প্রকৃতি বাঁচলে মানুষও বাঁচবে। এটি সেøাগান নয়, বাস্তবতা। আর প্রকৃতি মানেই তো অরণ্য। বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে প্রকৃতির নিয়মেই সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের অরণ্য। যেগুলো মানুষের বেঁচে থাকার অনিমেষ উৎস হিসেবেই কাজ করে। বিশে^র এমন সব বিখ্যাত বন নিয়েই এবার লিখেছেন মাহমুদুল হাকিম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন
বিশে^র বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবনকে নিয়ে বাঙালির অহঙ্কার আকাশ ছোঁয়া। সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশে^র প্রাকৃতিক বিষয়গুলোর অন্যতম। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাজুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশে^র সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে। সুন্দরবনকে জালের মতো জড়িয়ে রয়েছে নদী, সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ছোট দ্বীপমালা। মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। বনভূমিটি, স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানা ধরনের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি। সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ^ ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সুন্দরবনকে বলা হয় প্রাকৃতিক ঢাল। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব সুন্দরবনই সবার আগে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে আটকায়।
কিনাবালু ন্যাশনাল পার্ক
মালয়েশিয়ার প্রথম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হলো কিনাবালু ন্যাশনাল পার্ক। এই এশিয়ান ফরেস্ট হলো পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম একটি প্রাকৃতিক অরণ্য। এখানে সারা বছর তাপমাত্রার খুব একটা তারতম্য হয় না। দুর্ভাগ্যবশত এ বনাঞ্চলগুলো অতীতে যে রকম ঘন ছিল বর্তমানে সে রূপ আর দেখা যায় না। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, অ্যামফিবিয়ান এবং সরিসৃপদের বাসস্থান এ বনভূমি। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ইকো-সিস্টেমের অংশ হলো এশিয়ার এ বনভূমি। এ রেইন ফরেস্টের জলবায়ু মোটামুটি স্থির থাকে এবং সারা বছরের গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপগুলোর পূর্ব উপকূলে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়। তবে এ অঞ্চলগুলোতে শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
কঙ্গো রেইন ফরেস্ট
এ বনাঞ্চল মধ্য আফ্রিকার ক্যামেরুন, নিরক্ষীয় গিনি, গ্যাবন, কেন্দ্রীয় আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র এবং কঙ্গো প্রজাতন্ত্রজুড়ে বিস্তৃত। আফ্রিকার লাখ লাখ মানুষের জীবিকার জোগান দিচ্ছে এ কঙ্গো রেইন ফরেস্ট। বিশেষত গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এ রেইন ফরেস্টের ওপর নির্ভর করে তাদের খাবার, আশ্রয় এবং ওষুধের জন্য।
১.৫ মিলিয়ন বর্গমাইলজুড়ে অবস্থিত এ রেইন ফরেস্টটি পৃথিবীর সব রেইন ফরেস্টের সম্মিলিত আয়তনের ১৮ ভাগ। বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী কঙ্গো এ রেইন ফরেস্টের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে। তবে ধীরে ধীরে এ অরণ্যের গরিলা ও বনোবোর মতো অনেক প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ বাণিজ্যিকভাবে কাঠ সংগ্রহ,
কৃষিকাজের জন্য বন উজাড়, গাছ কেটে রাস্তা তৈরি ইত্যাদি। এ রেইন ফরেস্টের ৫০ মিলিয়ন হেক্টর অঞ্চলকে কাঠ সংগ্রহের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে অনুমান করা হচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ কঙ্গো রেইন ফরেস্টের ৩০ ভাগ বিলীন হয়ে যাবে যদি না বৃক্ষ নিধনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা হয় বা বাণিজ্যিক কাঠ সংগ্রহ কমানো হয়। এখানে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৭০০ প্রজাতির মাছ, এক হাজার প্রজাতির পাখি রয়েছে। এখানে যেসব বন্যপ্রাণী আছে তার মধ্যে শিম্পাঞ্জি, বন্যহাতি, গরিলা, কঙ্গো ময়ূর, ওকাপি ও স্থল প্যাঙ্গোলিন অন্যতম। তবে এসব প্রজাতির মধ্যে অদ্বিতীয় প্রজাতি হচ্ছে ওকাপি। এটি দেখতে কিছুটা জেব্রার মতো। এ অরণ্যে আনুমানিক ১০ থেকে ২০ হাজার ওকাপি রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পৃথিবীর আর কোথাও এই বিরল প্রাণী নেই। এ ছাড়াও এই অরণ্যের অনেক বড় একটা অংশজুড়ে বিচরণ করছে মাংসাশী আফ্রিকান চিতাবাঘ। চিতাবাঘের চেয়ে আকারে ছোট কিন্তু অনেক ভয়ানক আরেকটি মাংসাশী প্রাণী হলো আফ্রিকান সোনালি বিড়াল। আফ্রিকান হাতির দাঁতের মূল্য সাভানা অঞ্চলের হাতির দাঁতের তুলনায় অনেক বেশি।
