়া শোরুমে, দেখছি ১ লাখ ২০ হাজার দাম। আপনি তো আগে চাইছিলেন, এটার দাম ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা। ওই গাড়ি চালানোর দরকার নাই। আপনার এখন পালসার দেবো নাকি টাকা দেবো?’
প্রত্যুত্তরে মানিক বলেন, ‘গাড়ি না, টাকা দিলে ভালো হয়। এদিকে একখান দেখছি ৯৫ হাজার টাকা দাম চাইছে পালসার, নজরুল ইসলাম (জেলা বিএনপির আহ্বায়ক) যে গাড়িতে চলে হেইডা। তোমারে কথা দিলাম, মামলায় তোমার নাম থাকবে না।’
জানা গেছে, গত ৩০ অক্টোবর রাতে ৩৫ জন আসামি ও ৪৫ থেকে ৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে নাজিরপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন মানিক মৃধা। মামলার বিবরণে বলা হয়, উপজেলার ৪ নম্বর দীর্ঘা ইউনিয়নের দীর্ঘা ব্রিজের ওপর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের লোকজন সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল ও দেশবিরোধী স্লোগান দেয়। এ ছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, কাজে বাধা এবং সরকার পতন, বাংলাদেশের অখণ্ডতা, জননিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার লক্ষ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে।
অভিযুক্ত মো. সুমন আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
মামলার বাদী মানিক মৃধার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না, এগুলো ষড়যন্ত্র। আপনি বানিয়ারী বাজারে গেলে সব বুঝতে পারবেন। আমি তার কাছে গাড়ি চাইনি, সে অ্যাডভান্স হয়ে আমাকে গাড়ি দিতে চেয়েছে। তখন আমি বলছি, গাড়ি লাগবে না, আমারে টাকা দেন। তবে ওসি সাহেব আমাকে কোনো টাকাপয়সার কথা বলেননি যে টাকা আনেন, মামলা থেকে বাদ দেবো। তিনি আমার কাছে কোনো টাকার কথা বলেননি, আমি নিজেই বলছি।’
নাজিরপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. আবু হাসান খান বলেন, ‘এরা দুজনই খারাপ— বাদী এবং আসামি সুমন ফকির। সে প্রলোভন দেখাইছে আর বাদী লোভে পড়ছে, দুজনই খারাপ লোক।’
নাজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার পর আমার সঙ্গে বাদীর কোনো কথা হয়নি। মামলার পর বাদী কার সঙ্গে কথা বলবে, সেটা তো আমাকে জিজ্ঞেস করে বলবে না। ভিডিওটি আমি দেখেছি।’
পিরোজপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমার মনে হয়, ওসি সাহেব মামলাটা ইনকোয়ারি না করেই রেকর্ড করেছেন। ৩০ তারিখের যে ঘটনা দেখাইছে, সেখানে কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। তবে মামলার যেসব আসামি দেওয়া হয়েছে, তা বেশির ভাগই ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোন্দলের কারণে মামলার উদ্দেশ্যই খারাপ, ফলাফলও খারাপ, এ মামলার কোনো মেরিট নাই। যাদের আসামি দিয়েছে, তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে।’
সময়ের আলো / আতা