মালয়েশিয়ায় পাঠাতে মেডিকেল টেস্ট, ১০ এজেন্সির প্রতারণা

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

অপরাধ

২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে। সেই বাজার ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। দুবছরে দেশটিতে প্রায় ৭ লাখ

2021-12-29T10:44:03+00:00
2021-12-29T10:44:03+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,
২ আষাঢ় ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
অপরাধ
মালয়েশিয়ায় পাঠাতে মেডিকেল টেস্ট, ১০ এজেন্সির প্রতারণা
মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২১, ১০:৪৪ এএম   (ভিজিট : ২৫১৩)
২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে। সেই বাজার ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে যায়। দুবছরে দেশটিতে প্রায় ৭ লাখ কর্মী পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়ে মেডিকেলের নামে প্রায় ৩৮৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর এ কাজ করেছে সে সময়ে কর্মী পাঠানোর দায়িত্বে থাকা ১০ এজেন্সি। তবে সেই টাকার এক কানাকড়িও ফেরত পায়নি ভুক্তভোগীরা। 

খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় দেশটিতে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল ৫৫ হাজার কর্মী। বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা যেতে পারেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন সময় দেশটিতে যাওয়ার জন্য ১০ লাখ কর্মীর মেডিকেল টেস্ট করানো হলেও তাদের মধ্যে ৭ লাখ ২৪ হাজারকে আনফিট দেখানো হয়। ফলে তারাও যেতে পারেনি। এসব কর্মীর প্রত্যেকের কাছ থেকে মেডিকেল পরীক্ষার জন্য ৫ হাজার ৩০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছিল, যা হিসাব করলে দাঁড়ায় ৩৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। যার পুরোটাই হাতিয়ে নিয়েছে দেশটিতে কর্মী পাঠানোর দায়িত্বে থাকা ১০ এজেন্সি। সে সময় এই সিন্ডিকেট এজেন্সিগুলোর অধীনেই মেডিকেল টেস্ট করানো হতো। তারা প্রতিটি কর্মীর কাছ থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করে নিত এবং টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট ধরিয়ে দিত। 

আরও জানা গেছে, ২০০৭, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে মেডিকেল পরীক্ষার সর্বোচ্চ খরচ ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। কিন্তু সেটি ২০১৬ সালে এসে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩০০ টাকায়, যা আগের থেকে ৪৭০০ টাকা বেশি ছিল। এ নিয়ে সে সময় মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এজেন্সিগুলো সঙ্গে তেমন উচ্চবাচ্যও করেনি। ফলে সাড়ে ৭ লাখ কর্মী মেডিকেল করতে গিয়ে প্রচারিত হয়েছে ১০ এজেন্সির কাছে। তবে সেই টাকা ফেরত পায়নি তারা। এ ছাড়াও বাংলাদেশে মেডিকেল করার পরও মালয়েশিয়ায় গিয়ে অনেক কর্মীকে আবারও মেডিকেল করতে হয়েছিল। তাদের মধ্যে আবার অনেককে আনফিট (স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অকৃতকার্য) হয়ে ফেরত আসতে হয়েছে। সেই সংখ্যাও লাখের নিচে নয়। তবে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ কর্মীর মেডিকেল করানোর নামে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায় বায়রার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আকাশ ভ্রমণ এজেন্সির মালিক মনসুর আহমেদ কালামের এক বক্তব্যে। 

2০১৯ সালে বায়রার এক মতবিনিময় সভায় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ১০ লাখ লোকের মেডিকেল করা হলো। তার মধ্য থেকে আড়াই লাখ লোক যেতে পারল। সাড়ে ৭ লাখ লোক মেডিকেলের নামে প্রচারিত হলো। এ ছাড়াও তিনি মেডিকেল টেস্টের টাকা বেশি নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও সভায় প্রতিবাদ করেন। 

২০০৯ সালে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল করানো কয়েকটি মেডিকেল সেন্টারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই মেডিকেল পরীক্ষাগুলোর সর্বসাকুল্যে ব্যয় ছিল ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সিন্ডিকেটের সদস্যরা নতুন বাজার খুললে ছলে-বলে-কৌশলে সেই পরীক্ষার ফি ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে। এই মেডিকেলের নামে পুরো টাকা হাতিয়ে নেওয়াই মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের। 

প্রবাসী মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সে সময় প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে মেডিকেল পরীক্ষার নামে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করে নেয় ১০ এজেন্সি। দেশটিতে সে সময় মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার কর্মী পাঠানো হয়। বাকি ৭ লাখ ২৪ হাজার যেতে পারেনি। ফলে তাদের পুরো টাকাই গচ্চা গেছে। এ ছাড়াও ৫৫ হাজার কর্মী বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যেতে পারেনি। যারা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রতিটি এজেন্সিকে ৪ লাখ টাকা করে দিয়েছিল। সেই টাকাও গচ্চা গেছে কর্মীদের। 

