সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম দেয় রাষ্ট্র। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে এ প্রচলিত নিয়মের। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অনন্য অবদান রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এই ভূখণ্ডে সংঘটিত সব আন্দোলন-সংগ্রামে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে শাসক-শোষক শ্রেণির অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে সেগুলোতে চালকের আসনে ছিল পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতাযুদ্ধ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। মাতৃভূমিকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে অকাতরে রক্ত দিয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। জাতির যেকোনো সংকটে ন্যায়, সাম্য ও সুবিচারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠ। এমনকি একাত্তরের পরে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ যেসব গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে সেগুলোতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস ধারণ করে আছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নির্মিত ভাস্কর্য ও স্থাপনাগুলো।
স্মৃতি চিরন্তন : ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে চরম ত্যাগ স্বীকার করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য এমন ত্যাগ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শহীদ সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ‘স্মৃতি চিরন্তন’ স্মৃতিফলকটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৫ সালে। স্থাপনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোর সামনে (ভিসি চত্বর) অবস্থিত। কালো গ্রানাইটে নির্মিত এই স্থাপনায় ঢাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯৫ জন শহীদের নাম লেখা আছে। পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে কংক্রিটের দেয়ালে বসানো পোড়ামাটির ফলকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নামের তালিকা দিয়ে খোদাই করা ছিল জায়গাটি। তাই সেই সময়ে পরিচিতি পায় শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বর নামে। পরে ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনর্নির্মাণ করে নাম পরিবর্তন করে ‘স্মৃতি চিরন্তন’ রাখে। এটি নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন স্থপতি মহিউদ্দিন সাকের।
অপারেজয় বাংলা : বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পাদদেশে ও ঐতিহাসিক বটতলার সামনে এ ভাস্কর্য অবস্থিত। ভাস্কর্যটি বাংলাদেশের সর্বাধিক পরিচিত অন্যতম ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনতার অবদানকে তুলে ধরতে তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বরূপ চিত্রিত এই ভাস্কর্যে। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী। অপরাজেয় বাংলার মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু, রাইফেল হাতে দাঁড়ানো মডেল সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে এবং নারী মূর্তির মডেল হাসিনা আহমেদ। ১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর ভিপি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস মাহবুব জামান তথা ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়। এখনও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও শিক্ষক সমিতির বিভিন্ন অনুষ্ঠান অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত হয়। অপরাজেয় বাংলার নির্মাতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ।
রাজু ভাস্কর্য : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের মাঝখানে রাজু ভাস্কর্যের অবস্থান। এই ভাস্কর্যের পুরো নাম ‘সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্য’। বর্তমানে বাংলাদেশের যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিবাদ, সভা কিংবা গণজমায়েত হয়ে থাকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে। ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল চলাকালে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের গুলিতে মিছিলে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা মঈন হোসেন রাজু নিহত হন। তারই নামানুসারে বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের স্মরণে নির্মিত এই ভাস্কর্য ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী। ভাস্কর্যটিতে ৮ জন প্রতিবাদী মানুষের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ভাস্কর্যটির নির্মাতা ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী ও গোপাল পাল।
স্বাধীনতা সংগ্রাম : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও বুয়েট সংলগ্ন সড়ক দ্বীপে স্থাপিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য। শামীম শিকদার এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যটি বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাসকে ভিত্তি করে নির্মিত। ভাস্কর শামীম সিকদার ১৯৮৮ সালে ফুলার রোডে অবস্থিত সেকেলে বাংলো স্টাইলের বাড়ির (বর্তমানে প্রোভিসির ভবন) সামনে পরিত্যক্ত জায়গায় ‘অমর একুশে’ নামে একটি বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ঘরোয়া পরিবেশে প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ শরীফ এটি উদ্বোধন করেন। ১৯৯৮ সালে ওই স্থানে উদয়ন স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ শুরু হলে ভাস্কর্যটি স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়। ভাস্কর্যটি সড়কদ্বীপে এনে রাখা হয়। পরে শামীম সিকদার ওই ভাস্কর্যটির অবয়ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নাম দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আলোকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন। ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যকে ঘিরে রয়েছে দেশ-বিদেশের ১১৬ জন কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী, রাজনীতিক, বিজ্ঞানীর আবক্ষ ভাস্কর্য। এসব ভাস্কর্যের কোনোটি একক, কোনোটি যুক্ত।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির উত্তর-পশ্চিমে ডাসের পেছনে ও রোকেয়া হলের পূর্বপাশে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটি। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ ভাস্কর্যটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ভাস্কর্যের একপাশে রয়েছেন একজন কৃষক, মাঝখানে অস্ত্রধারী নারী ও পুরুষ যোদ্ধা। অন্যপাশে আরও দুই মুক্তিযোদ্ধা। বিজয়ী বেশে তারা ছুটে চলেছেন। ভাস্কর্যের বেদির চারপাশে ৪ ফুট উঁচু দেয়ালচিত্র রয়েছে। দেয়ালচিত্রে স্থান পেয়েছে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক। যুদ্ধ চলাকালে বুদ্ধিজীবী নিধন, নারী নির্যাতনের মতো বর্বর দিক ছাড়াও রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের ছবি, রয়েছে পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণের ছবি। ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’র নির্মাতাও শামীম শিকদার।
মধুদার ভাস্কর্য : বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির আঁতুড়ঘর নামে পরিচিত মধুর ক্যান্টিনের সামনে এই ভাস্কর্য অবস্থিত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ মধুসূদন দের স্মরণে নির্মিত এ ভাস্কর্যটি। ১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমেদ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন। পরে ভাস্কর্যটি পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং ২০০১ সালের ১৭ মার্চ পুনর্নির্মিত ভাস্কর্য উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী। মধুদার ভাস্কর্যের নির্মাতা মো. তৌফিক হোসেন খান।
সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা : সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর সন্তান চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরের স্মৃতির স্মরণে নির্মিত এই স্মৃতিফলকটি শামসুন্নাহার হলের পূর্বে এবং টিএসসির পশ্চিম পাশে টিএসসির সড়কদ্বীপে অবস্থিত। সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা ভাস্কর্যের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও নির্মাণ করেন ওই দুর্ঘটনায় আহত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের শিক্ষক শিল্পী ঢালী আল মামুন। স্মৃতিস্থাপনাটির নকশা প্রণয়ন করেন স্থপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ। স্মৃতিফলকটি তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, ব্র্যাক ও ব্র্যাক ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত। ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর স্মৃতিফলকটি উন্মোচন করা হয়।
ঘৃণা স্তম্ভ : ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা বাঙালি হয়েও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে, রাজাকার, আলবদর, আলশামসের হয়ে পাকিস্তানিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি হত্যা করেছে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনে নির্মিত হয় ঘৃণা স্তম্ভ। ডাকসু ভবনের সামনে অবস্থিত ঘৃণা স্তম্ভ ২০১৭ সালে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে উদ্বোধন করেন ঢাবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।
এ ছাড়াও রাউফুন বসুনিয়া ভাস্কর্য, সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, নিঝুম স্থাপত্য, চারুকলার জয়নুল স্মৃতি ভাস্কর্য, শামসুন নাহার হলের পাশে অবস্থিত শহীদ মিজান ভাস্কর্য, স্বামী বিবেকানন্দ ভাস্কর্য, সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, শান্তির পায়রা, বেগম রোকেয়া ভাস্কর্য, মা ও শিশু ভাস্কর্য, বৌদ্ধ ভাস্কর্যসহ আরও কিছু ভাস্কর্য রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।