‘মাঝরাতে হঠাৎ গুলির শব্দ। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে বাবা-মার ঘুম ভেঙে যায়। তখন আমারও ঘুম ভাঙে। রাত তখন সাড়ে ১২টা। সেই যে শুরু গোলাগুলি, অবিরাম চলতে থাকে রোববার দুপুর পর্যন্ত। তার আগে সকাল সাড়ে ৭টায় আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে আসি।’ গতকাল দুপুরে কথাগুলো বলছিলেন মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ঘুমধুম তুমব্রু গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল নোমান।
তার মতো অসংখ্য শিশু বিভীষিকাময় আতঙ্কের মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসে। শনিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে সে দেশের সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। ওই সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে গতকাল বেলা আড়াইটা পর্যন্ত। গোলাগুলিতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তাণ্ডবে বিজিপির ৫৮ জন সদস্য প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিজিবি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। তাদের হাতে যেসব অস্ত্র ছিল, বিজিবি ক্যাম্পে সেসব জমা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও অনেকে অপেক্ষা করছেন সীমান্ত পেরিয়ে এপারে আসার জন্য।
এদিকে তুমব্রু রাইট ক্যাম্প ও ডেকুবুনিয়া ক্যাম্পে ব্যাপক গুলি বিনিময় ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ওপার থেকে আসা বেশ কয়েকটি গুলি ও মর্টারশেল বাংলাদেশের ভূখণ্ডের তুমব্রু কোনার পাড়া, মাঝের পাড়া ও বাজার পাড়ায় এসে পড়েছে। ফলে আতঙ্কে এই তিন গ্রামের মানুষ ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। এসব ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ৩ জন। মর্টারশেলের আঘাতে কোনার পাড়ার বেশ কটি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আহতরা হলেন-কোনার পাড়ার বাসিন্দা জোতিষ্ট ধরের ছেলে প্রবীন্দ্র ধর (৫০), রহিমা বেগম (৪০) ও আমির হোসেনের ছেলে শামশুল আলম। তাকে কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মির মুহুর্মুহু গুলিতে জীবন বাঁচাতে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৫৮ জন সদস্য আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের তুমব্রু বিজিবি ক্যাম্পে। শনিবার রাত থেকে ব্যাপক গুলি বর্ষণের পাশাপাশি, মর্টারশেল নিক্ষেপ ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যুদ্ধ হেলিকপ্টার থেকে গোলা নিক্ষেপের ফলে সীমান্ত এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। ভয়ে সীমান্তের বাজার ঘাট বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে ৬টি স্কুল-মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তুমব্রু সীমান্তবর্তী এলাকায় সরেজমিন গিয়ে কথা হয় ৩ নম্বর ঘুমধুম ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড সদস্য শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তখনও সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি চলছিল। আকাশ পথে হেলিকপ্টার থেকে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল। শফিকুল সময়ের আলোকে বলেন, ‘মিয়ানমারের তুমব্রু রাইট ক্যাম্পের চারপাশে বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি ঘিরে রেখেছে। দুপুর ১২টায় দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে আরাকান আর্মির চার সদস্য আহত হয়ে মাটিতে লুটে পড়েন। এরপর আরও ৬০ থেকে ৬৫ জন ভারী অস্ত্র নিয়ে বিজিপিকে লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে থাকে। এক পর্যায়ে বিজিপিকে ঘিরে ফেলে তারা।’
তুমব্রু পশ্চিমকূলের বাসিন্দা আবদুল রহিম ভুট্ট সময়ের আলোকে বলেন, ‘মিয়ানমারের তাণ্ডবে আমি স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে সকালে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। নিরাপদ স্থানে গিয়েও ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছিলাম। তখন স্ত্রী ও বাচ্চারা কান্না শুরু করে। এক পর্যায়ে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে পাশের গ্রামে নিয়ে যাই।’
ঘুমধুম ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, মিয়ানমারের বিজিপির কিছু সদস্য তুমব্রু সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সীমান্তে লাগোয়া স্কুলগুলো আপাতত বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের সংঘাত-সহিংসতার ঘটনায় সীমান্তের নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো অবস্থাতে যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তা চৌকিগুলোয় সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে টহল বাড়ানো হয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মোজাহিদ উদ্দিন জানান, সীমান্তে যাতে অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সীমান্তের দিকে নজর রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য দীল মোহাম্মদ জানান, ৩ গ্রামের হাজারো মানুষ শনিবার রাত থেকে বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি অনিরাপদ রেখে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে। ঘরের মালামাল আনারও সুযোগ হয়নি।
৬ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা : নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তের কাছে ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদরাসা বন্ধ রাখা হয়েছে। রোববার সকাল থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবদুল মান্নান জানান, রোববার সকাল থেকে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকার অভ্যন্তরে গোলাগুলি বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমান্ত এলাকার বাইশ ফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজা বনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিমকূল তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে সে দেশের সেনাবাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ চলছে। এ সংঘর্ষের জেরে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তেও উত্তেজনা চলছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহীরা দখল করে নিয়েছে মিয়ানমারের তুমব্রু ক্যাম্পটি। এদিকে বর্তমানে সীমান্তজুড়ে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সীমান্তজুড়ে চলছে আতঙ্ক। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।