যুদ্ধদিনের স্মৃতি

রুদ্রনীল চৌধুরী

আনন্দ সময়

রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার পাঠাতাম -আলী যাকের অভিনেতাগানে গানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জোগাতে কজন গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর অবদান ছিল অপরিসীম। সে

2019-12-12T00:00:00+00:00
2019-12-11T23:01:02+00:00
 
  রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬,
১৪ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
আনন্দ সময়
যুদ্ধদিনের স্মৃতি
রুদ্রনীল চৌধুরী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম  আপডেট: ১১.১২.২০১৯ ১১:০১ পিএম
রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার পাঠাতাম
-আলী যাকের অভিনেতা
গানে গানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জোগাতে কজন গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর অবদান ছিল অপরিসীম। সে সময়ের গানগুলোকে মুক্তির গান, যুদ্ধ দিনের গান নামে পরিচিত। এ গানগুলো শুধু যুদ্ধকালীন সময়েরই নয়, বরং বাঙালির অনন্ত জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। এ গানগুলো প্রতি মুহূর্তেই এ জাতিকে নিয়ে যায় ওই সময়ের কাছাকাছি, মানুষের অনুভূতির উপকূল ছাপিয়ে যায় ভালোবাসায়, দ্রোহে, সংগ্রামের চেতনায়।
পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই দখল করে নেয় ঢাকাসহ পূর্বপাকিস্তানের সব গণমাধ্যম। কিন্তু চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি তখনও পুরোপুরি দখলে নিতে পারেনি। তখনকার কলাকুশলীদের ১০ জন তরুণ বিপ্লবী তখন ১০ মেগাওয়াট ট্রান্সমিটারটি দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি...’। আর এ বেতার শুধু দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি, যুদ্ধের অবস্থা, নেতার ভাষণ প্রচার করেই ক্ষান্ত হতো না। যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখত এসব গান। সে সময়ের স্টুডিওতে তৈরি ও প্রচার হতো হাজারও গান। শিল্পী ছিলেন প্রায় ১২০ জনের মতো। এদের মধ্যে ছিলেন সানজিদা খাতুন, রথীন্দ্রনাথ রায়, কাদেরী কিবরিয়া, প্রবাল চৌধুরী, ফকির আলমগীর, উমা খান, স্বপ্না রায়, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, তপন মাহমুদ, কুইন মাহজাবীন, মিতালী মুখার্জি, মালা খুররম, মৃণাল ভট্টাচার্য, রফিকুল আলম, রুপা ফরহাদ, শাহীন সামাদ, রিজিয়া সাইফুদ্দিন প্রমুখ। আর সুরকার ও শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সমর দাস, অজিত রায়, আপেল মাহমুদ, আবদুল জব্বার, সুজেয় শ্যাম প্রমুখ। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে...’ গেয়েছিলেন স্বপ্না রায়, আপেল মাহমুদ করেন ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থেকে সম্প্রচারিত হতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’, যা পরে জাতীয় সঙ্গীত রূপে গৃহীত হয়। এ ছাড়া ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘বাঁধ ভেঙে দাও’, ‘নাই নাই ভয়’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ গানগুলোও ছিল উল্লেখযোগ্য প্রেরণা সঙ্গীত। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘শেকল পরা ছল’, ‘ধূমকেতু’, ‘খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’, ‘কারার ওই লৌহ কপাট’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, আবুল কাশেম সন্দ্বীপের লেখা ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’, সলিল চৌধুরীর ‘বিচারপতি তোমার বিচার’, আবদুল জব্বারের ‘হাজার বছর পরে’, শহীদ ইসলামের ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘তারা এ দেশের সবুজ ধানের শীষে’, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘শৃঙ্খল ভাঙা সুর বাজে পায়ে’, শহীদুল্লা কায়সারের ‘আমার পূর্বে পশ্চিমে’, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, সত্যেন সেনের ‘আজ সপ্ত সাগর’, মোস্তাফিজুর রহমানের ‘ভেবো না গো মা’, আবু বকর সিদ্দিকের ‘ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল’, সরদার আলাউদ্দীনের ‘রুখে দাঁড়াও’, সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘হে মহামানব একবার এসো ফিরে’, জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা’, আলী মহসীন রাজার ‘ছোটদের বড়দের’, দিলওয়ারের ‘এই রে চাষি’, বিশ^প্রিয়র ‘আজ রণসাজে বাজিয়ে বিষাণ’, হরলাল রায়ের ‘ও বাগলারে কেন বা আলু’, গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের ‘শোন একটি মুজিবরের’, ফজল-এ-খোদার ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, গোবিন্দ হালদারের ‘পূর্ব দিগন্তে’, নাইম গওহরের ‘নোঙ্গর তোল তোল’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘জনতার সংগ্রাম চলবে’, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ‘আমারও দেশেরও মাটিরও গন্ধে’, নাইম গওহরের ‘সাগর পাড়িতে’ এবং ‘জন্ম আমার ধন্য হলো’, আনোয়ার কবীরের ‘হাজার ভাইয়ের বিয়োগ ব্যথায়’, শহীদুল ইসলামের ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’ এবং ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’, খাজা সুজনের ‘বাংলার স্বাধীনতা আনলো কে’, আবদুল লতিফের ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা’, সুব্রত সেনগুপ্তের ‘রক্ত চাই’, মাকসুদ আলী সাঁইয়ের ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের’, আকতার হোসাইনের ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে’, বিশ^প্রিয়র ‘আহা ধন্য আমার’সহ অসংখ্য গান। এ গানগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদই শুধু নয়, বরং এগুলো বিভিন্ন জাতীয় সঙ্কটেও আমাদের উজ্জীবিত রাখে।


১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের হয়ে কাজ করি। আমার কাজ ছিল বিভিন্ন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে ঘোরাঘুরি করা আর


যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ছদ্মনামে সংবাদ পড়তাম
 -সৈয়দ হাসান ইমাম নাট্যব্যক্তিত্ব
প্রায় ৪৮ বছর আগের কথা। সে কথা মনে পড়লে গা ছমছম করে ওঠে। আমরা যে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তা আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গঠিত হয় শিল্পীদের প্রতিবাদী সংগঠন বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতারে যোগ দেই। আমি ছিলাম আহ্বায়ক। সবাই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাকিস্তান বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান বর্জন করে আন্দোলনের শামিল হয়েছিলাম। আন্দোলনের চাপে পাকিস্তানি সরকার ৮ মার্চ থেকে বেতার-টেলিভিশনের দায়িত্ব বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজের হাতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ২৫ মার্চের পর চলে যাই মুজিবনগরে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে যুক্ত হই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে। প্রথমে সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব আমার ওপর ছিল। তাই প্রথম দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আমি সংবাদ পড়লাম ‘সালেহ আহমেদ’ ছদ্মনামে। ওই সময়টায় খবর পড়ার মতো তেমন কাউকে পাচ্ছিলাম না। তাই কয়েকদিন আমাকেই পড়তে হয়েছিল। পরে আমাকে দেওয়া হলো নাটক বিভাগের দায়িত্বে। আমরা গান, নাটক এবং সংবাদ ঘোষণার মধ্যে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছি। এ স্মৃতিগাথা চিরদিন অন্তরে গেঁথে থাকবে।



বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি
-নাসির উদ্দীন ইউসুফ নাট্যব্যক্তিত্ব-নির্মাতা
আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। সে কথা মনে হলে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। কিন্তু এই স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের কত যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা থাকে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধের ময়দানে আমার সামনেই অনেক সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। তারপরও থেমে থাকিনি। হয় বিজয়, নয় মৃত্যুÑ এ বাণী বুকে ধারণ করে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। আমাদের দলে কমান্ডার ছিলেন মানিক। আমি সেকেন্ড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। কিন্তু যুদ্ধে মানিক শহীদ হয়। এরপর আমাকে কমান্ডারের দায়িত্ব নিতে হয়। আমরা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছি। শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে গেরিলা গ্রুপ তৈরি করে যুদ্ধ চালিয়ে গেছি। বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। তবে একবার ছিল ভয়াবহ। ভাবতে পারিনি বাঁচব। কিন্তু দৈবক্রমে বেঁচে গেছি। একবার গ্রেনেড পরীক্ষা করতে গিয়ে ভুল করে পিন খুলে ফেলি। সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়া বেরুতে থাকে। আশপাশে অনেক গ্রেনেড ছিল। ঘরের ভেতর বিস্ফোরিত হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে; তাই ওই গ্রেনেডটি হাতে নিয়েই বাইরের দিকে ছুটতে থাকলাম। কিন্তু সৌভাগ্য যে সেটি আর বিস্ফোরিত হয়নি।

প্রতিটি দিনই বিজয়ের দিন
-কবরী অভিনেত্রী, নির্মাতা
যুদ্ধের সময় আমি চট্টগ্রামেই ছিলাম। আমার বয়স যখন ১২ বছর তখন আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করি। সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ ছবি দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। সেটি ১৯৬৪ সালের কথা। তখন আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম আসি আসি করছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় আমি পুরোদস্তুর অভিনেত্রী। তখন আমি অনেকটাই পরিচিত। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ডিসেম্বর শুরুর দিকে আমরা বুঝতে পারছিলাম বিজয় অতি সন্নিকটে। প্রতিটি দিনই শুরু হতো একেকটি বিজয়ের খবর দিয়ে। একদিন দেখা যেত দিনাজপুর মুক্ত হয়ে গেছে। আবার অন্যদিন হয়তো মেহেরপুর। এমনি করে ডিসেম্বরের প্রতিটি দিনই যেন বিজয়ের দিন।




Loading...
Loading...
আনন্দ সময়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: