‘ক্লাস ফোরে যখন পড়ি তখন আমাকে স্কুল থেকে বের করে দেয় পোশাকের জন্য। আমার অপরাধ ছিল- স্কুলে গিয়েছিলাম লুঙ্গি পরে। তখন থেকেই মনের ভেতরে একটা চাপা কষ্ট বাসা বাঁধে। জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। হকারি করেছি, দিনমজুরের কাজ করেছি, পুরাতন পত্রিকা পড়েছি, বই চুরি করেও পড়েছি। এই নেশা আমাকে পেয়ে বসে। প্রথমে গান লিখতাম। পরে ২২ বছর ধরে কবিতা লিখছি। এখন পর্যন্ত লিখেছি আড়াই হাজারের মতো কবিতা।’ কথাগুলো বলছিলেন ঝিনাইদহের গুলজার হোসেন। পেশায় তিনি একজন বালুশ্রমিক। স্থানীয়দের অনেকে তাকে ‘গরিব কবি’ নামেও ডাকেন। শুধু কবিতা না, বালুশ্রমিক গুলজার হোসেন দুইশর বেশি গানেরও রচয়িতা।
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হওয়া বালুশ্রমিক গুলজারের এখন দুটি পরিচয়। একটি ‘বালুশ্রমিক’ অন্যটি ‘গরিব কবি’। ঝিনাইদহ শহরের কাঞ্চনপুর এলাকায় থাকেন এই গরিব কবি। পরিবারের সদস্য বলতে রয়েছে স্ত্রী ও দুই সন্তান। মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাস করল আর ছেলে পড়ছে দশম শ্রেণিতে। অর্থনৈতিক টানাপড়েনে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়েই শিক্ষাজীবনের ইতি টানেন তিনি। ১০ বছর বয়স থেকেই কৃষিকাজে বাবাকে সহযোগিতা করতে শুরু করেন। দিন গড়িয়ে সংসারের বোঝা কাঁধে পড়ে। শুরু হয় আরেক জীবনযুদ্ধ। তবুও থামেনি কবিতা লেখা। আইসক্রিম বিক্রি, ভ্যান চালিয়ে সংসার চালিয়েছেন বালুশ্রমিক গুলজার। সিগারেটের ভেতরে থাকা স্বচ্ছ সাদা কাগজেও লিখেছেন শত কবিতা।
আর কতকাল থাকবি বন্দি, বন্দি থাকবি নারী?
ধর্ষিতা হবি, লাঞ্ছিতা হবি, পুরুষতন্ত্রের বাড়ি?
ভোগ্যপণ্য খেদমতকারী শয্যাসঙ্গিনী
আর কতকাল প্রতিবাদহীন মরবি মাতঙ্গিনী?
আর কতকাল নেঙলী, ইলা চুপ থাকবি বল
আমোদী পাত্রী, শস্যক্ষেত্র ফেলবি চোখের জল!
কোথায় নারীরা, নারীরা কোথায়, কোথায় নারীরা মানুষ?
পুরুষ শাসন শোষণ পেষণে নারীরা এখনো বেহুঁশ!
ঢুস খেয়ে খেয়ে জ্ঞান ফেরেনি, এখনো অবলা জাতি
নারীর ভাগ্য নির্ণয় করে কোন সে দাতা পতি?
জাগো নারীরা, নারীরা জাগো ফুলন দেবী হয়ে
কাঁপুক পুরুষ শাসনতন্ত্র সব ফুলনের ভয়ে।
ওপরের কবিতার অংশগুলো কোনো বিখ্যাত কবির না। বালুশ্রমিক গুলজার হোসেনের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘একরোয়া মাটি কোথাও নেই তাঁর’- এর ‘জাগো নারী’ কবিতার অংশ। ২০০১ সালে ‘আহ্বান’ নামে একটি কবিতা লেখার মধ্য দিয়েই হাতেখড়ি গুলজার হোসেন গরিবের। প্রথম কবিতা দেখে স্বজন ও বন্ধুদের বাহবা পেয়ে বেড়ে যায় তার উৎসাহ। একে একে লেখেন ‘গভীর রাত’, ‘তোমাকে হত্যার পর’, ‘গরিবের বিদ্বেষ’, ‘প্রিয় সাবির হাকা’, ‘এখানে যা নেই’, করোনা নিয়ে ‘ভাইরাস’সহ ২৪০০ কবিতা। ১০টি প্রবন্ধও লিখেছেন তিনি, নিজের কণ্ঠে আবৃত্তিও করেন। লিখেছেন ২১০টির অধিক গান। এসব গান কবিতা ফেসবুকে নিয়মিত প্রচারও করেন তিনি।
গুলজার হোসেনের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহারাজপুর গ্রামে। ১৯৮০ সালে অসচ্ছল এক পরিবারে তার জন্ম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চালিয়ে যেতে না পারলেও চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। জীবনটা সুখের গল্পের ছোঁয়াতে বড় হয়নি।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনটা এতটা সুখের না। বালু নামানোর সময় গা বেয়ে ঘাম ঝরে। তখনও মনে পড়ে কীভাবে বাসায় গিয়ে কবিতা লিখব। অপেক্ষায় থাকি। পরে বাসায় এসে কম্পিউটার চালু করে আস্তেধীরে কবিতা লিখতে শুরু করি। আমার দরিদ্র বাবা পাঁচ ছেলেমেয়ের সংসার চালাতে খুব কষ্ট করতেন। ঠিকমতো আমাদের খাবার জুটত না। এ কারণে পড়াশোনা করতে পারিনি। তবে থেমে থাকিনি। চেষ্টার কখনও কমতি রাখিনি। যার ফলে মানুষ আজ আমাকে চেনে। আমার কবিতা দুয়েকজন হলেও পড়ছে।’
অনুপ্রেরণা হিসেবে গুলজারের স্ত্রী তাকে উৎসাহ জুগিয়েছেন কবিতা লেখার জন্য। তার স্ত্রী সেলিনা বেগম জানান, ‘বিয়ের আগে থেকেই আমি জানতাম গুলজার হোসেন লেখালেখি করেন। বিয়ের পর তার লেখার মাত্রা আরও বেড়েছে। এমনও সময় গেছে রাত জেগে কোথাও কবিতা লিখছেন। অনেক রাত হয়ে গেছে। আমি বাড়িতে রাত জেগে অপেক্ষায় থাকি। কখন বাড়ি ফিরবেন। হয়তো টাকাপয়সা দিয়ে আমি উনাকে সাহায্য করতে পারিনি কখনও। তবে উৎসাহ দিয়েছি সবসময়। পাশে আছি আজীবন।’
গুলজার হোসেন কবিতা লিখেছেন নেশায়, মানুষের জন্য। জীবন, সংসার, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, স্বাধীনতা তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু। আজন্ম কবিতা লিখে যেতে যান ঝিনাইদহের এই গরিব কবি। পরিপার-পরিজনের বাইরে জেলার হাজারো মানুষ তাকে এখন চেনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার কবিতা, আবৃত্তি শোনেন বলেও জানান গরিব কবি।