প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০, ১০:১৯ পিএম
ষ সাজেদা কাশেম জ্যোতি
দেহের ওজন দ্রুত কমাতে শীতকালীন খাবার কার্যকরী। এমনকি উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমাতেও বিশেষ সহায়ক। এ মৌসুমে কোনো পাশর্^প্রতিক্রিয়া ছাড়াই সুষম ও খুব কম ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করলে অনায়াসে ওজন কমানো সম্ভব। শীতের টাটকা সবজি এবং ফলমূল আহারে আপনার একঘেয়েমি যেমন দূর হবে তেমনি সমানতালে চলবে ডায়েট। এ সময়ে বাজারে হাতের নাগালেই পাওয়া যায় নানা ধরনের ভেষজ প্রোটিন, কম ক্যালরি ও অধিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ শাকসবজি। যার ফলে শীতে ডায়েট কন্ট্রোল করা আরও বেশি সহজ হয়ে পড়ে। শীতকালীন শাকসবজি শরীরে ভিটামিনের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। প্রায় সব ধরনের শাকসবজিতেই থাকে আঁশ ও প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান, যা ত্বকের বার্ধক্য রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে, আমাদের ত্বকের সজীবতা ধরে রাখে।
শীত যেমন মজার সব খাবার নিয়ে আসে, তেমনি এনে দেয় ওজন কমানোর মতো কিছু খাদ্য উপাদানও। এসব খাদ্য উপাদানে থাকে শর্করা, আমিষ, ভিটামিন এবং প্রচুর পরিমাণ পানীয়। আবার কিছু সবজি আছে যা আপনি অনায়াসেই ভাতের বিকল্প হিসেবে খেতে পারেন। ফলে আপনার ডায়েট তো হচ্ছেই পাশাপাশি আপনার ক্যালরির ঘাটতিও পূরণ হচ্ছে। তবে আপনার শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী কোন খাবার কতটুকু খাবেন সে বিষয়টি একজন পুষ্টিবিদের কাছ থেকে নির্ধারণ করে নেবেন।
ফুলকপি ও ব্রকলি : প্রচুর পরিমাণে ফাইবার আর বিভিন্ন খনিজ পদার্থ ও ভিটামিনের পাশাপাশি ব্রকলি ও ফুলকপিতে রয়েছে ফটো কেমিকেল যা চর্বি জমতে দেয় না শরীরে। ফুলকপি ওজন কমাতে সাহায্য করে। কেননা লো ক্যালরি খাবার হওয়ার পাশাপাশি এতে ফাইবারও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। তাই পেট অনেকক্ষণ ভর্তি থাকে। তা ছাড়াও এতে ইন্ডোল, গ্লুুকোসাইনোলেট এবং থায়োসাইনেট রয়েছে যা শরীর থেকে টক্সিন বের করতেও সাহায্য করে। এক কাপ (২৪০ গ্রাম) কাটা ফুলকপিতে আছে ২৭ ক্যালরি শক্তি, ২ গ্রাম প্রোটিন।
বাঁধাকপি : বাঁধাকপি শীতকালীন সবজিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি একটি পাতা জাতীয় সবজি। এতে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আঁশ রয়েছে। পুষ্টিগুণের পাশাপাশি বাঁধাকপির রয়েছে নানা রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও। সালাদে শসা, গাজর, টমেটোর সঙ্গে কচি বাঁধাকপি মেশালে তার স্বাদ হয় অত্যন্ত চমৎকার। যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। যারা ওজন কমাতে চান তারা তাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বাঁধাকপি রাখুন।
টমেটো : টমেটো একটি সুস্বাদু ও পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি। শীতকালীন এ সবজিটি যেমন কাঁচা খাওয়া যায়, ঠিক একইভাবে রান্না করে খাওয়া যায়। শরীরকে সুস্থ-সবল রাখতে টমেটোর ভূমিকা অতুলনীয়। টমেটোতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন কে, ফলিক অ্যাসিড লাইকোপিন, ক্রোমিয়াম ও আরও গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন। টমেটো লাইকোপেনের উৎকৃষ্ট উৎস। লাইকোপেন হচ্ছে একটি ক্যারোটিনয়েড পিগমেন্ট যা লাল ফলে পাওয়া যায়। এটা অত্যন্ত ক্যালরিযুক্ত। ছোট একটি টমেটোতে ১৬ ক্যালরি থাকে। এটা উচ্চ দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় দুরকম আঁশসমৃদ্ধ যা ওজন কমাতে সাহায্য করে।
পালংশাক : পালংশাক শীতকালীন শাকসবজির মধ্যে অন্যতম। এক কাপ পালংশাক খাদ্য আঁশের দৈনিক চাহিদার ২০ ভাগ পূরণ করার সঙ্গে সঙ্গে ভিটামিন এ ও কে-এর দৈনিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।
শসা : শসায় রয়েছে ডিটক্সিফিকেশন গুণ। শসায় ফাইবার আর পানির পরিমাণ বেশি থাকায় বারে বারে খুদা লাগার প্রবণতা কমায় এই সবজিটি। দুপুরের খাবারে প্রতিদিন শসা রাখতেই পারেন। এটি ওজন কমাতে টনিকের মতো কাজ করে। শসায় উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও সিলিকন আছে, যা ত্বকের পরিচর্যায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। শসায় উচ্চমাত্রায় পানি ও নিম্নমাত্রার ক্যালরিযুক্ত উপাদান রয়েছে। যারা দেহের ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য শসা একটি আদর্শ খাবার।
শালগম : শালগম শীতের আর একটি পরিচিত সবজি। শালগমে রয়েছে ভিটামিন এ, সি এবং ভিটামিন কে। এতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে অথচ ক্যালরির পরিমাণ থাকে খুবই কম। ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে কোলেস্টেরলে সমস্যা জড়িত। যাদের কোলেস্টেরলের সমস্যা আছে তারা শালগম খেয়ে উপকৃত হতে পারেন। এর কারণ শালগম পাকস্থলীতে অনেক বেশি পিত্তরস শোষণ করতে পারে যা শরীরের খারাপ কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এভাবেই কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করে শালগম।
গাজর : শীতকালিন সবজির মধ্যে অন্যতম সুস্বাদু ও পুষ্টিকর সবজি হলো গাজর। আমাদের দেহকে সুস্থ-সবল রাখতে যেসব ভিটামিন ও খনিজ উপাদান প্রয়োজন তার সবই আছে গাজরে। গাজরে রয়েছে থায়ামিন, নিয়াসিন, ভিটামিন বি৬, ফলেইট এবং ম্যাঙ্গানিজ যা স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। এ ছাড়াও আরও আছে ফাইবার, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে ও পটাশিয়াম। গাজরের মধ্যে থাকা ফাইবার আর নিউট্রিয়েন্ট মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। তাই আপনার খাবার ম্যানুতে প্রতিদিন সালাদ বা সবজি হিসেবে গাজর রাখুন।
অতিরিক্ত ওজন হ্রাস করা একটি জটিল বিষয়। আপাত দৃষ্টিতে এটি খুব সহজ কাজ মনে হলেও এর জন্য প্রয়োজন অসীম ধৈর্য ও আত্মবিশ^াস। খাদ্যাভাস পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিদিন করতে হবে ব্যায়ামও। সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, আর প্রচুর পানি পান করুন। মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন একই সঙ্গে। স্থায়ীভাবে ওজন হ্রাসের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উপায়ে অর্থাৎ আদর্শ খাদ্যাভাস ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাই সর্বোত্তম পন্থা।
লেখক : পুষ্টিবিদ