ভয়ানক মাদক ‘আইস’ বা ‘ক্রিস্টাল মেথ’। এর মাত্র ১ গ্রামের দামই অন্তত ২৫ হাজার টাকা। তালমিছরির দানার মতো দেখতে এই মাদক বহন বা পাচার প্রক্রিয়াও অনেকটাই সহজ। আবার শতভাগ ‘এমফিটামিন’ উপাদান থাকায় আইসের নেশার মাত্রা বা প্রতিক্রিয়াও ইয়াবার চেয়ে বহুগুণ বেশি। এসব কারণে মাদকসেবীদের কাছে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ভয়ঙ্কর এই ক্রিস্টাল মেথ। ধনাঢ্য মাদকসেবীদের কাছে এর চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নানা পণ্যের আড়ালে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে একের পর এক আসছে মূল্যবান আইসের চোরাচালান। সর্বশেষ শনিবারও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে বার্মিজ আচারের প্যাকেটে করে বিশেষ কৌশলে নিয়ে আসা ৫ কেজি ৫০ গ্রাম পরিমাণের আইস উদ্ধার করেছে র্যাব।
শনিবার কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানিয়েছেন, জব্দ করা প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা মূল্যের এই আইস সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় চোরাচালান। এই আইস জব্দকালে চক্রের অন্যতম হোতা ও টেকনাফের ইয়াবা ডন হিসেবে পরিচিত হোসেন ওরফে খোকন (৩৩) ও তার সহযোগী মোহাম্মদ রফিককে (৩২) গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গোলাবারুদ, দুটি মোবাইল, তিনটি দেশি-বিদেশি সিমকার্ড ও মাদক কারবারে ব্যবহৃত ২০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। তিনি জানান, এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা হয়েছে। গ্রেফতার দুই মাদক ব্যবসায়ীকে ওই থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে এ বিষয়ে আরও জ্ঞিাসাবাদ করবে।কমান্ডার মঈন জানান, আইস সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাতের অন্ধকারে টেকনাফের নাফ নদের বিভিন্ন পয়েন্টে নৌকায় থেকে ‘তিনবার’ লাইটের আলোর সিগন্যাল দিয়ে মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থান করা মাদক কারবারিদের সঙ্গে সাঙ্কেতিকভাবে যোগাযোগ করে আইস আনা-নেওয়া করে থাকে। গ্রেফতার খোকন টেকনাফকেন্দ্রিক মাদকচক্রের অন্যতম গডফাদার হিসেবে পরিচিত। খোকনের বিরুদ্ধে আগেই মাদক-অস্ত্রসহ অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে।
র্যাব কমান্ডার বলেন, আইসের এই বড় চালানটি রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি ও উত্তরাসহ একাধিক অভিজাত এলাকায় নির্দিষ্ট কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর কাছে সরবরাহ করার কথা ছিল। অভিজাত এলাকার ওই মাদক চক্রের সম্পর্কেও বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তাদেরও যেকোনো সময় গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুবছর আগে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে প্রথম মাত্র ৫ গ্রাম আইসসহ এক যুবককে আটক করেছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। ওই সময়েই আইস বা ক্রিস্টাল মেথ নামে ভয়াবহ মাদকের কথা জানাজানি হয়। এরপর ওই যুবকের স্বীকারোক্তিতে জিগাতলার একটি বাসা থেকে ২৯ গ্রাম আইসসহ হাসিব বিন মোয়ামের রশিদ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায়। কেননা ওই রশিদ জিগাতলার ওই বাসায় কারখানা স্থাপন করে ‘আইস’ দিয়ে ভিন্ন ধরনের মাদক উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করছিল। পরে রশিদের স্বীকারোক্তিতে ভাটারার একটি আবাসিক এলাকা থেকে ৫০০ গ্রাম আইসসহ নাইজেরিয়ান এক নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। এরপর র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আরও বেশকিছু অভিযানে আইস উদ্ধার করলেও একসঙ্গে ৫ কেজির বেশি পরিমাণের এই ক্রিস্টাল মেথ উদ্ধারের ঘটনা দেশে এবারই প্রথম। র্যাবের অভিযানে আইসের এত বড় চোরাচালান আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও অনেকটা টনক নড়েছে। এমনিতেই ইয়াবার আগ্রাসনে হিমশিম অবস্থা, সেখানে নতুন করে ভয়ানক মাদক আইসের চোরাচালান যে হারে বাড়ছে তাতে আরও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমান্ডার মঈন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার ভোরে যাত্রাবাড়ী থেকে র্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১৫ ব্যাটালিয়নের একটি আভিযানিক দল ৫ কেজি ৫০ গ্রাম আইসের চালানসহ ওই দুজনকে গ্রেফতার করে। তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে টেকনাফের নাফ নদ পার করে চক্রটি দেশের সীমানায় আইস নিয়ে আসে। বার্মিজ আচার, কাপড় ও চায়ের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশে। তারা আচার ও চায়ের আড়ালে এই ভয়ঙ্কর মাদক আইস নিয়ে এসে সেগুলো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাপ্লাই দিত।
যেভাবে আসছে আইস : কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিরা টেকনাফকেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য। এই চক্রটি গত কয়েক বছর ধরে অবৈধ মাদক ইয়াবার কারবার করে আসছে। সিন্ডিকেটে ২০-২৫ জন যুক্ত রয়েছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাধারণত নৌপথ ব্যবহার করে মাদকের চালান দেশে নিয়ে এসে থাকে। টেকনাফ সীমান্তে আইস এনে বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে আগে রেখে দেওয়া হয়। এরপর সুযোগ বুঝে বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে সেগুলো ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। টেকনাফের এই চক্রটি দীর্ঘদিন ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকলেও কয়েক মাস ধরে আইস পাচার নিয়ে আসছিল। ঢাকার উত্তরা, বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তাদের সিন্ডিকেট সদস্য রয়েছে। এই চক্রের সদস্যদের সম্পর্কেও তথ্য পেয়েছে র্যাব। র্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, টেকনাফের নাফ নদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশিচৌকি থাকলেও গ্রেফতার এই আইস সিন্ডিকেটের সদস্যরা রাতের অন্ধকারে নৌকায় ‘তিনবার’ লাইটের আলোর সিগন্যালের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশের মাদক কারবারিদের সঙ্গে সাঙ্কেতিকভাবে যোগাযোগ করে আইস আনা-নেওয়া করে থাকে। তারা এর আগে ইয়াবা নিয়ে এলেও বেশি লাভের আশায় সম্প্রতি আইস নিয়ে আসা শুরু করে। টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়কপথে নিয়ে আসে। এরপর তারা চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে ঢাকায় নিয়ে আসে।
বার্মিজ আচার ও কাপড়ের আড়ালে আসছে আইস : র্যাব জানিয়েছে, মিয়ানমারের বার্মিজ আচার, কাপড় ও চায়ের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশে। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে এসব পণ্যের আড়ালে সহজেই আনা হচ্ছে ভয়ানক মাদক আইস। গ্রেফতার আইসের অন্যতম হোতা রফিকের বার্মিজ আচার, কাপড় ও চায়ের ব্যবসা ছিল। সে এ ব্যবসার আড়ালে এই ভয়ঙ্কর মাদক আইস নিয়ে এসে সেগুলো রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাপ্লাই দিত। দেশে জব্দ করা আইসের সবচেয়ে বড় চালান এটি। খোকন কাপড় ও আচারের ব্যবসার আড়ালে মাদকের চালান দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাত। তার সহযোগী মোহাম্মদ রফিক চক্রের একজন সক্রিয় সদস্য এবং টেকনাফে অটোরিকশা চালকের ছদ্মবেশে মাদক পরিবহন ও স্থানান্তর করত। এই সিন্ডিকেটের ২০ থেকে ২৫ সদস্য রয়েছে, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
আইস শনাক্ত ও মূল্য নির্ধারণ হয় যেভাবে : এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, শনিবার ভোরে আইস উদ্ধারের পর তাৎক্ষণিক পরীক্ষার পর জানা গেছে, এটি প্রকৃতই আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। আর মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মূলত আইসের দাম নির্ধারণ করা হয়। সে অনুযায়ী উদ্ধার করা সাড়ে ৫ কেজি আইসের মূল্য ধরা হয়েছে সাড়ে ১২ কোটি টাকা। আটক আইসগুলো খোকন চক্র আরও অনেক কম মূল্যে মিয়ানমার থেকে কিনেছিল। এটা ঢাকায় আনার পর পাইকারি ডিলার হয়ে খুচরা সেবনকারী পর্যন্ত মূলত ওই মূল্য দাঁড়ায়। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, আইসের কোনো চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও তার জন্য ওই মাদক ব্যবসায়ীর টাকা খোয়া যাবে না। অনেক সময় আইসের জন্য অগ্রিম টাকাও লাগে না। সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার পর বিপুল অঙ্কের এ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে হোতাদের কাছে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
র্যাবের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক কারবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ কারণে সরাসরি সক্রিয় মাদকচক্রের সদস্যরাও স্থানীয়দের কাছ থেকে নানা ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছে। বিশেষ করে আইস এবং ইয়াবার চালান মিয়ানমার থেকে নাফ নদ পেরিয়ে টেকনাফ সীমান্তে প্রবেশের পরই স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতে রাখা হচ্ছে। এরপর সুযোগ বুঝে চক্রের সদস্যরা অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়িসহ নানা ধরনের বাহনে সরবরাহ করা হচ্ছে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ইয়াবায় এমফিটামিন উপাদান থাকে ৫ শতাংশ আর ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের পুরোটাই এমফিটামিন। তাই এটি ইয়াবার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ক্ষতিকর মাদক। মানবদেহে ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। শনিবার র্যাবের উদ্ধার করা আইস তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করেও নিশ্চিত হন কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইস মাদক গ্রহণ করলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হন সেবনকারী। এতে নার্ভ সেল বা স্নায়ুকোষ ধ্বংসের পাশাপাশি মস্তিষ্ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি এই মাদকসেবনে আক্রমণাত্মক ও সহিংস হয়ে ওঠে সেবনকারী।