আর কয়েকদিন পরই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঝিনাইদহ-২ আসনে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিভেদের কারণে হামলা মামলায় আহতের ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে দিনদিন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। নির্বাচন দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে ভোটের মাঠে। ২১ টি ইউনিয়ন এবং ২ টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনটি।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৩০০ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৩ এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৭৬২ জন। ১৮৫ টি ভোট কেন্দ্রে ১০৯৫ টি ভোট কক্ষে ভোটারগণ তাদের ভোট প্রদান করবেন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী দুই বার নির্বাচিত তাহজিব আলম সিদ্দিকী নৌকা প্রতীকসহ ১১ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন।
অন্যান্য প্রার্থী হলো- জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মাহফুজুর রহমান, স্বতন্ত্র প্রার্থী নাসের শাহরিয়ার জাহেদি মহুল ঈগল প্রতীক, জাসদের মশাল প্রতীক নিয়ে ফজলুল কবির গামা, তৃণমূল বিএনপির জামরুল ইসলাম বাংলাদেশ কংগ্রেস ডাব প্রতীক নিয়ে নাসির উদ্দীন, বিএসপি একতারা প্রতীক নিয়ে নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের ছড়ি প্রতীক নিয়ে শরীফ মোহাম্মদ বদরুল হায়দার, এনপিপির আম প্রতীক নিয়ে মিজানুর রহমান মিজু, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির হাতঘড়ি প্রতীক নিয়ে আব্দুল হান্নান খা এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) সমর্থিত কুঁড়েঘর প্রতীক নিয়ে খোন্দকার হাফিজুর রহমান ফারুক নিয়ে ভোট করছেন।
তবে এসকল প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকার প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যে তাহজিব আলম সিদ্দিকীর নৌকা প্রতীকের সাথে হেভিওয়েট স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদি মহুলের ঈগল প্রতীকের সাথে মূল লড়াই হবে বলে আশা করছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভোটারগণ।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগ নেতাকর্মী নৌকা প্রার্থীর সমর্থন ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ঈগল প্রতীকে অবস্থান নিয়েছে। যে কারণে নৌকা জয়লাভের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ঈগল প্রতীক। তাদেরই ভোট ভাগাভাগি হবে। যে কারণে কোন্দল ও বিভক্ত দেখা দিয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যে। তবে নৌকা প্রতীকের নেতাকর্মীরা বলছেন, সকল দলেই কিছু সুবিধাবাদী নেতাকর্মী থাকে। তারা মূলত নীতি-বির্জিত, ভোটারগণ তাদের চেনেন, তাদের কথায় খুব একটা প্রভাব পড়বে না। অনেকেই বলছে শেখ হাসিনার নৌকা আর এই নৌকা এক নয়। ২০১৪ সালে এই সমি সিদ্দিকী আনারস প্রতীক নিয়ে নৌকা প্রতীককে ফেল করিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে উভয় পক্ষই জয়ের আশা করছেন।
অন্যদিকে নির্বাচনকে বর্জনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপি লিফলেট বিতরণ করে তাদের পা ভারী করার চেষ্টা করছে। এই আসনে বিএনপির রাজনৈতিক দলের গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। যে কারণে তাদের নেতাকর্মীদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের উপস্থিতি ঘটাতে পারলে সুফল আসতে পারে।
আসনটিতে নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, ১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীক নিয়ে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাসদের শফিয়ার রহমান। তবে পরবর্তী সময়ে এই বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তি আর নির্বাচিত হতে পারেনি। ১৯৭৯ এর নির্বাচনে আসনটি আইডিএল পার্টির দখলে চলে যায়। সেবার মাওলানা নূর নবী সামদানি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির মশিউর রহমান। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আসনটি জাতীয় পার্টির আনোয়ার জাহিদ নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রার্থী হিসেবে ছিলেন আওয়ামী লীগের আয়ুব হোসেন। ১৯৮৮' র নির্বাচনে আসনটি আবারও জাতীয় পার্টির দখলে চলে যায়। সেবার আশরাফুল আবেদীন আশা মিয়া নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রার্থী হিসেবে ছিলেন জাসদের শফিয়ার রহমান। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে নির্বাচনে আসনটি বিএনপির মসিউর রহমান নির্বাচিত হন। ১৯৯১ আওয়ামী লীগের মতিয়ার রহমান, ১৯৯৬ এবং ২০০১ আওয়ামী লীগের নূরে আলম সিদ্দিকী নিকটতম প্রার্থী ছিলেন।
২০০৮ সালে আসনটি আবার আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়। সেবার আওয়ামী লীগের শফিকুল ইসলাম অপু নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রার্থী ছিলেন বিএনপির মসিউর রহমান। ২০১৪ সালে আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাহজিব আলম সিদ্দিকী সমী, আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকার প্রার্থী শফিকুল ইসলাম অপুকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী এম এ মজিদ আইনের জটিলতায় পড়ে তার প্রার্থিতা বাতিল করলে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকার প্রার্থী তাহজিব আলম সিদ্দিকী জয়লাভ করেন।