দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ-১ (সাপাহার-পোরশা-নিয়ামতপুর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন আ'লীগ নেতা খালেকুজ্জামান তোতা। তিনি নিয়ামতপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সদস্য ও ৫বারের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। এ আসনটিতে আওয়ামীলীগের হেভিওয়েট প্রার্থী নওগাঁ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের বিপক্ষে ট্রাক প্রতীক নিয়ে ভোট যুদ্ধে নামেন তিনি। নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় এলাকায় বেশ সরবও হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোটের লড়ায়ে আর টিকতে পারেন নি।
১লাখ ১০হাজার ১৭১ ভোটের ব্যবধানে তাকে পরাজিত হতে হয় খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্রের কাছে। ভোটে হেরে পরদিন (৮ জানুয়ারি) বিকেলে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পেইজে “প্রশাসনের অসহযোগিতা, জাল ভোট প্রদান এবং এ নির্বাচনকে ম্যানেজড নির্বাচন” উল্লেখ করে বেশ লম্বা একটি আবেগঘন পোষ্ট করেন তিনি।
নিচে সেই পোষ্ট হুবহু তুলে ধরা হল :
“প্রিয় এলাকাবাসী,আপনাদের সবাইকে আমার আন্তরিক সালাম। আসসালামুয়ালাইকুম। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হয়েছে, কি তার ফলাফল আপনারা সকলেই অবগত আছেন। নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি তার জন্য আমি চির কৃতজ্ঞ। আপনাদের এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারবো কিনা জানিনা। হয়তো এই ঋণের বোঝা নিয়েই মৃত্যু বরণ করবো। আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা ভিক্ষা চাই। কারণ আমি আপনাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা দিয়ে কথা রাখতে পারিনি। আপনাদের মূল্যবান ভোটের নিরাপত্তা আমি দিতে পারিনি। আপনারা যারা জুলুমের শিকার তাদেরকেও রক্ষা করতে পারিনি যদিও আমি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে। আপনাদের পরম ভালোবাসার বিনিময়ে সবাইকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার যে পাপ সেটা অমোচনীয়।
যাই হোক, এবারের নির্বাচন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কি ঘটেছে সবটাই আপনারা কম বেশি জানেন। আমি যখন যেখানে প্রচারণায় গেছি প্রায় সব জায়গায় আমাকে বিভিন্ন ভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে অশ্লীল কায়দায়। আমার কর্মী সমর্থকদের উপর হামলা, হুমকি পোষ্টার-ব্যানার ছিড়া, কন্ট্রোল রুম ভাঙচুর ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। আমার একজন সমর্থক কে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে প্রচারণার শুরুতে যাতে আমার পথচলা মসৃণ না হয়। তাকে নাশকতার মামলা দিয়ে বিএনপি বানানো হয়েছে অথচ সে একজন সাবেক যুবলীগ নেতা। এসব কোন ব্যাপারে আমি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন সুষ্ঠু পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ দেখিনি। তারা শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়েই খালাস। এত সব কার নির্দেশে ঘটেছে সেটা আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখেনা।
গতকাল ভোটের সারাদিন যা ঘটেছে তা আইন, নৈতিকতা, রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ অশ্লীলতা বলেই ধরা যায়। শুরুতেই আমার এজেন্টদের ভয় ভীতি প্রদর্শন করার মাধ্যমে তাদেরকে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আমি প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা পাই নি। এক এলাকার ভোটার অন্য এলাকায় গিয়ে অনুপস্থিত ভোটারদের ভোট দিয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে বল প্রয়োগ করে জাল ভোট দেওয়া হয়েছে প্রকাশ্যে। আমার ভোট বাতিল করা হয়েছে কোন কারণ ছাড়াই এবং জোরপূর্বক আমার এজেন্টের কাছ থেকে স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়েছে। এসব করা হয়েছে আনঅফিসিয়াল ভাবে। ভোট বিবরণীতে এসব বাতিল ভোটের কোন উল্লেখ নাই।
এসবের প্রতিটি ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসন অবগত ছিলেন এবং নীরবতা পালন করে গেছেন। দ্বায়িত্বরতদের বারবার কল দিয়েও পাইনি। সর্বাবস্থায় আমাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এত সব ঘটনা একটাই কথা বলে, আর সেটা হচ্ছে “এই নির্বাচন ম্যানেজড একটা নির্বাচন”। আমার ব্যাপক জনপ্রিয়তার বিপরীতে নৌকা প্রার্থীর একটাই করণীয় ছিল সেটা উনি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে নিজের আয়ত্তে নিয়েছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলা হলেও সেটা মূলত একটা ট্র্যাপ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়ে উঠা আমার মত পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ সেই ট্র্যাপের দশ দিগন্ত সম্পর্কে কিছুই জানবে না এটাই স্বাভাবিক।
মানুষ হয়ে জন্মেছি মানব হওয়ার জন্য। এই পথে যারা ভালবেসেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যারা ঘৃণা করেন, তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।”
এই পোষ্টে বেশ কিছু চমৎকার মন্তব্যও পড়ে। শিমুল রেজা নামের এক ব্যক্তির একটি মন্তব্যের প্রতি উত্তরে কিছু ভয়াবহ তথ্যও উঠে এসেছে। নওগাঁ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য মো: সাকিল সে ব্যক্তির মন্তব্যের প্রতি উত্তরে লিখেন- “যদি ব্যাখ্যা চান তাহলে আমার থেকে শুনতে পারেন সংক্ষেপে বলি তোতা চেয়ারম্যান কে নাম মাত্র নমিনেশন দেওয়া হয়েছিলো ওনাকে খুশি করার জন্য। যদি নমিনেশন না দেয় পরবর্তী সময়ে হয়তো সাধন বাবুর বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে পারে তাই ওনাকে নাম মাত্র নমিনেশন দেওয়া হয়েছিলো। এবং ওনি যেন না হতে পারে তার সব ব্যবস্থা প্রশাসনিক ভাবে করেছিলো এবং এই পরিকল্পনা হয়েছে আমার সামনে নিয়ামতপুর উপজেলা পরিষদের ভিতরে। উপজেলা চেয়ারম্যান ফরিদ সাহেব এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব ভাই মিলে। এখন বলতে পারেন আমি কি করছিলাম ওখানে সেটা একটা রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ বিষয় সবার সামনে আর না প্রকাশ করলাম। বুঝে নিয়েন নওগাঁ থেকে কেন আমাদের নেওয়া হয়েছিলো।
এবং প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়নে আমাদের ভাগ করে দেওয়া হয়েছিলো শুধু চন্দন নগর (তোতার নিজ ইউনিয়ন) বাদে আমার নেতৃত্ব ছিলো পাড়ইল ইউনিয়ন গ্যান্ধা চেয়ারম্যানের ভাতিজা হামলেট। সে এসে উপজেলা থেকে রিসিভ করে ওনাদের বাসায় নিয়ে গেল রাতে সেখানে খাওয়ার পরে ঘুমিয়ে সকালে সেন্টারে সেন্টারে সবাইকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। নওগাঁ থেকে সেদিন ৪টি কার গেছিলাম বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন ইউনিয়নে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। ওনাদের কথা শুনে যা বুঝেছি সেটা হল তোতা চেয়ারম্যান উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করতে চেয়েছিল সেটাই দোষ”
গত চারদিন আগে খালেকুজ্জামান তোতা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ থেকে অপর একটি পোষ্টে লিখেন, “ক্ষমতার অপব্যবহারে যে ব্যক্তি লীগ গড়ে উঠেছে তাতে আমরা দিনশেষে ভুলে যাই যে আমরা মানুষ। এটাকেই হয়তো রাজনীতির নিকষ কালো অন্ধকার বলে। সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর। আপনাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তই পারে রাজনীতি থেকে শুরু করে সকল রকম সামাজিক কাঠামো সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনা করার।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খালেকুজ্জামান তোতা বলেন, ফেসবুকে আমি যা লিখেছি তা শতভাগ সঠিক। আমাকে পরিকল্পিত ভাবে হারানো হয়েছে। নির্বাচনের দিন আমি প্রশাসনের পক্ষথেকে কোনোরূপ সহযোগিতা পাইনি। অনেক কেন্দ্র আমার এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। সাপাহার উপজেলার আইহাই ও পাতাড়ি এলাকায় আমার এজেন্টদের বাবা, মাকে ভয় দেখিয়ে হুমকি দিয়ে আমার এজেন্টদের বের করে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, নওগাঁর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার নির্বাচনের আগে প্রিজাইডিং অফিসারদের নির্দেশনা দেন যে করেই হোক ৬০% ভোট দেখাতে হবে। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার আমাকে বলেছে আপনারা যদি অভয় দেন তাহলে কিছু ব্যালট ঢুকাতে হবে। কারণ ১৮-১৯% ভোট পড়েছে আপনার ট্রকের কিছু এবং নৌকার কিছু ব্যালট দিয়ে ৬০% দেখাতে হবে। আমি সরাসরি না করেছি যে অন্যায় ভাবে একটি ভোটও বাক্সে ঢুকানো যাবেনা যেটুকু পড়েছে পড়েছে দরকার নেই কিন্তু তারপরেও খাদ্যমন্ত্রী তার পাওয়ার খাটিয়ে ব্যালট ঢুকাইছে। প্রায় ৪০% নৌকার সিল মেরে ব্যালট কেটে জাল ভোট ঢুকানো হয়েছে।
এ নির্বাচনকে পাতানো নির্বাচন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ১০০% সরকারের পাতানো নির্বাচন। নওগাঁ-১ আসনে জেলার বর্তমান ডিসি ও এসপি বর্তমান এমপির হয়ে কাজ করেছে। ডিসি প্রত্যেকটা ইউএনও কে বলে দিয়েছে। এবং ইউএনও প্রত্যেক প্রিজাইডিং অফিসারকে বলে দিয়েছে নৌকার ব্যালট ঢুকানোর জন্য। বর্তমান এমপি কয়েক কোটি টাকা দিয়ে প্রিজাইডিং অফিসারদের কিনে নিয়েছে। ফলে তারা ব্যালট কেটে কেটে নৌকার বাক্স ভর্তি করেছে।
উল্লেখ্য, এ আসনের ১৬৫টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফল থেকে জানাযায়- সাধন চন্দ্র মজুমদার পেয়েছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯০০ভোট। অন্যদিকে তারা নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী খালেকুজ্জামান তোতা ট্রাক প্রতীকে পেয়েছেন ৭৬ হাজার ৭২৯ ভোট।
সাধন চন্দ্র মজুমদার ও খালেকুজ্জামান তোতা ছাড়া এ আসনে ভোটে লড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাজেদ আলী (ঈগল) ও জাতীয় পার্টির আকবর আলী কালু। এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯৬১। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২৭জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২৭ হাজার ১২১ ও হিজড়া ভোটার তিনজন।
এ আসনটিতে জেলার সব'কটি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট প্রদান করেছেন ভোটাররা। এ আসনে ৬১.৬০% ভোট কাস্ট হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা গোলাম মওলা।