কেমিক্যালের বিষ সরকারি খালে

রাশেদুল ইসলাম, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)

সারাদেশ

কেমিক্যালমিশ্রিত দূষিত পানির দুর্গন্ধে কেউ নাকে-মুখে কাপড় গুঁজে রাখছেন, কেউবা দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক পরে চলাচল করছেন। কেমিক্যালমিশ্রিত খালের

2024-03-30T02:58:43+00:00
2024-03-30T05:28:20+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কেমিক্যালের বিষ সরকারি খালে
স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ২২ গ্রামের ২ লাখ মানুষ
রাশেদুল ইসলাম, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৪, ২:৫৮ এএম  আপডেট: ৩০.০৩.২০২৪ ৫:২৮ এএম
কেমিক্যালের বিষ সরকারি খালে
কেমিক্যালমিশ্রিত দূষিত পানির দুর্গন্ধে কেউ নাকে-মুখে কাপড় গুঁজে রাখছেন, কেউবা দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক পরে চলাচল করছেন। কেমিক্যালমিশ্রিত খালের লাল পানি দেখলে মনে হয় যেন কেউ রক্ত ঢেলে রেখেছে! এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পাড়াগাঁও এলাকার আপন টেক্সটাইলের ডাইংয়ের কেমিক্যালমিশ্রিত পানি খালে ফেলার কারণে। 

কেমিক্যালমিশ্রিত পানি ইটিপি (যে প্ল্যান্টের মাধ্যমে তরল বর্জ্য পদার্থ পরিশোধন করা হয়) ছাড়াই ফেলা হচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালে। এতে দুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন ২২ গ্রামের প্রায় ২ লাখ বাসিন্দা।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌস বলেন, কেমিক্যালমিশ্রিত পানি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এটি মানবদেহের জন্য হুমকিস্বরূপ। কেমিক্যালমিশ্রিত পানির সংস্পর্শে এলে চর্মরোগ, আলসার, ক্যানসারসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহসান মাহমুদ রাসেল বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপন টেক্সটাইল দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ভুলতা ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন বলেন, আমরা ইটিপি ব্যবহার করেই খালে পানি ফেলি। তবে মাঝে মাঝে ইটিপি বন্ধ থাকলে বর্জ্যসহ পানি ফেলা হয়। এ ব্যাপারে কথা বলতে আপন টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান মিলন গাজীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক হাফিজুর রহমানের মোবাইলে ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার ভুলতা এলাকা থেকে মুড়াপাড়া হয়ে শীতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি খাল রয়েছে। খালের দুইপাশে মর্তুজাবাদ, ভুলতা, পাচাইখা, ভায়েলা, সোনাব, মাছুমাবাদ, পেরাব, হাটাব, আমলাবো, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, ঋষিপাড়া, ত্রিশকাহনীয়া, কালি, আওখাবো, বলাইখাসহ প্রায় ২২ গ্রামের মানুষের বসবাস। এক সময় এসব গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিজীবী ছিলেন। তখন এই খালের পানি দিয়ে কৃষকরা কৃষি জমিতে পানি দিতেন। কিন্তু ভুলতা ইউনিয়নের পাড়াগাঁও এলাকায় আপন টেক্সটাইল কারখানা গড়ে ওঠার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। কোনো ইটিপি ছাড়াই ডাইংয়ের বিষাক্ত বর্জ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালে ফেলতে শুরু করে আপন টেক্সটাইল। এই কারখানায় ডাইংয়ের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক।

কেমিক্যালের বিষাক্ত গ্যাস এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিষাক্ত পানির কারণে ফসলের ফলন কমতে থাকে খালসংলগ্ন ফসলি জমিতে। অনেক জমিতে ফসল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় কৃষকরা বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। দিন দিন কমে যাচ্ছে এলাকার কৃষি জমি। এই একটিমাত্র কারখানা পুরো এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত করে তুলেছে। কারখানার বিষাক্ত কেমিক্যালের গন্ধে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। তীব্র সেই গন্ধে তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মারা যাচ্ছে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, গাছপালাও। এমনকি মরে ভেসে উঠেছে এলাকার বেশ কয়েকটি খামারের মাছ। এ অবস্থায় পুরো এলাকার মানুষ আপন টেক্সটাইলের বিষাক্ত পানির আতঙ্কে ভুগছেন। এছাড়া বিষাক্ত পানি শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে সৃষ্টি করছে ভয়াবহ দূষণ।

রূপগঞ্জ উপজেলায় আপন টেক্সটাইলের মতো আরও বহু ডাইং কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার বেশিরভাগেরই ইটিপি নেই। সরাসরি কেমিক্যালমিশ্রিত বর্জ্য বিভিন্ন খালে প্রকাশ্য দিবালোকে ফেলা হচ্ছে অবৈধভাবে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, জনবহুল এলাকায় আপন টেক্সটাইল স্থাপন করা হয়েছে। এই কারখানায় সোডা, পারঅক্সাইড, স্টেবিলাইজার, ডিটারজেন্ট, সিকুস্টারিং এজেন্ট, সোপিং এজেন্ট, রিডাকশন, এজেন্ট, অ্যাসিটিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয় যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। স্থানীয়রা কারখানা কর্তৃপক্ষকে কেমিক্যালমিশ্রিত পানি খালে ফেলতে নিষেধ করলেও কোনো কাজ হয়নি। উল্টো কারখানা কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের মিথ্যা মামলা ও হামলার ভয় দেখিয়েছে। আপন টেক্সটাইল দেখাশোনা করেন ভুলতা ইউনিয়ন ৫ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন। তার ভয়ে কারখানার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। তারা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে আবুল হাসান তাদের জানান, প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তারা কারখানা চালাচ্ছেন।

স্থানীয় কৃষক চান মিয়া, আবেদ আলী, সুলতান মাহমুদ ও আসলাম মিয়া বলেন, কয়েক বছর আগেও জমিতে ধান লাগাইলে অনেক ফলন পাইতাম। কিন্তু আপন টেক্সটাইলের বিষাক্ত পানির কারণে ফলন আর আগের মতো হয় না। তাই চাষাবাদ ছাইড়া দিছি।

আরেক কৃষক মোক্তার ভুইয়া জানান, শীতলক্ষ্যার নদীর সঙ্গে এই খালের সরাসরি সংযোগ। আপন টেক্সটাইল কারখানা কর্তৃপক্ষ বিষাক্ত পানি ছাড়ার কারণে খাল নষ্ট হচ্ছে। আর এ খালের পানি নদীতে মিশে শীতলক্ষ্যা নদীকেও দূষিত করছে। স্থানীয় জেলে শোকলাল বলেন, আগে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে কত রকমের মাছ ধরেছি! কিন্তু এখন নদীতে কোনো মাছ নাই। আপন টেক্সটাইলের মতো কিছু কারখানার ময়লা পানি ফেলার কারণে নদীর পানি এখন আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। নদীতে এখন আর কোনো মাছ পাওয়া যায় না।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: