সীমান্তের আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ছে

এসএম মিন্টু ঢাকা ও শেখ রাসেল টেকনাফ

সারাদেশ

মিয়ানমারের জান্তা সেনাদের সঙ্গে আরাকান আর্মিসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের তুমুল সশস্ত্র সংঘাত-সহিংসতা শুরু হয় গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা

2024-02-17T02:36:08+00:00
2024-02-17T02:36:08+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সীমান্তের আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ছে
মিয়ানমারে সশস্ত্র সংঘাত
এসএম মিন্টু ঢাকা ও শেখ রাসেল টেকনাফ
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ২:৩৬ এএম 
সীমান্তের আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ছে
মিয়ানমারের জান্তা সেনাদের সঙ্গে আরাকান আর্মিসহ বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের তুমুল সশস্ত্র সংঘাত-সহিংসতা শুরু হয় গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে দুই পক্ষের গোলাগুলি প্রথমে শুরু হয় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে। মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে ভয়াবহ সহিংসতার ফলে এপারের সীমান্ত বাসিন্দাদের নির্ঘুম রাত ও দিনভর আতঙ্ক শুরু হয়। এসব ঘটনায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে টহল বৃদ্ধি করে। এরপর এলাকাবাসীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। 

জান্তা সেনা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলমান সশস্ত্র সহিংসতায় ওপারের সীমান্ত এলাকা ঘুমধুম, তুমব্রু, উখিয়া, বালুখালী, হোয়াইক্যং ও উলুবুনিয়া সীমান্তে মর্টারশেল ও গুলি এসে পড়ে এপারে। গত বৃহস্পতিবার থেকে সীমান্তের শেষ প্রান্ত শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের ওপারে চলে প্রচণ্ড গোলাগুলি। এতে এপারের দুজনের প্রাণহানি ও অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে সীমান্তজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ভয়ে এলাকা থেকে অন্যত্র চলে যায় সীমান্তবাসী। গবাদি পশু নিয়ে কেউ আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে আবার কেউ আশ্রয় নেন সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে।

এ ছাড়াও গোলাগুলিতে প্রাণ বাঁচাতে ওই দেশ থেকে এ দেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় জান্তা সেনা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাসহ ৩৩০ জন। তাদের মধ্যে ১৫ জন রক্তাক্ত আহত অবস্থায় অস্ত্র-বিস্ফোরকসহ ঢুকে পড়ে। এদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী ২৩ জন সশস্ত্র অবস্থায় অনুপ্রবেশ করে। তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মামলা ও অনুপ্রবেশের মামলা হওয়ার পর তাদের মধ্যে ২২ জনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে উখিয়া থানা পুলিশ।

গত বৃহস্পতিবার দুই দেশের কূটনৈতিক সহযোগিতায় বিজিবির তত্ত্বাবধানে ৩৩০ জনকে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও ওইদিন থেকে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের সীমান্তের শেষ দ্বীপ সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার ভোরে যখন টেকনাফের হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৬৪ জনকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে গাড়িতে তোলা হয়-তখনই শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিন সীমান্তের ওপার থেকে মর্টারশেল বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দে কেঁপে উঠে এপারের মাটি। 

গতকাল পর্যন্ত ওই দেশের আরাকান রাজ্যের শেষ সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির কারণে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে গ্রামবাসী। দফায় দফায় মর্টার শেল বিস্ফোরণ ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠছে ওইসব এলাকা। সব কর্মযজ্ঞ বন্ধ করে আতঙ্কে গ্রামবাসী ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।

স্থানীয়রা বলছেন, আরাকানের সশস্ত্র সহিংসতা ঘুমধুমের ওপার থেকে শুরু হওয়া সংঘাত সেন্টমার্টিনের ওপারে গিয়ে ঠেকেছে। দুই পক্ষের যুদ্ধের ফলে সীমান্তে বসবাসকারীরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। গতকাল কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সর্বশেষ সীমান্ত এলাকা শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিনের ওপারে মিয়ানমার সীমান্তে গত রাতে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনেন বাসিন্দারা। শুক্রবার সকালেও কয়েকটি বিকট শব্দে বাংলাদেশ সীমান্তের এপারের মাটি কেঁপে ওঠে বলে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান, গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে গোলাগুলি। রাত ১টা থেকে শুক্রবার সকাল ৭টা পর্যন্ত সীমান্তে থেমে থেমে মিয়ানমারের গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পান তারা। মাঝে মধ্যে মিয়ানমারের গোলার শব্দে মাটি কেঁপে ওঠে এপারে। গতকাল রাতে ফের গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছেন সীমান্তবাসী। 

শুক্রবার সকালে ঘণ্টাব্যাপী চলা প্রচণ্ড গোলাগুলিতে সীমান্তের এপারের মানুষের ঘুম ভেঙেছে বলেও জানা গেছে। অন্যদিকে শাহপরীর দ্বীপের ওপারে মিয়ানমারের মংডুতে সকালে হেলিকপ্টার উড়তে দেখা গেছে । এর কিছুক্ষণ পরেই কয়েকটি বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে সীমান্ত এলাকা।

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা আমিন হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মিয়ানমারে রাতভর থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। তবে আজ (শুক্রবার) সকালে কয়েকটি বিকট শব্দে এপারের মাটি কেঁপে উঠেছে। সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা খুবই আতঙ্কে আছে।

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা আবছার সময়ের আলোকে বলেন, রাত ও সকালে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে রয়েছে সীমান্তে বসবাসরত বাংলাদেশিরা।

এলাকাবাসী সূত্র জানায়, মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় টেকনাফের নাফ নদ সংলগ্ন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নির্জন চরে সন্দেহভাজনদের আনাগোনা দেখতে পেয়েছেন। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক। মিয়ানমার থেকে তারা পালিয়ে অনুপ্রবেশ করেছেন বলে এলাকাবাসী সূত্র জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সূত্র জানায়, নাফ নদের চর এতটাই দুর্গম আর রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সেখানে যাওয়া খুব কষ্টদায়ক।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আবদুস সালাম বলেন, রাতভর থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ কানে এসেছে। এতে স্থানীয় লোকজন এক অজানা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। 
তিনি বলেন, এমন আতঙ্ক এলাকাবাসীর মধ্যে কখনই ছিল না। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্ত এলাকার সবচেয়ে স্পর্শকাতর তুমব্রু এলাকার স্থানীয় ইউপি মেম্বার মো. আলম সময়ের আলোকে বলেন, গত কয়েক দিন ধরে সীমান্ত পয়েন্টগুলো শান্ত থাকলেও এলাকার মানুষ এখনও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। 

তিনি বলেন, আরাকান আর্মিদের সীমান্তের ওপার থেকে সশস্ত্র অবস্থায় এখনও দেখা যাচ্ছে। তাদের ঘোরাঘুরি করতেও দেখছেন এলাকাবাসী। 

তিনি বলেন, যেহেতু জান্তা সেনাদের কাছ থেকে ওই এলাকা দখলে নিয়েছে সেখানে জান্তাদের পাল্টা হামলা হলে এপারের পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। 

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জান্তারা আরাকান আর্মিদের ওপর হামলা করলে সেই গুলি মর্টারশেল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে পড়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। তাই এপারের মানুষ শতভাগ ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঘুমধুমের ইউপি চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ সময়ের আলোকে বলেন, সীমান্তের পরিস্থিতির অবনতির পর এখন কয়েক দিন ধরে স্বাভাবিকভাবে মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে আমার এপারে যে ক্ষতি করেছে ওই দেশের সশস্ত্র দুই গ্রুপ-তাতে এপারের আতঙ্ক এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। 
তিনি বলেন, ওপার এখন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দখলে থাকলেও তাদের ওপর পাল্টা হামলাও হতে পারে। কারণ যুদ্ধ এখনও থেমে যায়নি। 

টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে দুটি গ্রুপের মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়েছেন সীমান্তে থাকা বিজিবির সদস্যরাও। শুরু থেকেই সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে। নাফ নদে টহল বৃদ্ধি ও রেকি করা হচ্ছে। গোলাগুলিতে অনেকে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করলেও একজনকেও অনুপ্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না। এপারের সীমান্ত এলাকা পুরোপুরি বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি জানান।

সময়ের আলো/আরএস/ 




Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: