চলতি বছরের শুরুতেই ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কলাবাগানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল মাস্টারমাইন্ডের ‘ও’ লেভেল শিক্ষার্থীর (১৭) যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় তাকে। মামলার একমাত্র আসামি ছেলেবন্ধু ফারদিন ইফতেখার দিহান (১৮) ফরেন বডি ভিকটিমের গোপনাঙ্গে প্রবেশ করায়, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় তার।সর্বশেষ গত ২৭ ডিসেম্বর বিয়ের মাত্র দেড় মাসের মাথায় আত্মহত্যা করেন ফেনীর সানজিদা আক্তার (২০)।
অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য নির্যাতন করতেন দুবাই প্রবাসী স্বামী আবুল বাশার। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বাশারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে নির্যাতনের মাত্রা থেকে রেহাই মেলেনি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদেরও।
গত ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার বনানীতে শ্বশুরবাড়িতে মৃত্যু হয় এলমা চৌধুরী নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর। মৃত্যুর সময় তার শরীরে ছিল একাধিক জখমের চিহ্ন। স্বজন ও সহপাঠীদের অভিযোগ, কানাডা প্রবাসী স্বামী ইফতেখার আবেদিন দেশে ফিরে নির্যাতন করে হত্যা করেন তাকে।
এ ছাড়া ২২ ডিসেম্বর বুধবার, পর্যটন নগরী কক্সবাজারে স্বামী-সন্তানসহ ঘুরতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন এক নারী। এ ঘটনায় জড়িত তিন আসামিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
বছরজুড়ে এমন অসংখ্য নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ঘরে-বাইরে পাবলিক প্লেসে কোথাও নিরাপত্তা নেই নারীর। সব জায়গাতেই সহিংসতার শিকার সে।
করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের বেশিরভাগ সময়ই ছিল লকডাউন পরিস্থিতি। বলা হয়েছে, পরিবারের সবাই এক ঘরে থাকার কারণে পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে। কিন্তু ২০২১-এ এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। বেশিরভাগ মানুষ ফিরেছে কর্মক্ষেত্রে। তবুও কমেনি সহিংসতার মাত্রা।
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর এই ১১ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ২৪৭ জন নারী। ধর্ষণের পরে মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের এবং মৃত্যুমুখ থেকে ফিরেছেন ২৮৬ জন নারী। এমনকি ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন।
অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ২১৩ জন। তবে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১০৬টি ক্ষেত্রে। গত বছরের তুলনায় পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ১০ শতাংশ বেশি।
নয়টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সংরক্ষিত সংবাদ ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন দেয় সংস্থাটি।
১৩টি জাতীয় দৈনিক ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে অন্য এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি জানায়, এ বছর সংঘটিত বাল্যবিয়ের সংখ্যা ছিল অশনিসংকেতের মতো। তাদের তথ্যমতে এ বছর বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৩৮ শতাংশ।
এ ধরনের সহিংসতা বৃদ্ধির প্রতিকারের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম সময়ের আলোকে বলেন, রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে, মাদকের মতো সহিংসতা দমনের জন্যও স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। ধর্ষণের বিচার ব্যবস্থাকে দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করতে হবে। বিচার ব্যবস্থায় জড়িতদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীল করে তুলতে হবে। তিনি মনে করেন, নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোয়, নারীর নন, অসম্মান হচ্ছে গোটা রাষ্ট্রের।
এ প্রসঙ্গে সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, মূল কারণ হচ্ছে নারীকে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়, সেটি হচ্ছে নারী ভোগ্যপণ্য। এ জন্য দায়ী ক্ষমতার অপব্যবহার। দুর্বলের ওপর সবলের ক্ষমতা প্রদর্শন।
নারী নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত নিরক্ষর সবাই নির্যাতিত। এমনকি রাষ্ট্রের কাস্টডিতে থেকেও নারী নির্যাতিত হয়।
এ পরিস্থিতি কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যাবে- এমন প্রশ্নে মালেকা বানু বলেন, এই পরিস্থিতি আগামীতেও কমার আশা নেই, যদি না আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়। সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে সবার পারিবারিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।
পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির ব্যাপারে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নিনা গোস্বামী বলেন, সবচেয়ে বড় কথা নারীর প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা যেকোনো সূচকে বাড়লেই তা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া সর্বক্ষেত্রে, বিশেষ করে চরাঞ্চল, বাস, ট্রেন, পর্যটন এলাকা, ঘরে-বাইরে সমানভাবে নারী যেন নিরাপত্তা ভোগ করতে পারে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া। কোনো নারী বিপদে পড়লে যেন দ্রুত সাড়া দিয়ে তাকে সাহায্য করা হয়। তাহলে অনেকটাই কমে আসবে সহিংসতার মাত্রা।