তুরাগ নদের তীরে কাল শুক্রবার শুরু হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামি মহাসম্মেলনের ৫৭তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। বাদ ফজর আমবয়ানের মাধ্যমে শুরু হবে ইজতেমার মূল কার্যক্রম। ইতিমধ্যে সারা দেশ থেকে জড়ো হয়েছেন দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লি ও তাবলিগ জামাতের সাথিরা। তিন দিনব্যাপী এ ইজতেমা উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। আগত মুসল্লিরা জেলাওয়ারি খিত্তায় (তাঁবু) অবস্থান নিচ্ছেন। এবারও উর্দু ভাষায় বয়ান করা হবে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে বয়ানের সঙ্গে বাংলা ও আরবি ভাষায় তর্জমা করা হবে। বুধবার সকাল থেকেই বাস, ট্রাক, পিক-আপে ইজতেমা ময়দানে আসতে শুরু করেছেন মুসল্লিরা।
ইজতেমাকে সফল করতে আয়োজকদের পাশাপাশি কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থাও গ্রহণ করেছে নানা প্রস্তুতি। শীতকে উপেক্ষা করে টঙ্গীর তুরাগতীরে লাখো মুসল্লি বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দেবেন বলে ধারণা করছেন আয়োজকরা।
ইজতেমা মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, মুসল্লিদের এপার থেকে ওপারে যাতায়াতের জন্য তুরাগ নদে এ বছর ৬টি ভাসমান সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি সেতু নির্মাণ করেছে সেনাবাহিনী এবং একটি বিআইডব্লিউটিএ। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ১২টি নলকূপে ১২ কিলোমিটার পাইপ লাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হবে। প্রায় ৮ হাজার অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। ময়দানের চাহিদা মোতাবেক ব্লিচিং পাউডার সরবরাহ ও ২৫টি ফগার মেশিনে মশক নিধনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ইজতেমায় আগত বিদেশি মুসল্লিদের জন্য আবাসস্থলে টিনের ছাপরা এবং শৌচাগার নির্মাণসহ ময়দানের উত্তর-পশ্চিম পাশে টিনের ছাউনি দিয়ে তার নিচে চটের ছাউনির প্যান্ডেল তৈরি এবং ওজু, গোসল এবং বাথরুমের পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের রান্নার জন্য সরবরাহ করা হবে প্রাকৃতিক গ্যাস। বিশেষ করে বিদেশি মুসল্লিদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য পুরো ছাউনিটি আলাদাভাবে তৈরি করা হয়। বিদেশিদের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর রেখেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
বিদেশি ছাউনির পূর্ব পাশে তৈরি করা হয়েছে মূল বয়ান মঞ্চ। সুউচ্চ এ মঞ্চ থেকেই দেশ-বিদেশের বরেণ্য আলেমরা বয়ান পেশ করবেন। আর সেসব বয়ান বিভিন্ন ভাষায় তর্জমা করে প্রচার করা হবে ওই মঞ্চ থেকেই। মঞ্চের চারপাশে লাগানো হচ্ছে সিসি ক্যামেরা, এ ছাড়া ময়দানে মাইক ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের মিডিয়া সমন্বয়কারী মুফতি জহির ইবনে মুসলিম জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ইজতেমার ময়দান প্রস্তুত হয়েছে। ইজতেমা পরিচালনা করার জন্য ময়দানসহ বাদবাকি সবকিছুই প্রস্তুত। মুসল্লিরা গত মঙ্গলবার রাত থেকেই ময়দানে আসতে শুরু করেছেন। সকালের দিকে মুসল্লিদের আসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আজ বৃহস্পতিবার সারা দিনে মাঠ ভরে যাবে বলে আশা করছেন তিনি। গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামান জানান, ইজতেমা ময়দানে আগত মুসল্লিদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালসহ মুসল্লি রোগী পরিবহনের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে অন্তত ১৫টি অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রয়েছে।
এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক একাধিক টিম কাজ করবে। যেমন-ইজতেমা ময়দানে নিয়মিত পানি ছিটানো, মশার ওষুধ দেওয়া, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, এবারের বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ৬ সহস্রাধিক সদস্য ছাড়াও সাড়ে ৭ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকবে। সিসি ক্যামেরা, ওয়াচ টাওয়ার ও রুফটপ থেকে পুরো ইজতেমা ময়দানের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ইজতেমা এলাকায় কোনো প্রকার অবৈধ দোকান এবং হকারদের অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া স্পেশালাইজড টিমসহ প্রতিটি খিত্তায় সাদা পোশাকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন। অগ্নি নির্বাপণের জন্য প্রতি খিত্তায় এবার দুটি করে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা হবে। তুরাগে থাকবে নৌ-টহল।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, দুই পর্বের ইজতেমা সফল করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক প্রস্তুতিমূলক সভাও হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রটের একাধিক টিম দায়িত্বে থাকবে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে মুসল্লিদের চলাচলের সুবিধার্থে ১৭টি বিশেষ ট্রেন চলবে। বেশিরভাগ আন্তঃনগর ট্রেন টঙ্গী রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি দেবে। রেলওয়ের ঘোষণা অনুসারে দুই পর্বেও আখেরি মোনাজাতের দিন (৪ ও ১১ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা থেকে টঙ্গীর মধ্যে ৫ জোড়া ট্রেন চলাচল করবে। এ ছাড়া টঙ্গী-ময়মনসিংহ ও টঙ্গী-টাঙ্গাইলের মধ্যে একটি করে বিশেষ ট্রেন চালানো হবে। টঙ্গী ও ঈশ্বরদীর মধ্যে চালানো হবে দুটি বিশেষ ট্রেন। ২ ফেব্রুয়ারি ও ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-টঙ্গী পথে ‘জুম্মা স্পেশাল-২’ নামে এক জোড়া ট্রেন চলাচল করবে। এ ছাড়া ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১০ ফেব্রুয়ারি জামালপুর-টঙ্গী পথে আরেকটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হবে। ইজতেমা উপলক্ষে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি এবং ৮ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা অভিমুখী সব আন্তঃনগর, মেইল, কমিউটার ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে ৩ মিনিট করে যাত্রাবিরতি করবে।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে পুলিশের কট্রোল রুমে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, বিশ্ব ইজতেমা ময়দান নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকবে। যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বোম ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট টিম, ডগ স্কোয়াড, বিস্ফোরক প্রশিক্ষক টিম, ক্রাইম সিন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, নৌবহর ও হেলিকপ্টারের টহল ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক সিসি ক্যামেরা, আইপি ক্যামেরা ও নাইটভিশন ক্যামেরা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া ওয়াচ টাওয়ার, সাদা পোশাক এবং পোশাকে পুলিশের সদস্যরা থাকবে। ইজতেমাস্থলে ভিআইপি-ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
সময়ের আলো/আরএস/