মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির সংঘাত-সহিংসতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পালিয়ে এসেছেন ওই দেশের মাদক-অস্ত্রের সবচেয়ে বড় গ্যাংস্টার নবী হোসেন। তাকে ধরতে ইতিমধ্যে একের পর এক অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডু এলাকার নবী হোসেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১২ হাজার রোহিঙ্গা এবং স্থানীয়দের মাধ্যমে মাদক-অস্ত্র পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত। নবী বর্তমানে গোয়েন্দা জালে আটকা রয়েছেন বলে এলাকাবাসী ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছেন। শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা হবে বলেও জানায় গোয়েন্দা সূত্র।
অন্যদিকে শনিবার গোপালগঞ্জে একটি অনুষ্ঠানে র্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন বলেন, মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় গ্যাংস্টারকে জালের মধ্যে ফেলেছি। আমরা কিছু করতে পারব। তিনি বলেন, মাদক এখন আকাশ, নৌপথ দিয়ে এবং মিয়ানমার থেকে বেশি আসছে। এটি পরিকল্পিতভাবে পাঠানো হচ্ছে। গ্যাংস্টারকে ধরতে পারলে মাদক-অস্ত্রের চালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নবী হোসেন (৪৬) মূলত রোহিঙ্গা সদস্য। বসবাস করেন মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা মংডু জেলার ডেকুপুনিয়া উপজেলার চাকমাকাটা গ্রামে। তার বাবার নাম মো. মোস্তফা আহমেদ। নবী হোসেন সশস্ত্র সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) প্রাক্তন সদস্য এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির (এআরএ) প্রতিষ্ঠাতা। মিয়ানমারে ওই গ্রামে বাঙ্কারের ভেতর লুকিয়ে থাকলেও তিনি মূলত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং অস্ত্র-মাদক কারবারি। জনবল নিয়ে সবসময় থাকেন সশস্ত্র অবস্থায়। মিয়ানমার হয়ে টেকনাফ-উখিয়ায় অবৈধ মাদক এবং অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকজন সদস্য। নবী হোসেনের সঙ্গে ওই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সরাসরি কানেকশন রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি ওপারের জান্তা সেনা ও আরাকান আর্মিদের মধ্যে তুমুল গোলাগুলিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বালুখালীর কাটাখালী সীমান্ত পথে ঢুকে পড়েন। সেখানে অনেক জেলে ও রোহিঙ্গাদের বসবাস থাকায় সেখানেই পালিয়ে অবস্থান নেন নবী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে যেসব অস্ত্র ও মাদক আনা হয় নবী হোসেনের মাধ্যমে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতার মূল কারণই হলো অস্ত্র এবং মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে।
উখিয়ার পালংখালী, আঞ্জুমান, রহমতের বিল, ধামনখালী এবং বালুখালী কাস্টমস পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসী নবী হোসেন। তিনি মিয়ানমারের জিরো পয়েন্ট ঘুমধুমে কংক্রিটের ব্যাংকার তৈরির ঘরে চৌকি বসিয়েছেন। নবী হোসেন ঘুমধুম থেকে হ্নীলা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বর্ডার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেখান থেকে নবী হোসেন গ্রুপের সদস্যরা পালংখালী, কুতুবপুর, বালুখালী, থ্যাংকখালী, রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১ থেকে ১৮ নম্বর ক্যাম্প এলাকা দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ ইয়াবা এবং ২০ কেজি ক্রিস্টাল মেথ আইস প্রবেশের পাশাপাশি অস্ত্র চোরাচালান হয়ে থাকে। প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা সদস্য নবী হোসেনের হয়ে এই পাচার কাজে জড়িত।
দখল করা ক্যাম্পে রাতে জান্তা সেনাদের গুলি : মিয়ানমারের অভ্যন্তরে তমব্রু জিরো পয়েন্ট এলাকায় সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা সম্প্রতি একটি ক্যাম্প দখল করে জান্তা সেনাদের কাছ থেকে। ওই সময় জান্তা সেনা ও বিজিপিসহ ৩৩০ জন জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়। প্রায় ২২ দিন পর ক্যাম্পটি পুনঃউদ্ধারে জান্তা সেনারা গত শুক্রবার রাতে হঠাৎ মুহুর্মুহু গুলি চালায় সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকানদের ওপর। এ সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের ঘুম ভাঙে গুলির শব্দে।
স্থানীয়রা জানান, তখন রাত প্রায় ১টা। গোলাগুলির শব্দ এতটাই বিকট ছিল যে পুরো এলাকাই কেঁপে ওঠে। আতঙ্কে পরিবার নিয়েই রাত কাটে তাদের। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মর্টারশেল ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কাঁপে কক্সবাজারে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তে। মাঝে তিন দিন বন্ধ থাকলেও গোলাগুলির কারণে সীমান্তের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত শুক্রবার রাত ৯টার পর থেকে শনিবার রাত ১টা পর্যন্ত মিয়ানমারে ভারী মর্টারশেলের শব্দ টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও পৌরসভা জালিয়া পাড়ার নাফ নদের সীমান্তের পূূর্বে বসবাসকারীরা শুনতে পায়।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা মো. নাছির বলেন, শনিবার রাত ৯টার পর থেকে আবারও থেমে থেমে মিয়ানমারে ভারী মর্টারশেলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারণ আমার বাড়ি সীমান্তে বেড়িবাঁধের পাশে তাই শব্দ শুনতে পাই। নাফ নদে এসে পড়েছে মর্টারশেল। গত তিন দিন বন্ধ থাকলেও আবারও রাত থেকে মর্টারশেলের বিকট শব্দ শোনা যায় বলে তিনি জানান।
টেকনাফ পৌরসভার জালিয়া পাড়ার বাসিন্দা মো. ইসহাক বলেন, রাতে আমার বাড়ির পূূর্বে মিয়ানমার সীমান্তে থেমে থেমে কয়েকটি মর্টারশেলের শব্দ শোনা গেছে। কয়েক দিন শব্দ শোনা না গেলেও গত শুক্রবার রাত থেকে আবারও শব্দ শোনা যায়।
গত শুক্রবার গভীর রাতে হোয়াইক্যং হ্নীলার দিকে রাতে গোলাগুলির বিকট শব্দ শুনতে পান এলাকাবাসী। সকালে সীমান্ত এলাকায় সরেজমিন স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, রাতে মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ শোনা গেছে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও হ্নীলা সীমান্তে। মাঝে কয়েক দিন বন্ধ থাকলেও হঠাৎ থেমে থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে।
স্থানীয় কয়েকজন জেলে ও মাঠ চাষি বলেন, আমরা প্রতি বছর লবণের মাঠ করি, আমাদের লবণের মাঠ একদম সীমান্তের পাশে। আমরা ত্রিপল দিয়ে মাঠে ঘর করে কয়েকজন শ্রমিক থাকি। রাতে মিয়ানমার থেকে গোলাগুলির বিকট শব্দ শুনতে পাই। তবে সকালে কিছু জেলে ঝাঁকি জাল ও বড়শি নিয়ে নাফ নদে মাছ শিকারে গেছে। কিন্তু টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের মানুষ আতঙ্কে রয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি-২) অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, গত শুক্রবার রাতে ওপারে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়েছেন এলাকাবাসী। এ ঘটনার পর সেখান থেকে কোনো রোহিঙ্গা সদস্য এলে তাদের প্রতিহত করা হবে।
টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ ৯ নম্বর ওর্য়াডের ইউপি সদস্য আবদুস সালাম বলেন, তিন দিন ধরে শাহপরীর দ্বীপ সীমান্তে গোলাগুলি ও মর্টারশেলের শব্দ শোনা যায়নি। সীমান্ত এলাকার পরিবেশ শান্ত ছিল। হঠাৎ গত শুক্ররার রাত ৯টার পর থেকে থেমে থেমে বিকট মর্টারশেলের শব্দ শোনা যায়।
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী বলেন, মাঝেমধ্যে গুলির আওয়াজ আসায় সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে এখনও আতঙ্ক কাটেনি। শনিবার রাতেও গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। আমি প্রতিদিন আমাদের সীমান্ত এলাকায় যাদের বাড়িঘর আছে তাদের খোঁজখবর রাখছি।
অন্যদিকে টেকনাফ সীমান্তের কাছ থেকে মালিকবিহীন দুটি এসএমজি ও ২৬৯টি গুলি উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের বেড়িবাঁধের কাছ থেকে মালিকবিহীন দুটি এসএমজি ও ২৬৯টি গুলি উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত শুক্রবার রাত ১টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অস্ত্রবিরোধী অভিযান চালান বিজিবি-৩৪ ব্যাটালিয়ন ও র্যাব সদস্যরা। রাত ১টার দিকে হোয়াইক্যং খারাংগ্যাঘোনা সীমান্তের বেড়িবাঁধের পাশে একটি নারিকেল বাগান থেকে দুটি এসএমজি ও গুলি উদ্ধার করা হয়।
সময়ের আলো/আরএস/