পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় চলছে খেজুর গাছ কাটার মহোৎসব। আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যা। যে গাছগুলো টিকে আছে সেগুলো থেকেও খেজুরের রস সংগ্রহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে পর্যাপ্ত গাছির অভাবে। এতে করে হারাতে বসেছে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছের রস ও পাটালি গুড়। এক দশক আগেও উপজেলা এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের বাজারে শীতের সকালে সারি সারি খেজুরের রস ভরা কলস চোখে পড়ত। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না বললেই চলে। তার পরিবর্তে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে খেজুর গাছ কাটার নির্মম দৃশ্য।
এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, মানুষ খেজুর গাছ যেভাবে নিধন করছে সেভাবে রোপণ করছে না। সবার নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ নিয়ে খেজুর গাছ লাগাতে হবে। অন্যথায় কালের বিবর্তনে শহরের মতো গ্রামেও খেজুর রস হারিয়ে যাবে। খেজুর রসের গুড় ও সেই গুড় থেকে তৈরি হরেক রকম পিঠাপুলি আমাদের চিরায়ত গ্রামীণ ঐতিহ্য। আবহমানকালের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের বেশি বেশি খেজুর গাছ লাগাতে হবে।
এই অঞ্চল থেকে খেজুর গাছ হারিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে স্থানীয় লোকজন বলছেন, ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য বেপরোয়াভাবে খেজুর গাছ নিধন করা হচ্ছে। গ্রামীণ রাস্তা সংস্কার কাজের সময়ও কাটা পড়ছে অনেক খেজুর গাছ। কিন্তু নতুন করে খেজুর গাছ রোপণে মানুষের আগ্রহ নেই বললেই চলে। এ কারণে খেজুর গাছ ও খেজুরের রস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে এখনও রাস্তার আশপাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাতেগোনা কিছুসংখ্যক খেজুর গাছ।
সরেজমিন আলাপকালে উপজেলার বেতমোর রাজপাড়া গ্রামের গাছি ফারুক হোসেন (৪৫) জানান, আগে তাদের দারুণ কদর ছিল। মৌসুম শুরু হওয়ার আগে থেকেই কথাবার্তা পাকা হয়ে যেত। নির্ধারিত হয়ে যেত কোন গাছি কয়টি খেজুর গাছ কাটবেন। কিন্তু এখন আর কেউ গাছিদের ডাকেন না। আগের মতো খেজুর গাছও নেই। তার নিজের কিছু খেজুর গাছ আছে। গত চার বছর ধরে সেগুলো কেটে রস সংগ্রহ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। প্রবীণ গাছি জামাল ফরাজির (৫২) সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, রাস্তা সংস্কারের সময় এবং ইট পোড়ানোর কাজে অনেক খেজুর গাছ কেটে ফেলা হলেও নতুন করে আর কেউ গাছ লাগাচ্ছেন না। খেজুর গাছ যেভাবে কাটা হচ্ছে, সেই অনুপাতে রোপণ করা না হলে কয়েক বছর পর খেজুরের রস শহরের মতো গ্রামেও আর পাওয়া যাবে না। সরকার যদি গ্রামের রাস্তাগুলোর পাশে নতুন করে খেজুর গাছ রোপণের উদ্যোগ নেয় তাহলে মানুষ আবার আগের মতো খেজুরের রস খেতে পারবে।
একটা সময়ে বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত গাছিদের। প্রতিদিন গাছিরা খেজুর রস সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে চষে বেড়াতেন গ্রামের মেঠোপথ। অহরহই দেখা যেত, রস আহরণে গাছিরা কোমরে দড়ির সঙ্গে ঝুড়ি (টোনা) বেঁধে ধারালো দা দিয়ে নিপুণ হাতে গাছ চাঁছাছোলা ও নলি (খিল) বসানোর কাজ করছেন। মঠবাড়িয়ার সদর, আমড়াগাছিয়া, সাপলেজা, তুষখালী, বেতমোর, মিরুখালী ও বড় মাছুয়া ইউনিয়নে সুস্বাদু এই খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে বানানো হতো পাটালি গুড় ও নালি গুড়। এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না এসব দৃশ্য।একইভাবে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে খেজুরের রসও।
অতীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন এসে এখানকার খেজুর গাছ বর্গা নিয়ে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতেন। সে সময় খেজুর গাছের কদরও ছিল বেশি। তখন প্রতি কেজি খেজুরের রস বিক্রি হতো মাত্র ৮-১০ টাকায়। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫০-৮০ টাকায়। অনেক জায়গায় ১০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া রসের কলস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়। শীতের মৌসুম এলেই গ্রামের ঘরে ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পায়েস (শিন্নি), রসের গুড় দিয়ে ভাপা পিঠা এবং রস গাঢ় করে তৈরি হতো হরেকরকম পিঠাপুলি। রস জ¦াল দিতে আগের দিন বিকেল থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। খড়কুটা ও গাছের শুকনো পাতা কুড়িয়ে রাখতেন নারীরা। মুড়ি, চিড়া, খই দিয়েও খাওয়া হতো সুমিষ্ট খেজুরের গুড়। সবমিলিয়ে খেজুরের রস ও গুড় নিয়ে রীতিমতো মহোৎসব চলত। কিন্তু আজ সেখানে খেজুর গাছ কাটার মহোৎসব চলছে।
সময়ের আলো/আরএস/