নতুন কৌশলে চাঁদাবাজি

শিহাবুল ইসলাম

অপরাধ

কঠোর নির্দেশনা থাকলেও গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে বন্ধ হয়নি চাঁদা আদায়। শুধু ধরন কিছুটা পাল্টেছে। আগে গণপরিবহনে রাস্তা থেকে সরাসরি

2021-10-10T11:51:30+00:00
2021-10-10T11:51:30+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬,
৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
অপরাধ
নতুন কৌশলে চাঁদাবাজি
শিহাবুল ইসলাম
প্রকাশ: রোববার, ১০ অক্টোবর, ২০২১, ১১:৫১ এএম 
কঠোর নির্দেশনা থাকলেও গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে বন্ধ হয়নি চাঁদা আদায়। শুধু ধরন কিছুটা পাল্টেছে। আগে গণপরিবহনে রাস্তা থেকে সরাসরি চাঁদা আদায় করা হলেও এখন নেওয়া হচ্ছে কাউন্টার থেকে। এ অর্থ আদায় করা হচ্ছে মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের নামে। অন্যদিকে ঢাকায় প্রবেশের সময় বিভিন্ন পয়েন্টে সব ধরনের ট্রাক থেকে বেনামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দিন শেষে সারা দেশে এ চাঁদা আদায়ের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যখন কোনো ট্রাকে পণ্য বোঝাই করা হয়, সেখানেই প্রথমবার ৫০, ৬০ বা ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয় জেলা শ্রমিক ইউনিয়ন এবং মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদকে। শ্রমিকদের কল্যাণের নাম করে আদায় করা হয় এ অর্থ। তারা চাঁদার বিপরীতে রসিদ দিলেও তাতে টাকার যে অঙ্ক লেখা থাকে আদায় করে তার চেয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ। জেলায় চাঁদা দিয়ে ঢাকার নির্ধারিত স্থানে আসার পথে আরও অন্তত তিন-চার জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। ঢাকা থেকে কোনো যাত্রীবাহী বাস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়ার সময়ও তিন থেকে চার জায়গায় চাঁদা দিতে হয়।

তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ঢাকা থেকে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি বা দেশের অন্য কোথাও যেতে একটি বাসকে অন্তত ২০টি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়। আর পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ঢাকায় আসতে অন্তত ১২-১৫টি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়।

ধরন পাল্টেছে চাঁদাবাজির

করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর আগে সারা দেশে রাস্তায় লাঠি উঁচিয়ে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে চাঁদা আদায় করা হতো। এখন কাউন্টার থেকেই প্রতিটি বাসের জন্য চাঁদা নেওয়া হয়। তবে ঢাকা থেকে বের হওয়ার সময় এখনও গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদসহ ৫-৬টি স্থান থেকে সরাসরি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ৬০ থেকে ১০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। আর পাইকারি বাজারগুলোতে ট্রাক প্রবেশের পর মালপত্র নামানোর জন্য যতটা সময় অপেক্ষা করতে হয় তার জন্য ‘লাইন’ ফি নামে ১০০ টাকা নিলেও এর বিপরীতে কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। গাবতলিতে কিছু লোক লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে, ভয় দেখিয়ে, চালকদের আঘাত করে, জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় প্রবেশের সময় এই চাঁদা দিতে না চাইলে লাঠি দিয়ে ট্রাকের লুকিং গ্লাস ভেঙে দেওয়া হয়। তবে চাঁদার পরিমাণ আগের চেয়ে এখন কিছুটা কমেছে।

ঢাকা-সিলেট চলাচল করা হানিফ পরিবহনের চালকের একজন সহকারী বাবুল। তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে সায়েদাবাদ কাউন্টার থেকে মালিক সমিতির নামে চাঁদা কাটে ৪০ টাকা। সিটি করপোরেশনের নামে নেওয়া হয় ৬০ টাকা। আর দেশের উত্তরাঞ্চলে চলাচলকারী প্রতিটি বাস থেকে আদায় করা এ চাঁদার পরিমাণ ৫০০-৬০০ টাকা।’

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির মধ্যে চলাচল করা হানিফ পরিবহনের আরেক চালকের সহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সায়েদাবাদ সিটি করপোরেশনের নামে ৬০ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবন, খাগড়াছড়ির সবগুলো কাউন্টার থেকে টাকা কেটে রাখে। এগুলোর আদায় রসিদ দেওয়া হয়।’

সেন্টমার্টিন পরিবহনের এক চালক বলেন, ‘রাঙামাটির রাউজানে মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের নামে গাড়িপ্রতি ৩৫০ টাকা নেওয়া হয়। গাড়ি ঢুকলেই এই টাকা দিতে হয়।’

ঢাকায় প্রবেশের পথে বেনামে চাঁদা আদায়

রাজধানীতে প্রবেশের সময় গাবতলী, যাত্রাবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় সব ধরনের ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করা হয়; কিন্তু দেওয়া হয় না কোনো আদায়ের রসিদ। গাবতলী দিয়ে প্রবেশের সময় ছোট ট্রাকের জন্য ৫০ আর বড় ট্রাকগুলোর জন্য ১০০ টাকা দিতে হয়। কিন্তু এই চাঁদা আদায় সিটি করপোরেশন অনুমোদিত নয়। তবে বৈধভাবে টোল আদায়ের জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কয়েকটি স্থান নির্ধারণ করে দেওয়ার চিন্তা করছে।

