চুয়াডাঙ্গায় যে কারণে গরম ও শীত সবচেয়ে বেশি

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি

সারাদেশ

গরম, শীত ও বর্ষায় প্রতিদিন কাঁক ডাকা ভোরে আশাদুল হক শ্রম বিক্রি করতে আসেন চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারে। দামুড়হুদা পুরাতন বাস্তপুর গ্রাম

2024-04-24T16:20:54+00:00
2024-04-24T16:20:54+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
চুয়াডাঙ্গায় যে কারণে গরম ও শীত সবচেয়ে বেশি
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৪, ৪:২০ পিএম 
চুয়াডাঙ্গায় যে কারণে গরম ও শীত সবচেয়ে বেশি
গরম, শীত ও বর্ষায় প্রতিদিন কাঁক ডাকা ভোরে আশাদুল হক শ্রম বিক্রি করতে আসেন চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারে। দামুড়হুদা পুরাতন বাস্তপুর গ্রাম থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার বাইসাইকেল চালিয়ে চুয়াডাঙ্গায় আসেন। টানা কয়েক দিনের গরমে তেমন একটা কাজ পাচ্ছেন না। কাজ না হওয়ায় বেশ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কারণ দুই ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ মিটাতে গিতে তীব্র তাপদাহে নাভিশ্বাস উঠছে। এক রকম অসহায় হয়ে পড়েছেন। কাজ থাকলে ৪০০-৪৫০ টাকা আয় করেন। গরমে চুয়াডাঙ্গার সকল শ্রেণী পেশার মানুষের একই অবস্থা।

চুয়াডাঙ্গা এক সপ্তাহ ধরে তাপমাত্রা ৪০-৪২ ডিগ্রির উপরে থাকছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। মানুষ স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করতে পারছেনা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে সড়কে শুনশান নীরবতা নেমে আসছে। পেটের তাগিদে কাজের ও ব্যবসার জন্য মানুষ বাইরে বের হচ্ছেন। কিন্তু সিংহ ভাগ সময় বসে থাকছেন। স্থবিরতা নেমে এসেছে সকল ক্ষেত্রে।

বুধবার (২৪ এপ্রিল) দুপুর ৩টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টানা কয়েকদিন তীব্র তাপদাহ থেকে অতি তীব্র তাপদাহ অব্যাহত রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, জলাভূমি কম থাকা, কর্কটক্রান্তি রেখার কারণে চুয়াডাঙ্গায় প্রতি বছর দাবদাহ বাড়ছে। প্রতি বছর মৃদু, মাঝারি, তীব্র, অতি তীব্র তাপদাহ অব্যাহত থাকে। শীত ও গ্রীষ্মে মহাদেশীয় বায়ুপ্রবাহের প্রবেশদ্বার চুয়াডাঙ্গা। গরমের সময় ভারতে গুজরাট এলাকায় তপ্ত থাকায় নানা দিক দিয়ে ভারতে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। যার ফলে চুয়াডাঙ্গা খুব কাছে হওয়ায় গরম বেশি অনুভূত হয়। চুয়াডাঙ্গায় শীতের সময় বেশি শীত ও গরমের সময় বেশি গরম অনুভূত হয়।

জেলা প্রশাসক ড. কিসিঞ্জার চাকমা বলেন, চুয়াডাঙ্গায় জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসছে প্রতি বছর। প্রয়োজন মত সময়ে জেলায় ওষুধ, বনজ ও ফলজ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। আর পুকুর, নদী-নালা, জলাশয় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নানাবিধ কারণে সূর্যের প্রখরতা বাড়ছে। এখন থেকে আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করতে হবে সবাই মিলে।

২০০৩ সালে চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

১১ বছর আগে ২০১৪ সালের ২১ মে চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০০২ সালের ২০ মে চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ৪০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস উঠতে শুরু করে। ২০০৩ সালে ২৮ মে ৪০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৪ সালে ১৩ মে ৪২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৫ সালে ২ জুন ৪৩.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৬ সালের ৩০ এপ্রিল ৩৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৭ সালে ৩১ মে ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৮ সালে ২২ এপ্রিল ৪০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০০৯ সালে ২৭ এপ্রিল ৪১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১০ সালে ১০ এপ্রিল ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১১ সালে ১০ জুন ৩৮.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস,  ২০১২ সালে ৪ জুন ৪২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৩ সালে ৯ এপ্রিল ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৪ সালে ২১ মে ৪৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৫ সালে ২২ মে ৩৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৬ সালে ১১ ও ১২ এপ্রিল ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস,  ২০১৭ সালে ৩ এপ্রিল ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৮ সালে  ১৮ জুন ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০১৯ সালে ২৮ এপ্রিল ৩৯.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২০ সালে ৭ এপ্রিল ৩৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২১ সালে ২৫ এপ্রিল ৪০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২২ সালে ২৪ ও ২৫ এপ্রিল ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০২৩ সালে ১৯ ও ২০ এপ্রিল ৪২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় মৌসুমে ৪২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৫ তারিখে ৩৮.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৬ তারিখে ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৭ তারিখে ৪০.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৮ তারিখে ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৯ তারিখে ৪১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২০ তারিখে ৪২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২১ তারিখে ৪২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২২ তারিখে ৪০.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ২৩ তারিখে ৩৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। ২৪ এপ্রিল দুপুর ৩টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আশাদুল হকের বড় মেয়ে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে অনার্সের ছাত্রী। হোস্টেলে থাকেন। আর ছোট ছেলে দামুড়হুদা পাইলট বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। স্বামী-স্ত্রী মিলে চার জনের সংসার। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি গরম পড়ছে। প্রতি বছর গরম বাড়ছে। আজ (বুধবার) সকালে তিনি চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাজরাহাটি গ্রামে একটি পান বরজে মাটি খোঁড়ার কাজে যান। কাজ করতে গিয়ে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থায় পড়েন। ৮ ঘণ্টা কাজ করার পর মজুরি পান ৪৫০ টাকা। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কথা হয় চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের কোর্ট মোড়ে।

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাসলামপাড়ার ভ্যানচালক রবজেল হোসেন, রাস্তায় চলা কষ্ট। রাস্তা থেকে গরম উঠে মুখ পুড়ে যাচ্ছে। পেটের তাগিদে ঘরের বাইরে কাজের জন্য আসা। রোদ, গরম দেখলে হবে না, সংসার ও পরিবার আছে। রোদে মানুষ কম আসছে। ভাড়া নেই বললেই চলে। গরম তো আল্লাহর হাত, মানুষের কোন হাত নেই। একই দুনিয়ার ভিন্ন চিত্র। কাজের ফাঁকে ফাঁকে গাছের নিচে এসে জিরিয়ে নিয়ে, আবার ভাড়া পেলে যাত্রী নিয়ে ছুটতে। 

চুয়াডাঙ্গা বড়বাজার নিচেরবাজারের মুদি ও মনোহারি ব্যবসায়ী আবু বক্কর বলেন, ১০ দিনের বেশি সময় ধরে অলস বসে আছি দোকানে। বুধবার সকাল সাড়ে ৬টায় দোকান খোলার পর দুপুর ২টা পর্যন্ত বিক্রি করতে পেরেছি ৩ হাজার টাকার মত। বাজার এলাকা অনেক ফাঁকা। গরমে মানুষ খাবার কম খাওয়ায় বিক্রি হ্রাস পেয়েছে। সংসার ও দোকান খরচ মিলে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে ২৫০০ টাকা।  প্রতিদিন পুঁজি ভেঙে খেলে, আর গরম অব্যাহত থাকলে মাসে লোকসান হবে প্রায়  লাখ টাকা।

চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আব্দুল বাতেন বলেন, বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কম থাকলে আড়তে বিক্রি স্বাভাবিক ভাবে কম হয়। বিক্রেতা মাল কিনে নিয়ে দিনের দিন বিক্রি করতে না পারলে শুকিয়ে ও পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে লোকসানের ভয়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা অল্প সবজি নিয়েও বিক্রি করতে হচ্ছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।

চুয়াডাঙ্গা ফেরিঘাট রোডের ওহিদ স্টোরের মালিক ওহিদ হোসেন জানান, প্রতিদিন ৫-৭ লাখ টাকার মালামাল বিক্রি করতাম। এখন ১ লাখ টাকা বিক্রি করতে গিয়ে গরমের সাথে বেশি শরীর ঘেমে যাচ্ছে। ব্যবসা করা গরমে কঠিন হয়ে উঠছে। দোকানিরা আবার নানা অজুহাত দেখিয়ে বাকীতে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন মনে হয় আজকে তাপমাত্রা কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হবে, সকালে দোকান খুললে দেখি ভিন্ন চিত্র।

চুয়াডাঙ্গা চৌরাস্তা মোড়ের ফল ব্যবসায়ী হারুন বলেন, গরমের সাথে পেরে উঠছিনা। কারণ আঙ্গুর, আপেল, মাল্টা, লেবুসহ অন্য ফল দোকানে রাখলেই গরমে শুকিয়ে পচে নষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন ৫-১০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। ভাল ফল রাতে রেখে যায় সকালে এসে নষ্ট হওয়া ফল গুলো ফেলে দিতে হয়। গরম না কমলে মানুষের উপস্থিতি বাড়বেনা। 

সময়ের আলো/আরআই





  বিষয়:   শীত-গরম রেকর্ড  তাপমাত্রা  চুয়াডাঙ্গা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: