ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি চক্রের কাছে এক নামে পরিচিত মিজান ঢালী। তিনি এক সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় সকল ট্রেনের টিকেট কালোবাজারি করে আসছিল। ২০০৩ সালে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ডেফোডিলের কমলাপুর রেলস্টেশন শাখায় পিয়ন হিসেবে যোগ দেয়। এরপর থেকেই মিজান ঢালী টিকিট কালোবাজারি বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। রেলওয়ে যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই চুক্তিবদ্ধ হয় তার হয়েই কাজ করেন মিজান ঢালী। সহজ ডটকমের কমলাপুর রেলস্টেশন সার্ভার রুমের সার্ভার অপারেটর নিউটন বিশ্বাস, স্টেশন রিপ্রেজেন্টেটিপ সবুর হাওলাদারসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে চক্রটি কালোবাজারি করে আসছিল। আর এই চক্রের মূলহোতা মিজান ঢালী সহজ ডটকমের মাধ্যমে ট্রেনের টিকিট কৃত্তিম সংকট তৈরি করে হাতিয়ে নিতো কোটি কোটি টাকা।
তবে শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। র্যাব-৩ এবং র্যাব সদর সদর দফতরের গোয়েন্দারা ঢালী সিন্ডিকেটের মূলহোতা মিজান ঢালী ও সহজ ডটকমের কমলাপুর রেলস্টেশন সার্ভার রুমের সার্ভার অপারেটর নিউটন বিশ্বাস, স্টেশন রিপ্রেজেন্টেটিপ সবুর হাওলাদারসহ চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। রাজধানীর কমলাপুর ও সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় কালোবাজারির আলামত এবং অবৈধভাবে সংগ্রহ ও মজুদকৃত ট্রেনের টিকেট।
শুক্রবার (২২ মার্চ) দুপুরে কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, সহজ ডটকম টিকিট কালোবাজারির দায় এড়াতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ছিল।
তিনি বলেন, দেশব্যাপী ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি হয় ঢালী সিন্ডিকেটের মূলহোতা মিজানের নেতৃত্বে। এই চক্রটি সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের প্রায় সব ধরনের ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছিল। মিজান দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের টিকিট বুকিংয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ২০০৩ সালে তিনি চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ড্যাফোডিলের কমলাপুর রেলস্টেশন শাখায় পিয়ন হিসেবে যোগ দেন। পরে রেলওয়ের টিকিট বুকিংয়ে সিএনএস ডট বিডির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে অভিজ্ঞ কর্মী হিসেবে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল রাখা হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে রেলওয়ে টিকিটের চুক্তি সহজ ডট কমকে দেওয়া হলে সেখানেও মিজানের চাকরি বহাল থাকে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন টিকিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকায় দেশব্যাপী বিভিন্ন স্টেশনের সহজ ডটকমের অফিসে এবং বড় বড় রেলওয়ে স্টেশনের কর্মচারীদের সঙ্গে মিজানের পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি বিভিন্ন স্টেশনে থাকা সহজ ডটকমের সদস্য, টিকিট কাউন্টার ও অন্যান্য কালোবাজারি চক্রের সদস্যদের সমন্বয়ে কারসাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টিকিট বিক্রি করতেন।
কমান্ডার আল মঈন বলেন, নিউটন ২০১২ সালে স্টেশন সাপোর্টকর্মী হিসেবে সিএনএস বিডিতে যোগদান করে ২০১৬ সালে সার্ভার অপারেটরের দায়িত্ব পান। ২০২০ সালে সহজের সঙ্গে চুক্তি হলে তার চাকরি বহাল থাকে এবং পুনরায় সার্ভার অপারেটরের দায়িত্ব পান।
তিনি আরও বলেন- বিশেষ করে ঈদ, পূজা, সাপ্তাহিক ছুটিসহ বিশেষ ছুটির দিনকে উপলক্ষ্য করে মিজান ও সোহেল বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি সংখ্যক টিকিট সংগ্রহ করতেন। মিজান ও সোহেল প্রতি বছর ঈদ মৌসুমে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্টেশনের সহজ ডটকমের কর্মচারী ও টিকিট কাউন্টারম্যানদের মাধ্যমে প্রায় ২-৩ হাজার টিকিট কালোবাজির মাধ্যমে বিক্রি করতেন। তারা এবারের ঈদে আগের চেয়ে বেশি টিকিট সংগ্রহের জন্য পরিকল্পনা করছিলেন।
র্যাবের এই মুখপাত্র বলেন, টিকিট বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে ৫০ শতাংশ সহজ ডটকম ও রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টার ম্যানরা পেতেন এবং বাকিটা সিন্ডিকেটের মূলহোতা মিজান, সোহেলসহ বাকি বিক্রয়কারী সহযোগীদের মাঝে ভাগাভাগি হতো। এই অর্থ কখনো তারা হাতে-হাতে বুঝিয়ে দিতেন, আবার কখনো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করতেন। সিন্ডিকেটের প্রত্যেক সদস্য অবৈধভাবে ট্রেনের টিকিট বিক্রি করে প্রতি মাসে ২০/২৫ হাজার টাকা উপার্জন করতেন। এভাবেই পরস্পরের যোগসাজশে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশব্যাপী ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছিলেন। ঈদুল ফিতরে টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে এনএসআই ও র্যাবের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন।
সময়ের আলো/জিকে