প্রতিদিন ঢাকা শহরে কতটি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান প্রবেশ করে তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান কোনো সংগঠন বা সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। তবে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের ধারণা, প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ট্রাক গাবতলী, যাত্রাবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি এলাকা দিয়ে ঢাকা শহরে প্রবেশ করে, যেগুলো থেকে ৬০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এগুলোরও রসিদ দেওয়া হয় না। সেই হিসাবে গড়ে যদি ২ হাজার ৭০০ গাড়ি প্রতিদিন প্রবেশ করে এবং গাড়িপ্রতি গড়ে যদি ৭০ টাকা আদায় করা হয়, তাহলে প্রতিদিন ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা চাঁদা ওঠে। মাসে শেষে এর পরিমাণ দাঁড়ায় তা প্রায় ৫৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানার শেখপাড়া থেকে কাঁচামাল নিয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসেছেন মো. সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘শেখপাড়ায় মাল লোড করার পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কেন্দ্রীয় মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নামে ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে আদায় রসিদে লেখা আছে ৩০ টাকা। দেশের যেসব জায়গায় পণ্য লোড হয়, সব জায়গাতেই টাকা দিতে হয়। এরপর পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে দিতে হয়েছে ৮০ টাকা, যেটার আদায় রসিদ দেওয়া হয়েছে। গাবতলী দিয়ে প্রবেশের সময় নেওয়া হয়েছে ১০০ টাকা।’

তিনি বলেন, ‘গাবতলীতে টাকা না দিলে লুকিং গ্লাস ভেঙে দেওয়া হয়। দরজায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়।’ সেখান থেকে কারওয়ান বাজারে আসার পর গাড়ি থেকে পণ্য নামাতে অপেক্ষারত সময়ের জন্য দিতে হয় ১০০ টাকা। এই টাকার বিপরীতেও কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। তবে পুলিশ আগে প্রচুর ঝামেলা ও চাঁদা নিলেও এখন ঝামেলা কম করছে বলে জানান তিনি।

প্রতিদিন আদায় হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা

এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. হানিফ খোকন বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো শ্রমিক যদি ইউনিয়নের সদস্য হন, তাহলে ওই ইউনিয়নের কার্যালয়ে গিয়ে মাস শেষে ৫০ বা ১০০ টাকা সংগঠনের সংবিধান অনুযায়ী চাঁদা দেবেন; কিন্তু রাস্তা থেকে চাঁদা ওঠানোর কোনো বিধান নেই। এটা স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন। তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে একটা বাস ঢাকা থেকে কক্সবাজার যেতে অন্তত ২০টি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়। আগে লাঠি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদা আদায় করত, এখন কেউ ওইভাবে আদায় করে না। গাড়ি যখন আসে তখন কাউন্টারগুলো মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে টাকা রেখে দেয়। দিন শেষে টাকা চলে যায় নেতাদের কাছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে ১১ লাখ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আছে। যদি একবার ৫০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয় তাহলে, সারা দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৫ কোটি টাকা ওঠে। কিন্তু একবারের জায়গায় ১০ বার চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। যাত্রী পরিবহনের চেয়ে পণ্য পরিবহনে আরও বেশি নৈরাজ্য। ধরুন, যশোর থেকে একটা ট্রাক কারওয়ান বাজার আসতে অন্তত ১২-১৫ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। সেটা কিন্তু ৫০ টাকা নয়। ১০০, ২০০ বা ৩০০ টাকা দিতে হয়। এর বাইরে আবার পৌরসভার টোল দিতে হয়। এখন পৌরসভার ওপর দিয়ে যে সড়ক গেছে এর মালিক কে? রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে। গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করলে ট্যাক্স দেওয়া হয়। বিআরটিএ আদায় করছে। তাহলে আমরা কেন পৌরসভাকে টাকা দেব?

বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক রুস্তম আলী খান বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কোনো স্ট্যান্ড থাকলে সেখানে যদি আমাদের গাড়ি প্রবেশ করে তাহলে তার টোল আমরা দেব। কিন্তু যেখানে কিছুই নেই, মহাসড়ক দিয়ে চলে যাচ্ছি তখন গাড়ি দাঁড় করিয়ে টাকা নেবে এটা অযৌক্তিক। এ কারণে আমাদের ধর্মঘটের সময় এ দাবিটাও জানানো হয়েছিল যে, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের নামে কোনো চাঁদা আদায় করা যাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।’

মানা হচ্ছে না পুলিশ প্রধানের নির্দেশনা

২০২০ সালের ৫ জুন এক বৈঠকে পরিবহন খাতে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধের নির্দেশনা দেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নেতারাও ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বিবৃতি দিয়ে চাঁদাবাজ ধরা ও চাঁদামুক্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ার জন্য সরকারের সহায়তা চায়। তখন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সরকারকে সাধুবাদ জানায়; কিন্তু এটা চার মাস বন্ধ ছিল। পরে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সমন্বয়ে গঠিত মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ চাঁদা আদায়ের নির্দেশ দেয়। নির্দেশ অনুযায়ী শ্রমিক সংগঠনের জন্য ৫০ টাকা, মালিক সমিতির জন্য ৬০ টাকা হারে চাঁদা আদায়ের কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই ১০০ টাকা আদায় করা হয়।




  বিষয়:   চাঁদাবাজি 


Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: