নাটোরের সিংড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষে দিনে নাটোর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে থেকে এক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তার ভাই ও অপর একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে অপহরণ ও মারধরের ঘটনায় অপর প্রার্থী তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের শ্যালক মো. লুৎফুল হাবিব রুবেলকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও উপজেলা আওয়ামী লীগ।
শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) সকালে প্রতিমন্ত্রী পলক রাজশাহীতে অপহরণ ও মারধরের কারণে আহত চেয়ারম্যান প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকে দেখতে আসনে এবং তার সাথে কথা বলার পরে মোবাইল ফোনে তিনি অপর চেয়ারম্যান প্রার্থী শ্যালক রুবেলকে এই নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পলকের ব্যক্তিগত সহকারী সাদ্দাম হোসেন এবং সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সিংড়া পৌর সভার মেয়র জান্নাতুল ফেরদৌস।
এদিকে সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও তাকে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এর শ্যালক লুৎফুল হাবিব রুবেলকে শোকজ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওহদিুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস স্বাক্ষরিত চিঠিতে তাকে শোকজ করা হয়।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস বলেন, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক অপহরণ ও মারধরের কারণে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে আজ (শুক্রবার) সকালে আহত দেলোয়ারের সাথে দেখা করেন। পরে তিনি রাজশাহীতে সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে মত বিনিময়ের পর রুবেলকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য বলেন।
এদিকে সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের স্বাক্ষরিত শোকজ নোটিশে বলা হয়, গত ১৫ এপ্রিল নাটোর জেলা নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনে থেকে একই উপজেলার ওপর চেয়ারম্যান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মো. দেলোয়ার হোসেন পাশার মনোনয়ন পত্র জমাদানে বাধা, মারপিট ও অপহরণরে ঘটনা যা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত হয় এবং উক্ত ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামি সুমনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আপনার (লুৎফুল হাবিব) রুবেল সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, যা দলীয় আচরণবিধি পরিপন্থীর শামিল। এমতাবস্থায় কেন আপনার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার জবাব আগামী তিন দিনের মধ্যে নিম্ন স্বাক্ষরকারীগণরে নিকট লিখিত ভাবে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় আপনার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গতকাল বৃহস্পতিবার ইসির উপ-সচিব মো. আতিয়ার রহমান স্বাক্ষরিত এক কারণ দর্শানো নোটিশে বলা হয়েছে, লুৎফুল হাবিব রুবেলের প্রার্থিতা কেন বাতিল করা হবে না, সোমবার কমিশনে হাজির হয়ে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে রুবেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রতিবেদন পেয়েছে কমিশন। জাতীয় দৈনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘটনার সচিত্র বিবরণ এসেছে। এসব প্রতিবেদন ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা ‘প্রমাণিত’ হয়েছে।
এমন ঘটনার জন্য কেন আপনার প্রার্থিতা বাতিল বা আপনার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না- সে বিষয়ে লিখিত জবাবসহ নির্বাচন কমিশনে আগামী ২২ এপ্রিল বিকালে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন থেকে করা শোকজ নোটিশের বিষয়ে প্রশ্ন করলে লুৎফল হাবিব রুবেল বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে এ ব্যাপারে আমি এখনও কোনো চিঠি পাইনি। চিঠি পেলেই সব প্রশ্নের উত্তর দেব।
পুলিশ ও দেলোয়ারের পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার বিকালে নাটোর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের সামনে থেকে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় একদল লোক। কয়েক ঘণ্টা পর তাকে বাড়ির সামনে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে যায় তারা। ওই প্রার্থীকে মারধরের ঘটনায় ইতোমধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করেছে নাটোর পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন আদালতে সুমন আহমেদ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে বলেন, লুৎফুল হাবিব রুবেলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকে অপহরণ ও মারধর করেন। তাদের সাথে কে কে ছিলেন তাও স্বীকার করেন তিনি।
নাটোর থানার ওসি মিজানুর রহমান আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কারা এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন তাদের নামও বলেছেন সুমন। তবে তদন্তের স্বার্থে নাটোর থানার ওসি তাদের নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
অপরদিকে প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন তার ভাই আওয়ামী লীগ নেতা এমদাদুল হক এবং কলম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুন্সী অপহরণ ঘটনার জন্য আরেক প্রার্থী লুৎফুল হাবিব রুবেল ও তার সমর্থকদের দায়ী করেছে দেলোয়ার হোসেনের পরিবার ও প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন। লুৎফুল হাবিব রুবেল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী ও নাটোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য জুনাইদ আহমেদ পলকের শ্যালক। অপহরণ ও মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন রুবেল।
গত মঙ্গলবার দেলোয়ার হোসেন ও লুৎফুল হাবিব রুবেলের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ হয়। এরপর ওই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে ইসি সচিব জাহাংগীর আলম জানান। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে অপহরণের মুহূর্ত।
সময়ের আলো/আরআই