ভারত মহাসাগরে সোমালি জলদস্যুদের হাতে জিম্মি এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিক দীর্ঘ এক মাস পর মুক্তি পেয়েছেন। রোববার বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় জাহাজটি থেকে ৬৫ জলদস্যু নেমে যাওয়ার পরই মুক্তি পান নাবিকরা। সোমালি জলদস্যুদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ৫০ লাখ ডলার মুক্তিপণের বিনিময়ে এমভি আবদুল্লাহ এবং এর নাবিকদের মুক্তি দেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়ার পরপরই এমভি আবদুল্লাহ দুবাই বন্দরের দিকে রওনা দিয়েছে। ১৯ থেকে ২০ এপ্রিল জাহাজটি দুবাইয়ের বন্দরে পৌঁছার কথা। জলদস্যুরা নেমে যাওয়ার পরপরই জাহাজটির কাছে ছুটে আসে ইইউর অপেক্ষমাণ যুদ্ধজাহাজ। ইইউর নৌ সদস্যরা এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে উঠে নাবিকদের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। জলদস্যুদের রেখে যাওয়া কিছু আলামত এবং ফিঙারপ্রিন্টও সংগ্রহ করে। দুবাইমুখী চলাচলের পথে বেশ কিছু সময় যুদ্ধজাহাজগুলো এমভি আবদুল্লাহকে এসকর্ট সুবিধা দেয়। যাতে ফের কোনো জলদস্যু টিম ঝামেলা না করে।
এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটি কবির গ্রুপের এস আর শিপিংয়ের মালিকানাধীন। জাহাজে প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিকটন কয়লা আছে। গত ৪ মার্চ আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর থেকে দুবাই বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। ১৯ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। এর মধ্যে ১২ মার্চ বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টার দিকে ভারত মহাসাগরে জলদস্যুর কবলে পড়ে জাহাজটি।
যেভাবে মুক্তি পেলেন ২৩ নাবিক : মুক্তিপণ দিয়েই নাবিকদের মুক্ত করার সব আয়োজন চূড়ান্ত। জাহাজ মালিক ও জলদস্যুদের মধ্যে সমঝোতা চুক্তিও হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় মুক্তিপণের অর্থ কীভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে। মালিক পক্ষ মুক্তিপণের অর্থ আগের নিয়মে অর্থাৎ আগের জিম্মি জাহাজ যেভাবে ছাড়িয়ে আনা হয় সেই পথ অনুসরণ করে। আগের নিয়মে ছোট আকারের বিমানে করে মুক্তিপণ জলদস্যুদের হাতে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ছোট বিমান ভাড়া করা হয়। এসব বিমান নিচু দিয়ে উড়ে যেতে পারে। ভাড়া করা ছোট বিমানে নেওয়া হয় ওয়াটার প্রুফ ব্যাগভর্তি মার্কিন ডলার। ছোট বিমানটি বাংলাদেশ সময় শনিবার (১৩ এপ্রিল) বিকালের কোনো একসময় মুক্তিপণের ডলার নিয়ে এমভি আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। প্রথমে বিমান থেকে দেখার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয় নাবিকদের। এই দেখার মধ্যে নিশ্চিত হওয়া যায় জাহাজের ২৩ নাবিক সুস্থ আছেন। এরপর জাহাজ থেকে ডলারভর্তি ৩টি ওয়াটর প্রুফ ব্যাগ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। তিন ধাপে তিনবার করে সেগুলো ফেলা হয় জলদস্যুদের স্পিড বোটের কাছে। জলদস্যুরা স্পিড বোট দিয়ে ব্যাগগুলো কুড়িয়ে নিয়ে জাহাজে উঠে। এরপর শুরু হয় ডলার গণনা। ডলারগুলো জাল কি না তাও পরীক্ষা কর হয়। এরপর জলদস্যুরা নিশ্চিত হয় মুক্তিপণের অর্থ দাবি অনুযায়ী পরিশোধ করেছে। জলদস্যুদের ব্যাগভর্তি ডলার সাগরে ফেলার কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা যায় ছোট বিমানটি একেবারে নিচু দিয়ে উড়ে গিয়ে জলদস্যুদের স্পিড বোটের কাছে ব্যাগ ফেলেছে। এরপর জলদস্যুরা দ্রুত ছুটে এসে ব্যাগ কুড়িয়ে নেয়। ব্যাগ কুড়িয়ে নেওয়া এবং বিমান থেকে ব্যাগ ফেলার সময় জলদস্যুদের হাসাহাসি ও চেঁচামেচি করে শব্দ করতেও শোনা যায়। এই ব্যাগভর্তি ডলার প্রদানের মাধ্যমে মুক্তিপণের বিনিময়ে নাবিকদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রোববার সংবাদ সম্মেলনে এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মেহেরুল করিম শেষ মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমরা জানতাম নাবিকরা ভালো আছেন। তারপরও সর্বশেষ গত দুই দিন আগে আমাদের শেষ রিকোয়ারমেন্ট ছিল নাবিকরা কেমন আছেন সেটা জানা? এ জন্য প্রত্যেক নাবিকের স্বতন্ত্র ভিডিও আমরা নিয়েছি। সেটি তারা আমার কাছে পাঠিয়েছে। এরপর আমরা মুক্তিপণের অর্থ প্রদানের মূল কাজ শুরু করি। সবকিছু আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে হয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে আমরা আমেরিকার নিয়ম মেনেছি, কোনো ক্ষেত্রে ইউকে আবার কোনো ক্ষেত্রে সোমালিয়ার নিয়ম মেনেছি।
শনিবার রাত ৩টার দিকে আমার কাছে জাহাজের ক্যাপ্টেনের পক্ষ থেকে প্রথম মেসেজ আসে। তখন দস্যুরা মোট ৬৫ জন ছিল। তারা মোট ৯টি বোটে করে জাহাজ থেকে নেমে চলে যায়। এরপর জাহাজের স্পিকারে জাহাজটি মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন জাহাজের ভেতরে কান্নার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
যা বলল মালিক পক্ষ : মুক্তির দিনই রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে জাহাজটির মালিক কবির গ্রুপ। এতে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, সরকার ও জাহাজের মালিকপক্ষের চেষ্টায় জলদস্যুদের কবল থেকে জাহাজসহ জিম্মি নাবিকদের সুস্থভাবে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। জলদস্যুদের মুক্তিপণ দেওয়ার কথা স্বীকার করা হলেও কত টাকা মুক্তি পণ দেওয়া হয়েছে তা জানানো হয়নি। নগরীর আগ্রাবাদ বারিক বিল্ডিং এলাকায় রোববার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে কেএসআরএমের করপোরেট কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে জাহাজটি মুক্ত করার নানা তৎপরতার কথা তুলে ধরা হয়।
এ সময় কেএসআরএমের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, সোমালিয়ার সময় রাত ১২টায় এবং বাংলাদেশ সময় রাত ৩টার পর মুক্তি পায় এমভি আবদুল্লাহ। জাহাজ থেকে দস্যুরা নেমে যাওয়ার পরপরই জাহাজটির নাবিকরা জিম্মি দশা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হন। মুক্তির আগে ৬৫ জন দস্যু জাহাজ থেকে নেমে বোটে করে চলে যায়। এরপর জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল হারমিয়া বন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। এ সময় এমভি আবদল্লাহর দুই পাশে দুটি ইউরোপীয় যুদ্ধজাহাজ পাহারা দিয়ে সোমালিয়া উপকূল ত্যাগ করে।
কেএসআরএম প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম বলেন, জলদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতার সময় তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নেওয়া হয়। কারণ সরাসরি মালিক পক্ষ যোগাযোগ করলে তারা মুক্তিপণের অর্থ বেশি দাবি করে। তবে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে দ্বিপক্ষীয়ভাবে। গত বৃহস্পতিবার দস্যুদের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা বা চুক্তি হয়। চুক্তিতে কিন্তু তৃতীয় কোনো পক্ষ ছিল না। আমাদের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা হয়েছে। দস্যুদের মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছে। তবে কী পরিমাণ এবং কীভাবে মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছে তা জানানো সম্ভব নয়। কারণ জাহাজসহ নাবিকদের ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন দেশের আইন মানা হয়েছে। যা হয়েছে সবই আইন মেনে করা হয়েছে। তিনি বলেন, ১৪ বছর আগে ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর আরব সাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল একই প্রতিষ্ঠানের জাহাজ ‘এমভি জাহান মণি’। ওই জাহাজে ২৫ বাংলাদেশি নাবিকের পাশাপাশি এক ক্যাপ্টেনের স্ত্রীসহ মোট ২৬ জনকে ১০০ দিন জিম্মি করে রেখেছিল দস্যুরা। এবার এক মাস পর দস্যুদের কবল থেকে জাহাজসহ নাবিকদের মুক্ত করা হলো।
যেভাবে বণ্টন মুক্তিপণের অর্থ : সোমালিয়ার জলদস্যুরা জাহাজ অপহরণে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। দীর্ঘদিন ধরে তারা জাহাজ অপহরণ করে নাবিকদের জিম্মি করে আসছে। জিম্মি করার পর জলদস্যুরা নিজেরাই নিয়ম ঠিক করেছে কীভাবে মুক্তিপণের অর্থ বণ্টন করা হবে। এ ব্যাপারে বাণিজ্যিক জাহাজের ক্যাপ্টেন আতিক ইউএ খান বলেন, জলদস্যুরা মুক্তিপণ বাবদ পাওয়া অর্থ তিন ভাগ করে। মোট পাওয়া অর্থের ৫০ শতাংশ পায় যারা ঝুঁকি নিয়ে জাহাজটা জিম্মি বা হাইজ্যাককারী জলদস্যু টিম। ৪০ শতাংশ পায় যারা এই সম্পূর্ণ অপারেশনের ব্যয়ভার বহন করে অর্থাৎ বিনিয়োগ করে আর অস্ত্র সরবরাহ করে। বাকি ১০ শতাংশ ভাগাভাগি করে অন্যরা, যারা জিম্মি জাহাজটিকে পাহারা দেওয়ার কাজ করে।
আট জলদস্যুকে গ্রেফতার : সোমালিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পান্টল্যান্ডের পুলিশ আট জলদস্যুকে গ্রেফতার করেছে, যারা বাংলাদেশের জাহাজ এমভি আবদুল্লাহ ও নাবিকদের জিম্মি করার ঘটনায় জড়িত ছিল। পান্টল্যান্ড পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে সোমালিয়ার ইংরেজি সংবাদমাধ্যম গেরো রোববার এ খবর দিয়েছে।
এমভি আবদুল্লাহ মুক্ত হওয়ার কিছু সময় পর এই জলদস্যুদের গ্রেফতারের খবর এলেও তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে দেওয়া অর্থ উদ্ধারের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পান্টল্যান্ড পুলিশের এক কর্মকর্তা গেরোকে বলেন, মুক্তিপণ দেওয়ার প্রবণতা জলদস্যুদের আরও বেশি জাহাজে হামলা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
পান্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্স রোববার বিকালে তাদের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে এক বার্তায় জানায়, তারা ভারত মহাসাগরের পান্টল্যান্ড উপকূলে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এরকম এক অভিযানে তারা জলদস্যুদের আটক ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করেছে।
ওই পোস্টের সঙ্গে দেওয়া চারটি ছবির একটিতে আট জলদস্যুকে দেখা যাচ্ছে, যাদের পাহারা দিচ্ছিলেন তিন পুলিশ সদস্য। সোমালি জলদস্যুদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ৫ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণের বিনিময়ে এমভি আবদুল্লাহ এবং এর নাবিকদের মুক্তি দেওয়া হয়। সোমালিয়ার স্থানীয় কিছু সংবাদমাধ্যমও একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে।
ঈদের নামাজ আদায় জাহাজেই : ২৩ নাবিক ঈদের নামাজ আদায় করেছেন জাহাজের ডেকেই। বাংলাদেশের এক দিন আগে ১০ এপ্রিল সোমালিয়ায় ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। নাবিকরা সকালে জাহাজে ঈদের নামাজ আদায় করার পর ছবি পাঠান স্বজনদের কাছে।
পরিবারে স্বস্তি : সোমালিয়া জলদস্যুদের কবল থেকে এমভি আবদুল্লাহর ২৩ নাবিক মুক্তির খবর প্রকাশের পরপরই পরিবারে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। সোমালিয়ার স্থানীয় সময় শনিবার মধ্যরাতের পর নাবিকরা মুক্তি পেয়ে জাহাজটি নিয়ে দুবাইয়ের দিকে রওনা দেন। মুক্তির খবর মুহূর্তে পৌঁছে যায় পরিবারে। মুক্তির খবরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অবসান হয়। স্বস্তি ফিরেছে স্বজনদের মাঝে।
এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে ওয়েলার পদে কর্মরত মো. শামসুদ্দিনের স্ত্রী রিমা আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, রোববার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে শামসুদ্দিন আমাদের ফোন করেন। ফোনেই জানায় তারা দস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে। এ খবর পেয়ে আমাদের মাঝে স্বস্তি ফিরেছে। মুক্তি পাওয়ার এ খবর শোনার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় ছিলাম। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। জাহাজের মালিককেও ধন্যবাদ জানাই নাবিকদের মুক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
সময়ের আলো/আরএস/