আমাজন অরণ্য
আমাজন বনাঞ্চল মানে পৃথিবীর ফুসফুস। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেইন ফরেস্ট। উদ্ভিদ ও ও প্রাণীবৈচিত্রে পৃথিবীতে আমাজনের ধারে কাছেও কেউ নেই। আজও আমাজনের বহু জায়গা অনাবিষ্কিৃত। আমাজন বনাঞ্চলের রহস্য এখনও টানে প্রাণী ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীবিধৌত অঞ্চলে অবস্থিত বিশাল এ বনভূমি দখল করে আছে ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা। তার মধ্যে ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার আর্দ্র জলবায়ু বেষ্টিত। আমাজন অরণ্যের ৬০ ভাগ রয়েছে ব্রাজিলে, ১৩ ভাগ রয়েছে পেরুতে এবং বাকি অংশ রয়েছে কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা সুরিনাম এবং ফরাসি গায়ানায়। পৃথিবীজুড়ে রেইন ফরেস্টের অর্ধেকটাই আমাজনের দখলে। বিশাল আমাজন বনের ভিতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জলাশয়সহ বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া বিশে^র দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী আমাজনে কমপক্ষে ৩ হাজার প্রজাতির মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী বাস করে। আমাজন বিশাল সাপ অ্যানাকোন্ডা, শ্লথ, জাগুয়ার এগুলোর জন্য বিখ্যাত। বিশে^র প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যে নির্বাচনে প্রথম স্থান পাওয়া আমাজন বন প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে কার্বনডাই অক্সাইডকে অক্সিজেনে রূপান্তর করে বলে এর পরিবেশগত গুরুত্বও কম নয়। গোটা পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন উৎপাদন করে আমাজন। আর এ জন্যই এটি পৃথিবীর ফুসফুস।
ফ্রান্সিস দে ওরেলানা নামের এক স্প্যানিশ পর্যটকই প্রথম আমাজন নদী ধরে পৌঁছে যান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই রেইন ফরেস্টে। এই বনের বুক চিরে বয়ে গেছে আমাজন নদী। যে নদী প্রতি সেকেন্ডে ৪.২ মিলিয়ন ঘন ফুট পানি ফেলে সাগরে। ছোট পোকা-মাকড় আর রঙ-বেরঙের পাখিতে সমৃদ্ধ এ বনের প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যও গবেষকদেরও বিস্মিত করে। প্রায় ৪০০-এর বেশি আদিবাসী গোষ্ঠীর বসবাস এ বনে। সোনার শহর ‘এল ডোরাডোর’ খোঁজে শত শত বছর ধরে এ বনেই ছুটে এসেছেন অভিযাত্রীরা। রহস্য আর রোমাঞ্চই আমাজনের আসল সৌন্দর্য।
জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্ট
বন সবুজ, তবে নাম কালো বন বা ব্ল্যাক ফরেস্ট। এর অবস্থান জার্মানিতে। জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পর্বতময় এ বনভূমির নাম ব্ল্যাক ফরেস্ট বা কালো বন রাখা হয়েছে এ বনের অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে। এক অনাবিল পরিবেশের সমারোহ ঘটেছে এ বনে। এ অরণ্য মোট ১৫০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে বেষ্টিত। এখানকার সর্বোচ্চ পর্বতের চূড়া ফেন্ডবাগরাউর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪৯৩ মিটার। এ বনের গা ঘেঁষে থাকা বৃহৎ আকারের পর্বতগুলো মূলত বেলে পাথরের তৈরি। পর্বতগুলোর মধ্যে অন্যতম আরও কয়েকটি হচ্ছে হেরজোজেনহর্ন, বেলচিন, স্কাউইন্সল্যান্ড, ক্যানডেল, হোচব্লাউইন, হরনিসগ্রিন্ড।
এ বনাঞ্চলে রয়েছে অপরূপ সৌন্দর্যের কয়েকটি নদী। যেগুলোর অন্যতম দানিয়ুব, দ্য ইনজ, দ্য কিনজিগ, দ্য মুরগ, দ্য নেগোল্ড, রেনচ। অন্যান্য বনের মতো এখানেও মানুষ নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করে একে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে এখানে এক ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। যার ফলে ১০০ একর বনভূমি তছনছ হয়ে গেছে। ব্ল্যাক ফরেস্ট জার্মানির একটি জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে আসে।