ঢাকা-৭: পুরান ঢাকা বদলে দিতে চান সোলায়মান সেলিম

সারাদেশ

পুরান ঢাকা মানেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক বাহক। সুলতানি, মোগল সভ্যতা, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে ইতিহাসের নিদর্শনের

2024-01-04T01:46:04+00:00
2024-01-04T01:46:04+00:00
 
  রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬,
২১ আষাঢ় ১৪৩৩
রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ঢাকা-৭: পুরান ঢাকা বদলে দিতে চান সোলায়মান সেলিম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৪, ১:৪৬ এএম 
ঢাকা-৭: পুরান ঢাকা বদলে দিতে চান সোলায়মান সেলিম
পুরান ঢাকা মানেই ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক বাহক। সুলতানি, মোগল সভ্যতা, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে ইতিহাসের নিদর্শনের এক জীবন্ত সাক্ষী যেন সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছু বিলুপ্তির পথে, তবুও ‘আদি ঢাকাইয়া’ বলতে সবাই এই এলাকার মানুষকে এক নামে চিনে থাকেন। আর এ আসন থেকে যিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, পুরান ঢাকায় তারই বেশি আধিপত্য থাকে। রাজধানীর লালবাগ, চকবাজার, বংশাল ও কোতোয়ালি থানার একাংশ নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ঢাকা-৭ আসন। বিগত নির্বাচনগুলোতে এ এলাকায় বিজয়ী হতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থাকে তীব্র প্রতিযোগিতা। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।

স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, ঢাকা-৭ আসনে মোট ৬ জন প্রার্থী। এখানে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রার্থী মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিম ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর তেমন প্রচার নেই। পাড়া-মহল্লায় নেই কোনো উৎসবের আমেজ। কারণ বিএনপি নির্বাচনে না আসায় নির্বাচনে অনেকের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে প্রচারে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ করেছেন লাঙ্গলের প্রার্থীর সমর্থকরা। প্রচারে ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে কিন্তু ভয়ে মুখ খুলছেন না এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে। 

মঙ্গলবার সরেজমিন এই আসনে নৌকার প্রার্থীর সঙ্গে এক বেলা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বিভিন্ন অভিযোগের সত্যতাও মিলল। তবে অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এ নির্বাচনে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মাধ্যমে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিম নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। এ ছাড়াও জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী হাজি মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন (লাঙ্গল), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের নূর জাহান বেগম (ছড়ি), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোহাম্মদ আফসার আলী (একতারা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মাসুদ পাশা (আম), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) হাজি মোহাম্মদ ইদ্রিস বেপারি (মশাল) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। শুধু নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনি পোস্টার ব্যানার ও অফিস থাকলেও অন্য কোনো প্রার্থীর কোনো অফিস চোখে পড়েনি। তবে কিছু কিছু এলাকায় লাঙ্গলের প্রার্থীর পোস্টার এবং ব্যানার দেখা গেলেও নির্বাচনি মাঠে প্রচারে কিংবা পোস্টার-ব্যানার দেখা যায়নি অন্য ৪ প্রার্থীর।

জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকা ১৮০ (ঢাকা-৭) আসনটি রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী লালবাগ, চকবাজার থানা, বংশাল এবং কোতোয়ালি থানার একাংশ নিয়ে গঠিত। এর সীমানা হচ্ছে পূর্বে নাজিরাবাজার, পশ্চিমে হাজারীবাগ, উত্তরে পলাশী ও দক্ষিণে কামরাঙ্গীরচর। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৫ এবং ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড এ আসনে পড়েছে। ঢাকা-৭ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮১ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৩৮ জন আর নারী ভোটার ছিলেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৫০ জন এবং একজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার।

মঙ্গলবার পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার অলিগলি, রাস্তাঘাট, বাজার, এলাকা-সবকিছুই যেন গলা উঁচিয়ে জানান দেয় তার অতীত-জৌলুসের কথা। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে পুরান স্থাপনাগুলো যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনই যেন হারাতে বসেছে ইতিহাসের সব সাক্ষ্য। ঘিঞ্জি, জনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে। একটি ভবন তৈরি হয়েছে আরেকটি ভবন ঘেঁষে, কোনো ফাঁকা জায়গা রাখা হয়নি। রাস্তাঘাটও সরু হওয়ার কারণে দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্প ও ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলাসহ রাস্তা প্রশস্ত করা এবং জলাবদ্ধতার নিরসন চান ভোটাররা।

৩২, ৩৩, ৩৫নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বড় বড় ছবি সংবলিত ব্যানার, পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড ছাড়া আর কোনো প্রার্থীর পাড়া-মহল্লায় নেই তেমন প্রচার। তবে ব্যানার, পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড টাঙানোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আচরণবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে। এমনকি ফুটপাথ ও সড়কের জায়গায় মানুষের চলাচলের পথ সংকুচিত করে নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনি ক্যাম্প (কার্যালয়) করা হয়েছে। অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী কোনোভাবেই একটির বেশি নির্বাচনি কার্যালয় (ক্যাম্প) করতে পারেন না। একইভাবে বিধিতে বলা আছে, কোনো সড়কে কিংবা জনগণের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে কোনো প্রার্থী নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন না। 

৩২নং ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি নির্বাচনি ক্যাম্প রয়েছে। তার মধ্যে একটি কেপি ঘোষ স্ট্রিটের প্রধান নির্বাচনি ক্যাম্প-যা রাস্তা দখল করে বসানো হয়েছে। এখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ এবং ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনের নেতাদের ব্যানারে বিশাল বড় বড় রঙিন ব্যানার টাঙানো হয়েছে। একইভাবে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে কাপড় ও বাঁশ দিয়ে বেশ কিছু নির্বাচনি ক্যাম্প করা হয়েছে হয় ফুটপাথে, না হয় রাস্তার জায়গা দখল করে। এ ছাড়া পোস্টারে-ব্যানারে ঢাকা-৭ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য হাজি সেলিমসহ স্থানীয় নেতাদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

অথচ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণবিধিমালা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় কোনো ওয়ার্ডে একজন প্রার্থী কোনোভাবেই একটির বেশি নির্বাচনি কার্যালয় (ক্যাম্প) করতে পারেন না। এ ছাড়া আচরণবিধি অনুযায়ী, কেবল প্রার্থীর ও প্রতীকের ছবি পোস্টারে থাকার কথা। রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হলে পোস্টারে দলীয় প্রধানের ছবি দেওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আচরণবিধি মানা হয়নি।

এলাকার দুর্ভোগের বিষয়ে আগা সাদেক খান রোডের স্থানীয় বাসিন্দা মো. খলিলুজ্জামান বলেন, আমার বাসায় একটু বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি জমে যায়। বাসা থেকে বের হতে পারি না। দুর্গন্ধ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এলাকার উন্নয়নের কাজের জন্য যদি এমপির কাছে যাই তা হলে তিনি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে দেখিয়ে দেন। আবার মেয়রের কাছে গেলে তিনি এমপিকে দেখান। তা হলে আমরা যাব কোথায়?
নির্বাচনি প্রচার প্রসঙ্গে নাজিম উদ্দিন রোডের মুদি ব্যবসায়ী মোস্তাক হোসেন বলেন, অতীতে নির্বাচন এলেই চায়ের দোকান, বাসাবাড়ির প্রার্থীর সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের মাঝে এক ধরনের উৎসবের আমেজ দেখা যেত। এমনকি চায়ের চুমুকে প্রার্থীদের চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো, উত্তপ্ত থাকত। মিছিল-মিটিং আর মাইকের আওয়াজে সরগরম হয়ে উঠত পুরো এলাকা। কিন্তু এবার তার ছিটেফোঁটাও নেই। নৌকা ছাড়া পাড়া-মহল্লায় তেমন প্রচার নেই।

বকশীবাজার রোডের বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম বলেন, এটা কোনো নির্বাচন হলো। একতরফা নির্বাচনে আবার কোনো ভোট আছে নাকি? মানুষের ভোটের অধিকার আছে নাকি? শুধু একজনেরই প্রচার। নমিনেশন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো অটো পাস। এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়াই শুধু বাকি।

আবুল হাসনাত রোডের বাসিন্দা হ্যাপি আকতার বলেন, এখন আর নির্বাচনে আমাগোর ভোট লাগে না। সবাই জানে এখানে নৌকার প্রার্থী বিজয়ী হবেন। আমরা ভোট দিলেও হবেন, না দিলেও হবেন। তাই ভোট নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না।

তবে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার চ্যালেঞ্জ থাকলেও মানুষ উৎসবমুখর ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেবেন বলে মনে করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৩২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা হাজি এমএ মান্নান। 
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ভোটার কেন্দ্রে আনতে বাড়ি বাড়ি প্রচারও চালানো হচ্ছে এবং ভোটের দিন প্রতি কেন্দ্রের জন্য একটি করে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। 

ঢাকা-৭ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের ছেলে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিম মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ৩২নং ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি প্রচারে নামেন। তবে তার প্রচার চালানোর সময় আগে-পিছে বিশাল মোটর সাইকেল ও গাড়ির বহর দেখা যায়। মাইকে বাজানো হয় নানা ধরনের গান। এ সময় ব্যান্ড পার্টির সদস্যদের বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নেচে গেয়ে নৌকার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন তার কর্মী-সমর্থকরা। 

প্রচারের এক পর্যায়ে আরমানিটোলার এইচ এম হোসেন জামে মসজিদের সামনে মুসুল্লিদের কাছে ভোট প্রার্থনা করেন এবং প্রচারপত্র বিলি করেন। পরে আরমানিটোলা স্ট্রিটে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেখা করে তাদের সমর্থন ও ভোট প্রার্থনা করেন। 

এ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিম সময়ের আলোকে বলেন, মানুষ ভোটকেন্দ্রে আসতে মুখিয়ে আছে। দীর্ঘ দিন ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় ঢাকা-৭ আসনের সব এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তাই আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আমার বাবা হাজি সেলিমের প্রতি মানুষ আস্থা রাখবে। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার এই ধারাহিকতা রক্ষায় আবারও মানুষ নৌকায় ভোট দেবে। আমাদের এলাকার তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে নিয়ে পুরান ঢাকাকে বদলে দিতে চাই।

এ সময় পুরান ঢাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে এবং নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রমে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়েই চলে যান।


সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: