সাতক্ষীরা সদর থানার সাবেক ওসি-এসআইয়ের বিরুদ্ধে সমনের নির্দেশ

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সারাদেশ

আট বছর আগে সাতক্ষীরা শহরের পারকুখরালির হোমিও চিকিৎসক ডা. মোখলেছুর রহমান জনিকে শহরের লাবনী মোড় থেকে ধরে এনে লকআপে তিন

2024-01-30T13:47:32+00:00
2024-01-30T13:47:32+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সাতক্ষীরা সদর থানার সাবেক ওসি-এসআইয়ের বিরুদ্ধে সমনের নির্দেশ
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৪, ১:৪৭ পিএম 
সাতক্ষীরা সদর থানার সাবেক ওসি-এসআইয়ের বিরুদ্ধে সমনের নির্দেশ
আট বছর আগে সাতক্ষীরা শহরের পারকুখরালির হোমিও চিকিৎসক ডা. মোখলেছুর রহমান জনিকে শহরের লাবনী মোড় থেকে ধরে এনে লকআপে তিন দিন আটক রাখার পর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সদর থানার দুই সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে সমন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম জিয়ারুল ইসলাম সোমবার (২৯ জানুয়ারি) বিকালে গোয়েন্দা, অপরাধ ও তদন্ত শাখার (সিআইডি) পুলিশ পরিদর্শক হারুণ অর রশিদের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে আগামী ২৬ মে তাদের আদালতে হাজির হওয়ার আদেশ দেন।

মামলার আসামিরা হলেন- পিরোজপুর জেলা সদরের পিরোজপুর গ্রামের আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে সাতক্ষীরা সদর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শেখ, গোপালগঞ্জ জেলা সদরের করপাড়া গ্রামের আব্দুল কাদের মোল্লার ছেলে ও সাতক্ষীরা সদর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন মোল্লা এবং নড়াইল জেলার লোহাগড়া থানার পাংখাচর গ্রামের মো. সাঈদুর রহমানের ছেলে ও সাতক্ষীরা সদর থানার সাবেক এসআই মো. হিমেল হোসেন।

মামলা ও ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে অসুস্থ বাবার জন্য বাইসাইকেলে ওষুধ কিনতে গিয়ে সাতক্ষীরা শহরের লাবনী সিনেমা হলের সামনে ফটোস্ট্যাটের দোকান থেকে সদর থানার তৎকালীন এসআই হিমেল হোসেন শহরের পারকুখরালির শেখ আব্দুর রাশেদের ছেলে হোমিও চিকিৎসক মোখলেছুর রহমান জনিকে (২৭) থানায় ধরে নিয়ে যান। ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট স্ত্রী জেসমনি নাহার রেশমা তার শ্বশুর আব্দুর রাশেদ, মানবাধিকার কর্মী রঘুনাথ খাঁ ও স্বজনদের নিয়ে থানার লকআপে তাকে খাবার দিয়েছেন, তার সঙ্গে কথাও বলেছেন।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদুল হক শেখ ও এসআই হিমেলের সঙ্গে কথা বললে জনির আল্লার দল নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে জানানো হয়। স্বামীর মুক্তির বিনিময়ে তৎকালীন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ এমদাদ হোসেন ও এসআই হিমেল জনির স্ত্রী রেশমার কাছে দাবি করেন মোটা অংকের টাকা। টাকা না দিলে ক্রসফায়ারের হুমকি দেওয়া হয়। ৮ আগস্ট থানায় গেলে জনিকে পাওয়া যায়নি।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুনসুর আহম্মেদ, পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন (পাটকেলঘাটায় ১২০ ভরি সোনা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২০২১ সালে চাকরিচ্যুত), সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি। ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর পুলিশ সাধারণ ডায়েরি না নেওয়ায় সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন জেসমিন নাহার রেশমা। অবশেষে ২০১৭ সালের ২ মার্চ হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন জেসমিন নাহার রেশমা। মামলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আটজনকে বিবাদী করা হয়।

পরবর্তীতে আদালত মোখলেছুরকে ওই বছরের ১২ এপ্রিলের মধ্যে সাতক্ষীরার বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করানোর নির্দেশের পাশাপাশি ৯ মে এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ঢাকা লিগ্যাল সেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএসএম জাভিদ হাসানকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্তকালে সাতক্ষীরা সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন মোল্লা নিখোঁজ ডা. মোখলেছুর রহমান জনি আল্লার দল নামে একটি জঙ্গি সংগঠন করতেন বলে লিখিতভাবে উল্লেখ করেন। প্রতিবেদন রিটকারীর বিপক্ষে যায়। পরে আদালতের নির্দেশে ২০১৭ সালের বছরের ৩ জুলাই সাতক্ষীরার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হাবিবুল্লাহ মাহমুদ হাইকোর্টে বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে থানা লকআপ থেকে ডা. জনির নিখোঁজ হওয়ার সত্যতা পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে তৎকালীন পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন, থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ এমদাদ হোসেন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন মোল্লা ও উপপরিদর্শক হিমেল হোসেন হোমিও চিকিৎসক ডা. মোখলেছুর রহমানকে লাবনী মোড় থেকে তুলে আনেন এবং থানা লকআপে নির্যাতন ও সেখান থেকে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জড়িত বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে এক আদেশে ওই বছরের ৩ অক্টোবরের মধ্যে এ সম্পর্কিত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে (পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন) নির্দেশ দেওয়া হয়।

পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদনে ডা. জনিকে থানায় এনে আটক রাখার সত্যতা মেলেনি বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট ডা. জনি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি নিয়ে তার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদুল হক শেখ, ফিরোজ হোসেন মোল্ল্যা ও উপপরিদর্শক হিমেল হোসেনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা গ্রহণ ও একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যেতে পারে বলে এক আদেশে উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে বিভিন্ন জায়গার আইন সহায়তা চেয়ে না পেয়ে বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সহায়তায় নিখোঁজ জনির বাবা শেখ আব্দুর রাশেদ ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট সাতক্ষীরা মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলায় সদর থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ এমদাদ হোসেন, ফিরোজ হোসেন মোল্লা ও উপপরিদর্শক হিমেলের বিরুদ্ধে জনিকে অপহরণ করে হত্যার পর লাশ গুমের অভিযোগ আনা হয়। মামলার নথিতে হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিট পিটিশনের আদেশের জাবেদা নকল, রিট পিটিশন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন ও পিবিআই প্রতিবেদনের ছায়ালিপি জমা দেওয়া হয়।

মামলা তদন্তে গোয়েন্দা অপরাধ ও তদন্ত শাখার কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক হারুণ অর রশীদ আসামিদের বিরুদ্ধে বাদীর আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন মর্মে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে ডা. জনির শাশুড়ি কলারোয়া উপজেলার লাঙ্গলঝাড়া গ্রামের মনোয়ারা খাতুনের জমি তৎকালীন লাঙ্গলঝাড়া ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন (বর্তমানে প্রয়াত) কৌশলে ইউনিয়ন পরিষদের নামে লিখে নেওয়ার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার তদবিরকারক হিসেবে ডা. মোখলেছুর রহমান জনিকে শায়েস্তা করার জন্য এক কলারোয়া থানা থেকে হঠাৎ বদলি হয়ে আসা উপপরিদর্শক হিমেলের মাধ্যমে শহরের লাবণী মোড় থেকে তুলে আনা হয় মর্মে উল্লেখ করা হয়।

পরবর্তীতে এমদাদ হোসেন ও হিমেলের পরিকল্পনায় ডা. মোখলেছুর রহমান থানা লকআপ থেকে নিখোঁজ হন। প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী চতুর্থ ধার্য দিনে আদালত এ সমন জারির নির্দেশ দেন।

এর আগে ২০১৮ সালে উপপরিদর্শক হিমেলের বিরুদ্ধে ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমদাদ শেখ ও ফিরোজ হোসেন মোল্লার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় এমদাদ হোসেন ও ফিরোজ হোসেন মোল্লাকে চাকরি থেকে বিদায় দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে শেখ এমদাদ হোসেন উচ্চ আদালতে গেলে পরবর্তীতে তাকে পাবনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে নিখোঁজ ভিকটিম ডা. মোখলেছুর রহমানের বাবা শেখ আব্দুর রাশেদ জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারির নির্দেশ থাকলেও তার ছেলেকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করতে গেলে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তাই কোন আইনে আসামিদের সিআর মামলা থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় জিআর মামলায় বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় রিমান্ডে নেওয়া যায় তার জন্য আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবেন তিনি।

সাতক্ষীরা জজকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোসলেমউদ্দিন ও অ্যাডভোকেট ফরহাদ হোসেন বলেন, থানা লকআপে তিন দিন আটক রাখার পর ডা. মোখলেছুর রহমান জনি নিখোঁজ রয়ে গেল। বছরের পর বছর দৌড়ঝাঁপ করে একটি সিআর মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারির নির্দেশ হলো; কিন্তু ভিকটিম উদ্ধারে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই এ সংক্রান্ত আইনি ব্যাখ্যা চেয়ে তারা ঢাকার জ্যেষ্ঠ আইন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। একজন বাবা ও মা তাদের সন্তানকে, স্ত্রী তার স্বামীকে ও সন্তান তার বাবাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় দেখতে পাবে না- এটা হতে পারে না। তবে তিনি সমন জারির নির্দেশ দেওয়া পরবর্তী ওই পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।


সময়ের আলো/এএ/


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: