জিম্মি নাবিকদের পরিবারে উৎকণ্ঠা, আহাজারি

সময়ের আলো ডেস্ক

সারাদেশ

ভারত মহাসাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিক ও ক্রুর জিম্মি হওয়ার খবরে তাদের পরিবারে চলছে আহাজারি।

2024-03-14T04:35:23+00:00
2024-03-14T08:34:38+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
জিম্মি নাবিকদের পরিবারে উৎকণ্ঠা, আহাজারি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৪, ৪:৩৫ এএম  আপডেট: ১৪.০৩.২০২৪ ৮:৩৪ এএম
জিম্মি নাবিকদের পরিবারে উৎকণ্ঠা, আহাজারি
ভারত মহাসাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের হাতে বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিক ও ক্রুর জিম্মি হওয়ার খবরে তাদের পরিবারে চলছে আহাজারি। তাদের স্বজনদের দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার খবর সংগ্রহ করে পাঠিয়েছেন সময়ের আলোর ব্যুরো এবং জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা।

ছেলেকে ফিরে পেতে আকুতি বৃদ্ধ পিতার 
জাহাজে জিম্মি দশা থেকে ছেলে ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ বিপ্লকে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তার বৃদ্ধ বাবা। ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের মোমারিজপুর গ্রামের আবুল হোসেন ভূইয়া ও রৌশনারার ছেলে বিপ্লব। তিনি এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত। আট বছর আগে চাকরিতে যোগ দেন। বিপ্লবের দুই ছেলে রয়েছে। মঙ্গলবার বিকালে তার বাবার সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন বিপ্লব। সে সময় তিনি জানান,  সোমালিয়ার জলদস্যুরা তাদের আটক করেছে। এ সময় তার জন্য বাবাকে দোয়া করতে বলেন তিনি।

আমার জন্য দোয়া কইরো, আর কথা নাও হতে পারে...
জিম্মি ২৩ নাবিকের একজন সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের চর নুরনগর গ্রামের নাজমুল হক হানিফ। ওই গ্রামের কৃষক আবু সামা শেখ ও নার্গিস বেগম দম্পতির ছেলে তিনি।
মঙ্গলবার বিকালে জলদস্যুদের হাতে ছেলে জিম্মি হওয়ার খবর শোনার পর থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন নাজমুলের মা নার্গিস বেগম। আর হৃদরোগ বেড়ে যাওযায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বাবা আবু সামা। আতঙ্কে রয়েছেন নাজমুলের স্বজনেরা।

বুধবার দুপুরে মা নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার কলিজাটা জ্বলে যাচ্ছে, তোমরা আমার নাজমুলকে আমার কাছে আইনা দাও। নাজমুলকে ছাড়া আমরা বাঁচব না। ২০২২ সালে জাহাজের ডেক ডিপার্টমেন্টের নাবিক হিসেবে যোগ দেন নাজমুল। 

রোকনের বাড়িতেও চলছে আহাজারি
জলদস্যুদের হাতে আটক জাহাজের জিম্মি এমভি আবদুল্লাহর থার্ড ইঞ্জিনিয়ার রোকন উদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে চলছে তাকে ফিরে পাওয়ার আহাজারি। ছেলেকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার মা। 

নেত্রকোনা সদর উপজেলার ঠাকুরাকোনা ইউনিয়নের বাঘরুয়া গ্রামের মিরাজ আলী ও লুৎফুন্নাহার দম্পত্তির চার সন্তানের মধ্যে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রোকন উদ্দিন তৃতীয়। 

লুৎফুন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সর্বশেষ সোমবার ভোরে রাতে কথা হয়, ছেলে রোকনের সঙ্গে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তিনি। রোকনকে অবিলম্বে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে জোর দাবি এলাকাবাসীও।

হয়তো আর যোগাযোগ হবে না, স্ত্রীকে তৌফিক
উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে খুলনা নগরের ছোট বয়রা করিমনগর এলাকার বাসিন্দা ও জাহাজের দ্বিতীয় প্রকৌশলী জিম্মি তৌফিকুল ইসলামের পরিবারের সদস্যরাও। মঙ্গলবার বিকাল ৫টার পর মা ও স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে সবশেষ কথা হয় তৌফিকের। 

বুধবার তার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা ইকবাল হোসেন, মা দিল আফরোজ ও স্ত্রী জোবায়দা নোমান এবং দুই সন্তান তাসফিয়া তাহসিনা (৭) ও আহমেদ রুসাফি (৫) কান্নাকাটি করছেন। 
তৌফিকুলকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়ে স্ত্রী জোবায়দা নোমান কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে কথা হয়েছিল। তিনি মুঠোফোনে ফোনে বলছিলেন, দোয়া করো। আমাদের সোমালিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে, হয়তো আর যোগাযোগ হবে না। এটাই শেষ কথা। 

জোবায়দা আরও বলেন, আমাদের এখন একটাই চাওয়া সে আমাদের মাঝে ফিরে আসুক। সরকারের কাছে আবেদন, যেন সবাইকে সুস্থভাবে ফেরত দেওয়া হয়।

আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত ভালো আছি, দোয়া কইরো
‘আমাদের জাহাজে অ্যাটাক হইছে। জাহাজটি জিম্মি করে সোমালিয়ার উপকূলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমাদের সবাইকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে। আমাদের মারধর করেনি। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত ভালো আছি, দোয়া কইরো।’

গত মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে সর্বশেষ স্ত্রী মেহরিমা সাফরিন জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে এসব কথা বলেন এমভি আবদুল্লাহর প্রধান প্রকৌশলী এএসএম সাইদুজ্জামান। 

স্বামীকে নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকা মেহরিমা বলেন, খবরে দেখতেছি, মুক্তিপণ না পেলে তাদের নাকি একে একে মেরে ফেলবে। সরকারের কাছে আমাদের আকুতি, যেভাবেই হোক আমার স্বামীকে জলদস্যুদের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। নওগাঁ শহরের আরজি নওগাঁ এলাকার আবদুল কাইয়ুম ও কোহিনুর বেগমের ছেলে এসএম সাইদুজ্জামান। 

জিম্মি নাবিকদের দুজন নোয়াখালীর
জলদস্যুদের হাতে জিম্মি নাবিকদের দুজন নোয়াখালীর। তারা হলেন-নাবিক মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক রাজু (২৭) ও ফাইটার মোহাম্মদ সালেহ আহমেদ। রাজু নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রামপুর গ্রামের আজিজুল হক মাস্টারের ছেলে। সালেহ আহমেদের বিস্তারিত পরিচয় এখনও জানা যায়নি। বাবা আজিজুল হক মাস্টার জানান, আমরা খুব চিন্তায় আছি। রাজুর মা দৌলত আরা বলেন, সরবকারের কাছে আমার আবেদন, আমার সন্তানসহ জিম্মি আরও বাইশ মায়ের সন্তানকে উদ্ধার করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।

কেঁদেই চলেছেন সাব্বিরের বাবা
জলদস্যুদের হাতে একমাত্র ছেলে সাব্বির হোসেনের জিম্মির খবর পেয়ে বাবা হারুন অর রশিদ হাউ মাউ করে কেঁদেই চলছেন। বুক চাপড়িয়ে একনাগাড়ে বিলাপ করছেন মা সালেহা বেগম। একমাত্র বোন মিতু আক্তার ভাইয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চাচ্ছেন। তার ভাই যেন জিম্মি দশা থেকে মুক্ত হয়ে তাদের কাছে আবার ফেরত আসে। গ্রামের লোকজন ও আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এসে তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। জিম্মির খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনরা। তাদের একটাই দাবি সরকার যেন দ্রুত সাব্বিরকে মুক্ত করে আনে।  

সাব্বির হোসেনের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার সহবতপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গা ধলাপাড়া গ্রামে। তিনি ২০২২ সালের জুন মাসে এমভি আবদুল্লাহ নামক পণ্যবাহী জাহাজে মার্চেন্ট কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি নেন।

সন্তানকে ফিরে আকুতি তারিকুলের বাবা-মার
বন্দি তারিকুল ইসলামের বাড়িতেও চলছে আহাজারি। সন্তানকে ফিরে পেতে কান্নাকাটি করে আল্লাহর করুনা প্রার্থনা করছেন তারিকুলের বাবা-মা। বুধবার দুপুরে তারিকুলের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালীর ছকড়িকান্দি গিয়ে দেখা যায়, তারিকুলের বাবা দেলোয়ার হোসেন কুরআন তেলাওয়াত করছেন। সাংবাদিকদের কাছে এ সময় তারা সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য সবার সহায়তা চান। একইসঙ্গে জিম্মি সবাইকে জীবিত উদ্ধারে সরকারে প্রতি আর্জি জানান।

তারিকুল ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বরে নাটোরের মেয়ে মোসাম্মৎ তানজিয়াকে বিয়ে করেন। বিবাহিত তারিকুল-তানজিয়া দম্পতির এক বছর এক মাস বয়সি মেয়ে রয়েছে।

দোয়া চেয়ে স্ত্রীর কাছে ফোন আলী হোসেনের
আড়াই মাস আগে বাংলাদেশি পণ্যবাহী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর নাবিক হিসেবে যোগ দেন আলী হোসেন (২৬)। সহকর্মী নাবিকদের সঙ্গে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হন তিনিও। এদিন বেলা ৩টার দিকে মোবাইল ফোনে স্ত্রীকে কল দিয়ে আলী হোসেন জানান, তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ায় হয়তো মুক্তি পাওয়ার আগে আর যোগাযোগ হবে না। তাদের জন্য যেন বাবা-মাসহ পরিবারের সবাই দোয়া করেন। এরপর থেকে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ কথা শোনার পর থেকেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। সদ্যবিবাহিত স্ত্রী ইয়ামনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে সময়ের আলোকে বলেন, আগামী কুরবানির ঈদে বাড়িতে ফেরার কথা ছিল আলীর। এ কথা বলেই কাঁদতে শুরু করেন তিনি। আর ছেলের বিপদের কথা শুনে অঝোরে কাঁদছেন মা নাসিমা বেগম। তিনি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারাকান্দি ইউনিয়নের উমারের পাড় গ্রামের এমাম হোসেনের ছেলে আলী। গত আড়াই মাস আগে এমভি আবদুল্লায় কাজ শুরু করেন।


সোমালিয়ান জলদস্যুদের হাতে জিম্মি নাবিকদের মধ্যে নাটোরের বাগাতিপাড়ার জয় মাহমুদের (২৫) শেষ কথা হয় চাচাতো ভাই শারুফ হোসেনের সঙ্গে। এ সময় তিনি জানান, দস্যুরা তাদের মোবাইল কেড়ে নিচ্ছে। আর কথা নাও হতে পারে; কিন্তু এসব যেন তার মা-বাবাকে না জানানো হয়। এরপর শারুফের কাছ থেকে বিদায় নেন তিনি।

জয় মাহমুদ বাগাতিপাড়া উপজেলার পাকা ইউনিয়নের সালাইনগর গ্রামের জিয়াউর রহমানের ছেলে। তিনি ‘আবদুল্লাহ’য় অর্ডিনারি সি-ম্যান (সাধারণ নাবিক) হিসেবে কর্মরত। 

ছেলে জলদস্যুদের হাতে আটকের খবরে মুষড়ে পড়েছেন জয়ের বাবা জিয়াউর রহমান। জয়সহ আটক বাংলাদেশি নাবিকদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

আল্লাহ যেন আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়
এমভি আবদুল্লায় জিম্মিদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার উত্তর বন্দরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। তিনি এই জাহাজের এবি ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত। গত ২৭ নভেম্বর তিনি জাহাজে ওঠেন। এর একদিন আগে খালাতো বোন নাসমিন আক্তার নুপুরের সঙ্গে আকদ হয় তার। গত মঙ্গলবার সাজ্জাদরা জিম্মি হওয়ার খবর গ্রামে আসার পর তার বাড়িতে চলছে আহাজারি। মোবাইল ফোনে পাঠানো এ সংক্রান্ত ভয়েজ আসার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন সাজ্জাদের মা। তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। সাজ্জাদের বাবা গাজু মিয়া বলেন, আল্লাহ যেন আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়।


সময়ের আলো/আরএস/



Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: