মৌলভীবাজারের শেরপুরে আজ ভোরে শেষ হয়েছে দুইদিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহি মাছের মেলা। নানা জাত আর আকারের মাছের সমারোহ নিয়ে শুরু হয়েছে সিলেটের সর্ববৃহৎ মাছের মেলা। কুশিয়ারা নদীর পাড়ে প্রায় ২০০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বসে এই ঐতিহ্যবাহি মেলা। মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) থেকে ১৫ জানুয়ারি ভোর পর্যন্ত এই মেলাটি চলে।
সিলেটের হাকালুকি, টাঙ্গুয়া, কুশিয়ারা নদী, হাইল হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, বড় হাওর, সুরমা ও মনু নদীসহ সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের মাছ নিয়ে আসেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাওর, নদী, বিলসহ নানা জলাশয়ের মাছ নিয়ে এখানে আসেন ব্যবসায়ীরা। কোথাও তিল পরিমাণ জায়গা খালি থাকে না, সর্বত্র মানুষের আনাগোনা। কেউ মাছ ক্রয় করছেন, কেউ বা দেখতো আসছেন। বোয়াল, আইড়, বাঘাইড়, চিতল, কাতলা, বাউশ, কালাবাউশ, রুই; ছোট-মঝারি-বড় নানা আকারের মিঠা পানির সুস্বাদু মাছ। কোনটার আকার ১৫ কেজি, কোনটা ৮ কেজি। আবার কোনোটা ৫০ কেজি ছাড়িয়ে গেছে। সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক জলাশয়ের সুস্বাদু মাছ ক্রয় করত দুর-দুরান্ত থেকে ক্রেতারা এসে ভীড় করেন এই মাছ মেলায়।
সন্ধ্যার পর বৈদ্যুতিক বাতি আর কুপির আলোয় ঝলমলে বড় বড় রুই-কাতলা আর চিতল-বোয়ালের রুপালি শরীর। পাইকার আর খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে শীতের রাতে সরগরম হয়ে ওঠে কুশিয়ারার পাড়। এর টানে মাছের মেলায় জড়ো হন দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ। এটাই এখানকার ঐতিহ্য।
মৌলভীবাজারের জেলা শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দুরে শেরপুর মাছের মেলা ঘুরে স্থানীয় মানুষের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ঐতিহ্যবাহী এই মেলা প্রতি বাংলা সনের পৌষ মাসের শেষ দিনে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে শেরপুরে আয়োজন করা হয়। এখানে রাত যত গভীর হয় বেচাকেনার হুলস্থুল ততই বাড়ে। দুর-দুরান্ত থেকে মাছ নিয়ে যেমন বিক্রেতারা আসেন, তেমনি আসেন পাইকারেরা ও খুচরা ক্রেতারা। একসঙ্গে বড় আকারের বিভিন্ন জাতের মাছ একসাথে দেখার সুযোগ হাতছাড়া না করতে নানা শ্রেণী পেশার মানুষও ভীড় করেন এখানে। তারা ঘুরে ঘুরে মাছ দেখেন, দাম জানতে চান।
মেলার মধ্যে ঢুকতেই চোখে পড়ে আড়তে আড়তে স্তূপ করে রাখা নানা জাতের মাছ। পাইকার আর খুচরা ক্রেতা বিক্রেতারা নিজেদের মধ্যে দেনদরবার করে মাছ কেনা বেচা করেন। একেকটি আড়তে মাছের বাক্স-পেটরা খোলা হয়, আর দরদাম হাঁকা নিয়ে চলে চিৎকার-চেঁচামেচি।
পাইকারী মাছ ব্যবসায়ী কনা মিয়া বলেন, মাছের মেলা এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্য। মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাটি উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওর-নদীর মাছ ছাড়াও খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহী, চাঁদপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের মাছ এখানে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মতিন বলেন, হাজার টাকার নিচে এখানে কোন মাছ পাওয়া যায় না। বড় ব্যবসায়ীরা সপ্তাহ খানেক পূর্বে বড় বড় মাছ সংগ্রহ করতে থাকেন। সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে আড়ৎ থেকে ছোট বড় অনেক জাতের মাছ নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েন। মেলায় ছোট আকারের মাছের দাম হাকানো হয় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের মাছের দাম হাঁকানো হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকাও হাঁকানো হয়। এক রাতেই মাছের মেলায় কোটি কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয়ে থাকে। অনেকের ধারণা, মেলায় শত কোটি টাকার বাণিজ্য হয়।
সিলেট থেকে এসেছেন প্রবাসি আমিরুল ইসলাম। ১২ হাজার টাকায় কিনেছেন একটি চিতল মাছ। মৌলভীবাজারের আরেক ক্রেতা সাদিকুর রহমান ২৫ হাজার টাকায় কিনেছেন এ অঞ্চলের বিখ্যাত আইড় মাছ।
এসময় তিনি বলেন, দাম বিষয় নয়। শখটাই বড়। পুরো বছর এদিনটার জন্য অপেক্ষা করি।
আরেক ক্রেতা আব্দুল হাকিম বলেন, আজকালের ছেলেমেয়েরা মাছ চেনেনা। তাদের মাছ চেনাতেই বাজারে নিয়ে এসেছি।
মাছ ব্যবসায়ী শুকুর আলী বলেন, লাখ টাকার মাছ নিয়ে এসেছি। আশা করছি ভালো বিক্রি হবে।
কুশিয়ারা নদীর প্রসিদ্ধ চিতল মাছ মেলায় তুলেন সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী। প্রায় ২০ কেজি ওজনের চিতল মাছটি ৩২ হাজার টাকা দাম হাঁকছেন তিনি। হাকালুকি হাওর থেকে বিশাল আকারের ১ জোড়া কাতল ও ১ জোড়া বোয়াল নিয়ে এসেছেন হিরা মিয়া ও লাল মিয়া। কাতলের জোড়ার দাম হাঁকছেন ২৬ হাজার এবং বোয়ালের জোড়ার দাম হাঁকছেন ৪৮ হাজার টাকা।
মাছের এমন দাম শোনে আশপাশের অনেকের চোখ ছানাবাড়া। তাঁরা বলেন, এ রকম দামের অনেক মাছ রাত ১২টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়।
সময়ের আলো/জিকে