সোমালিয়ার সমুদ্র উপকূলে এমভি আবদুল্লাহর কাছে ইইউর যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েনের সংবাদে ফের উদ্বেগ বেড়েছে জিম্মি নাবিকদের পরিবারে। মালিকপক্ষের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে ২৩ নাবিকের মুক্তির প্রক্রিয়া এলোমেলো হতে চলেছে-এমন ধারণা করছেন অনেকে।
গত বুধবারই প্রথম জলদস্যুরা মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে এ যোগাযোগ শুরুর পর নাবিকদের মুক্তির ব্যাপারে আশার আলো দেখা দেয়। নাবিকদের পরিবারে এমন বার্তা পৌঁছে যে ঈদের আগেই তারা মুক্ত হবেন। কিন্তু একদিন পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে খবর আসে এমভি আবদুল্লাহর কাছে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। বেড়েছে সামরিক তৎপরতা। এ কারণে হিসাব-নিকাশ অনেকটা পাল্টে যেতে শুরু করেছে মনে করছেন শিপিং সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনীর এক্স পোস্টে (সাবেক টুইটার) বিষয়টি প্রকাশ করার পর দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। পরিবারের সদস্যরা বারবার যোগাযোগ করছেন জাহাজটির মালিকপক্ষ এসআর শিপিং অফিসে। তারা সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। তবে মালিকপক্ষের কাছ থেকে জাহাজটির নাবিকদের অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য না পাওয়ায় হতাশ পরিবারের সদস্যরা। সবারই প্রশ্ন, কী হতে যাচ্ছে।
শিপিং সেক্টরের সংশ্লিষ্টরা জানান, এমভি আবদুল্লাহর কাছেই ইইউর নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এক্স পোস্টে জানানো হয়, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে দস্যুতার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি এমভি আবদুল্লাহ, যেটি এখনও জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে আছে। ওই এলাকায় আটলান্টা অপারেশনের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন আছে। পোস্টে যুক্ত করা হয় কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও। এতে দেখা যায়, এমভি আবদুল্লাহর কাছে ইইউর নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নোঙর করা আছে। একটি হেলিকপ্টারও এমভি আবদুল্লাহর কাছাকাছি উড়ছে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ক্যাপ্টেন সাখাওয়াত হোসেন শুক্রবার সময়ের আলোকে বলেন, এমভি আবদুল্লাহর কাছে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন ও হেলিকপ্টার ওড়ার খবরে আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। এতে জলদস্যুরা যোগাযোগের মাধ্যমে সমঝোতার যে পথ তৈরি হয়েছিল তাতে বাধা আসতে পারে। এ ধরনের তৎপরতার কারণে নাবিক-ক্রুরা কেবিনে থাকার যে সুযোগ পেয়েছিল তা হাতছাড়া হয়ে গেছে।
জাহাজটি সরে যেতে বা সামরিক তৎপরতা বন্ধ রাখতে জোরালো উদ্যোগ কে নিতে পারেÑএ প্রশ্নে তিনি বলেন, জাহাজের ক্যাপ্টেনই এ মুহূর্তে জলদস্যুদের যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নিতে বলতে পারেন। ক্যাপ্টেন অনুরোধ করলে তারা সামরিক তৎপরতা বন্ধ করবে। এরপর ২৩ নাবিক-ক্রু জাহাজে স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারবে। তবে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করলেও এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে অভিযান চালাতে পারবে না। আন্তর্জাতিক কিছু নিয়ম আছে। যেখানে বলা আছে, জাহাজ মালিকের অনুমতি ছাড়া তাদের জাহাজে কোনো অভিযান চালানো যায় না। আমরা জানি, জাহাজ মালিক এসআর শিপিং এ ধরনের অভিযান চায় না। তারা সমঝোতার মাধ্যমে সৃষ্ট সংকট নিরসন করতে চায়।
এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটির মালিক কেএসআরএমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিং। এ ব্যাপারে কেএসআরএমের মিডিয়া অ্যাডভাইজার মিজানুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন এবং হেলিকপ্টার ওড়ার বিষয়টি আমরা অবগত। তবে আমরা আগের অবস্থানেই আছি। আমরা চাই সমঝোতার মাধ্যমে জাহাজ এবং জাহাজটির নাবিকদের মুক্তি। আগেও আমরা এ পন্থা অবলম্বন করে একটি জাহাজ জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলাম। আমরা কোনো ধরনের সামরিক অভিযান চাই না। সর্বশেষ আমরা জানতে পেরেছি নাবিক-ক্রুরা সুস্থ আছে।
এর মধ্যে জলদস্যুদের পক্ষ থেকে আর কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়েছে কি না-এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বুধবারের পর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। তবে আমরা মনে করছি, সমঝোতার উদ্যোগ সঠিক পথে এগোচ্ছে।
এদিকে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের আশপাশে সামরিক নৌযান এবং সামরিক তৎপরতা দেখার পর থেকেই জিম্মি নাবিক-ক্রুদের কেবিন সুবিধা ব্যবহার করতে দিচ্ছে না জলদস্যুরা। সবাইকে ব্রিজে নিয়ে আটকে রেখেছে। ব্রিজে থাকা অবস্থায় জলদস্যুরা সবাইকে একসঙ্গে দেখতে পায়। নাবিকদের নেতিবাচক গতিবিধি থাকলে তা তারা বুঝতে পারে। কেবিনে থাকা অবস্থায় সেই সুযোগ পায় না।
আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের একটি বন্দর থেকে ৫৫ হাজার টন কয়লা নিয়ে আরব আমিরাত যাওয়ার পথে গত ১২ মার্চ ভারত মহাসাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের কবলে পড়ে এমভি আবদুল্লাহ। জাহাজটিতে ২৩ নাবিক ও ক্রু রয়েছেন। তারা সবাই বাংলাদেশি। এমভি আবদুল্লাহ বর্তমানে সোমালীয় উপকূলে জলদস্যুদের নিরাপদ এলাকায় নোঙর করা অবস্থায় আছে। জলদস্যুরা বুধবার জলদস্যুরা প্রথমবারের মতো মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
সময়ের আলো/আরএস/