এই টাকা ফেরত পেতে অসহায় কর্মীরা আর কোনো দফতরেও অভিযোগ করেনি। তবে দেশটি হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর যেতে না পারা অধিকাংশ কর্মীই এজেন্সিগুলোর 
অফিসগুলোতে গিয়ে পাওনা টাকা পেতে ভিড় করেছিল; কিন্তু তারা তা পায়নি। নানা অজুহাত দিয়ে তাদে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সে সময় রুহুল আমিন স্বপনের ক্যাথারসিস ওভারসিস নামে এজেন্সিটি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কর্মীকে পাঠাতে না পারলে কর্মীরা তাদের বনানীর অফিসে গিয়ে ভিড় করে। এক পর্যায় তারা ব্যর্থ হয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যায়। এ বিষয়ে সে সময় রুহুল আমিন স্বপ্নের ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এভাবে বাকি ৯টি এজেন্সিও মালয়েশিয়া পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে একই আচরণ করে কর্মীদের সঙ্গে।

সে সময় মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর দায়িত্ব পায় দেশের ১০ এজেন্সি। তারা হলোÑ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফাইভএম লিমিটেড, রুহুল আমিন স্বপনের ক্যাথারসিস ওভারসিস, রুহুল আমিনের আমিন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, আব্দুল বাশারের সরকার রিক্রুটিং এজেন্সি, আব্দুল হাইয়ের জেনারেল ল্যান্ড ওভারসিস, শফিকুল আলম ফিরোজের হযরত অ্যাসোসিয়েট, রুহুল আমিন মিন্টুর প্যান ব্রাইট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, গর্ভ পার্টিস ম্যান (১ ও ২), মো. মোশাররফ হোসেনের মালয়েশিয়ান ম্যানস এজেন্সি। এই ১০ এজেন্সি দেশটিতে প্রায় ৩ লাখ কর্মী প্রেরণ করে। তার মধ্যে সাড়ে ৭ লাখ কর্মীর বিদেশ যেতে মেডিকেল টেস্টের পুরো টাকাই তারা আত্মসাৎ করেছে। ফলে এই টাকাগুলো কর্মীদের পকেট থেকে গচ্চা গেছে। টাকাগুলোও ফেরত দেয়নি এজেন্সিগুলো। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগীরা জানায়, তাদের কেন মেডিকেলে আনফিট দেখানো হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যাও এজেন্সিগুলো থেকে সে সময় দেওয়া হয়নি। শুধু বলা হয়েছিল, ‘আপনারা মেডিকেলে আনফিট হয়েছেন।’ কিন্তু তাদের শারীরিক কী কী সমস্যার কারণে আনফিট দেখানো হয়েছে তার কোনো কারণও ছিল না তাদের দেওয়া রিপোর্টে। আরও জানা গেছে, এই ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া বেশিরভাগ কর্মীই ছিল অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারগুলো থেকে আসা। ফলে কষ্ট করে, জমি, জমির ফসল ও গৃহপালিত পশু বিক্রি করে সেই টাকা তারা সংগ্রহ করে মেডিকেল টেস্টের জন্য দিয়েছিল। অনেকেই হাতে না থাকায় সে সময় ঋণ করে টাকা দেয়। 

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান সময়ের আলোকে বলেন, যদি এমন হয়ে থাকে তবে অনুরোধ থাকবে যেসব শ্রমিক যেতে পারেনি তাদের যেন এজেন্সিগুলো অন্য কোনো দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। অথবা তাদের টাকা তারা ফেরত দেয়। এবার যাতে এমন না হয় সে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে নজরদারি করারও অনুরোধ থাকল। 
বায়রার সাবেক মহাসচিব বেনজির আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের কাছে কোনো শ্রমিক এসে অভিযোগ করেনি, ফলে আমরা বিষয়টি জানলেও ব্যবস্থা নিতে পারছি না। অভিযোগ করলে হয়তো ব্যবস্থা নেওয়াটা সম্ভব হতো। তা ছাড়া বিষয়টি অনেক দিন আগের। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। 
এ বিষয়ে বিএমইটির মহাপরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, আমি ওই সময় দায়িত্বে ছিলাম না। বিষয়টি ভালোভাবে বলতে পারছি না। আর আমাদের কাছে এমন কেউ অভিযোগ নিয়েও আসেননি।

/এমএইচ/


Loading...
Loading...
অপরাধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: