একটা সময়ে বিয়েসহ সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাঁসা-পিতলের বাসন উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। ওজন ও নকশা দিয়ে মূল্যায়ন হতো নিখুঁত নকশার এসব তৈজসের। টেকসই, মজবুত ও দামে কম হওয়ায় প্রতিটি বাড়িতে কমবেশি ধাতুর তৈরি এসব বাসন প্রতিদিনই ব্যবহার করা হতো। কিন্তু দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে কাঁসা-পিতলে বাসনের জৌলুস হারাতে বসেছে নওগাঁয়। কর্ম হারিয়ে জীবিকার তাগিদে অনেক কারিগর চলে গেছে ভিন্ন পেশায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধাতুর তৈরি ঐতিহ্যবাহী এসব বাসন তৈরির শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা।
কাঁসা-পিতলের তৈরি তৈজস এখন রোজ ব্যবহার না হলেও উৎসব উপলক্ষে এখনও অনেকে ব্যবহার করছেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্ম পালনে কাঁসার তৈরি পূজার নানা সামগ্রী ব্যবহার করে। ব্যবহার কমলেও কদর কমেনি কাঁসার বাসনের। তবে বর্তমানে এর স্থান দখল করেছে চিনামাটি, মেলামাইন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র। এসবের দাম কম হওয়ায় মানুষ কিনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
২০০০ সালের পর থেকে কাঁসা-পিতলের চাহিদা কমতে শুরু করে। সে সময় কাঁসা ৭০০ টাকা এবং পিতল ১৮০ টাকা কেজি ছিল। বর্তমানে নতুন কাঁসা ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং পিতল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি। এ ছাড়া পুরাতন কাঁসা ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং পিতল ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। শহরের ডাবপট্টি এলাকার সঞ্চিতা মেটাল স্টোরের স্বত্বাধিকারী গোপাল সাহা বলেন, কাঁসা-পিতলকে বলা হয় রাজকীয় ব্যবসা। কাঁসা-পিতলের বাসনপত্রে মানুষের চাহিদা আছে। কিন্তু দাম বাড়ার কারণে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। গত ১০ বছর থেকে কমেছে এর জৌলুস। আগে যে ব্যবসা ছিল তার অর্ধেকে নেমে এসেছে। মূলধন হারিয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। তারপরও গড়ে প্রতিদিন ৪০ হাজার টাকার বেচাকেনা হয়। ওজন হিসাবে একটি থালার দাম পড়ে ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা, গ্লাস ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা, বাটি ৫০০ টাকা, ঘটি ১ হাজার ১০০ টাকা, বদনা ৮০০-৯০০ টাকা। অনেকে অর্ডার করে বড় বাসন তৈরি করে নেয়, তখন দামও বেশি হয়।
নওগাঁ বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক শামীম আক্তার মামুন বলেন, সব ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সহযোগিতা করে থাকে বিসিক। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা যদি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ, মার্কেটিং এবং বিনিয়োগ করতে চান তবে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। সম্ভাবনাময় এই শিল্প টিকিয়ে রাখার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
নওগাঁ শহরের পুরাতন আলুপট্টি একটা সময়ে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাতুড়ির টুং টাং শব্দে মুখর থাকত। এখানে ছোট-বড় প্রায় ২০টি কারখানা ছিল। শতাধিক কারিগর কাজ করতেন এসব কারখানায়। সময়ের ব্যবধানে এখন মাত্র ৫টি কারখানা টিকে আছে, যেখানে কাজ করছেন মাত্র ১২ জন কারিগর। তাদেরই একজন বোয়ালিয়া গ্রামের কাজল হোসেন। তিনি বিগত ৩০ বছর ধরে কাঁসা-পিতল থেকে বিভিন্ন বাসন তৈরির কাজ করছেন। নতুন ধাতুর বাসন তৈরি না হলে পুরাতন বাসনকে ঘষামাজা করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনোরকমে চলছে তার সংসার। কারিগর আবদুর রহিম বলেন, দিন দিন কারিগরদের সংখ্যা কমছে। তারা এখন ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি কারখানা আছে। আগামী কয়েক বছরে সেগুলোও বিলীন হবে যাবে।
সময়ের আলো/আরএস/