যত্রতত্র স্থাপন করা হচ্ছে পরিকল্পনাহীন ক্ষতিকর ইটভাটা। অনুমোদনহীন এ সকল ইটভাটায় পুড়ছে গাছ। সে গাছের ধোঁয়ার কারণে ধ্বংস হচ্ছে জনবসতি এলাকার সামাজিক পরিবেশ। ইটভাটার আশপাশে বসবাসরত মানুষ রয়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। দিনে দিনে এসব ভাটাগুলোর সম্প্রসারণে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি। যেকোনো স্থাপনা না অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হচ্ছে ইট। তবে ইট তৈরি করতে গিয়ে পরিবেশ দূষণের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে জলবায়ুর পরিবর্তন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এক বীভৎস চিত্র নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায়।
বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, হাতিয়ায় সব মিলিয়ে ২০টির মত ইটভাটা রয়েছে বলে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি ইটভাটা রয়েছে পৌরসভাসহ ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকায়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়ে এবং অনুমোদনহীন ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিব্বি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ভাটার মালিকেরা। কোন কিছুর তোয়াক্কাই করছে না তারা। একদিকে বনের কাঠ দেদারছে কাটছে অন্যদিকে ফসলি জমির মাটি কেটে নষ্ট করছে কৃষি জমি। ইটভাটার মালিকদের এহেন কর্মকাণ্ডে প্রশাসন যেন নির্বিকার।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে ইটভাটার অবদান রয়েছে সত্য। তবে জিগজাগ বা পরিবেশ বান্ধব আধুনিক ইটভাটা স্থাপন না হলে লাভের চায়তে ক্ষতির দিক বেশী হবে। ইটভাটা থেকে নির্গত কার্বনডাইঅক্সাইড অন্যতম গ্রিনহাউজ গ্যাস। অনবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বনায়ন ধ্বংসের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ লাগামহীনভাবে বেড়েই চলছে। যদি অপরিকল্পিত ইটভাটা স্থাপনের কারণে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে জলবায়ুর পরিবর্তন জনিত প্রভাব মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বাড়ছেই।
হাতিয়া পৌরসভা ২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ভুক্তভোগী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মোতালেব বলেন, মানুষের বসবাসের সীমানায় কিভাবে ইটভাটা স্থাপন করা হয় এবং কোন অদৃশ্য শক্তির বলে এগুলো হচ্ছে, সে সাথে প্রশাসন কেন নীরব থাকছে তা আমার বোধগম্য নয়।
তিনি আরো বলেন, আমার বাড়ীর উত্তরপাশে ৫০ ফুট উচ্চতায় ৩টি ও পূর্ব পাশে ১২০ ফুট উচ্চতা ১টি ইটভাটার রয়েছে। এই ৪টি ইটভাটার চিমনির ধোঁয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছে। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠার পর দেখা যায় গাছের পাতা থেকে কুয়াশার সাথে হলুদ কাদা ঝরে পড়ে। বাইরের চুলাতে রান্না বান্না করা যায় না। কাপড়-চোপড় শুকাতে দিলে হলুদ বর্ণের ধুলার আবরণ পড়ে। খুশ খুশে কাশিসহ শ্বাস প্রশ্বাসের রোগী ঘরে ঘরে বেড়েই যাচ্ছে।
হাতিয়ায় আবাসিক এলাকায় অনেকগুলো ইটভাট স্থাপন করা হয়েছে। ভাটার মালিকেরা এসব জায়গা থেকে ইটভাটাগুলো সরিয়ে নিতে খুব একটা আগ্রহী নয়। ফলে দেখা যাচ্ছে, এর আশপাশে বসবাস কৃত মানুষ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সে সাথে ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনধারণ দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৌমেন সাহা বলেন, পরিকল্পনাহীন যত্রতত্র ইটভাটার কালো ধোঁয়ার প্রভাবে সর্দি কাশি, অ্যাজমা প্রভৃতি শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাসহ ফুসফুস সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়াও ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে গর্ভবতী মায়েদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাধারণত কৃষি জমির উপরের মাটিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতির কারণে ফসল উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ওই উপরের মাটি দিয়েই সাধারণত ইট তৈরি করা হয়। এতে করে জমির উর্বরতা শক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের ওপর মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে।
হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল বাছেদ সবুজ জানান, তিন ফসলি জমিতে পরিকল্পনাহীন ভাবে ইটভাটা স্থাপনের ফলে ফসল উৎপাদনে হুমকির কারণ হয়ে পড়েছে। আবাদি ফসলের গাছের পাতায় বালির স্তর পড়ায় সঠিক ভাবে সূর্যকিরণ পড়তে পারে না। যার ফলে দিন দিন এসব এলাকায় ফসলের উৎপাদনে বিঘ্নতার সৃষ্টি করছে।
হাতিয়া বন বিভাগের কর্মকর্তা নলচিরা রেঞ্জার মো. আলাউদ্দীন জানান, হাতিয়ায় সম্ভবত কোন জিগজাগ ইটভাটা নেই। যার কারণে খড়ি বা কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কোন অবস্থাতেই সংরক্ষিত বনের কাঠ ব্যবহারের বিষয়ে আমাদের বনবিভাগ সতর্ক রয়েছে।
সভাপতি ফখরুখ আহমেদ জানান, হাতিয়া ১৭টির মত ইটভাটা আছে। আসলে এখানে নদী ভাঙন এলাকার গাছই মূলত প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। মানুষ জীবনের তাগিদে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইট প্রস্তুতের এই ব্যবসা চালু করে আসছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মিহির লাল সরদার এর সাথে আলাপ কালে তিনি জানান, হাতিয়ায় চলমান ইটভাটাগুলোকে কোন ছাড়পত্র দেয়া হয়নি। সেখানে জিগজাগ বা পরিবেশ বান্ধব আধুনিক কোন ইটভাটা নেয়। ২০০২ সাল থেকে এই এলাকার ইটভাটার মালিকদেরকে বলা হয়েছে যে, সরকারের বিধি মোতাবেক আইনসিদ্ধ ভাবে তারা ইটভাটা পরিচালনা করছে না। অতএব ইটভাটা গুলো বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আইন না মানার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে সুমাইয়া আকতার লাকী জানান, হাতিয়া যে ইট ভাটা গুলো রয়েছে সেগুলোর কাগজপত্র সঠিক আছে কিনা বা সরকারি যে নির্দেশনা রয়েছে সে নির্দেশনা মেনে পরিচালিত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে অতিদ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সময়ের আলো/আরআই