দাবি আদায়ে বুধবার (২৪ এপ্রিল) তৃতীয় দিনেও উত্তাল ছিল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। দিনভর চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল (মঙ্গলবার) ৯ দফা দাবি ছিল শিক্ষার্থীদের। আজ (বুধবার) আরও এক দফা দাবি যোগ করা হয়। নতুন দাবির মধ্যে আছে চুয়েটের এক শিক্ষকের অপসারণ করা। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ এনে তাকে অপসারণের দাবি করা হয়েছে। দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও জানায় শিক্ষার্থীরা।
এদিকে বুধবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে নগরীর কোতোয়ালি এলাকা থেকে ঘাতক বাস ড্রাইভারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, গত সোমবার (২২ এপ্রিল) চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়ার সেলিমা কাদের কলেজ গেট এলাকায় বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় চুয়েটের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়। এ ঘটনার পর ফুঁসে ওঠে চুয়েট ক্যাম্পাস। সোমবার বিকেল থেকে চলছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। আজ (বুধবার) সকাল সাড়ে ১০টার পর সড়কে তৃতীয় দিনের মতো অবস্থান নেয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বাসের সিট ও টায়ার নিয়ে সড়কের দুই পাশে আগুন লাগিয়ে দেন। এছাড়া তৃতীয় দিনেও গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। চুয়েট গেটের সামনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে জড়ো হয়ে মিছিল দিতে থাকেন। একটানা ১২টা পর্যন্ত মিছিল করে চুয়েট গেটের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীরা। তবে সড়কের দুইপাশে শিক্ষার্থীরা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করে অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অবরোধ অব্যাহত ছিল।
শিক্ষার্থীরা জানান, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের দাবি মেনে নেয়া না হবে ততক্ষণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। অবরোধ চলাকালে শিক্ষার্থীরা নানা স্লোগান দেন। তারা শাহ আমানত ও এবি ট্রাভেলস বাস পরিবহনের রোড পারমিট বাতিল, নিহত দুই শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা, চুয়েটের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় মামলা দায়েরের দাবি জানিয়েছেন। দাবি আদায়ে বুধবার ফের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়া হয়। এসময় ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সকল পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসে ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। বৈঠকের পর চুয়েট প্রশাসন মঙ্গলবার রাতেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেন। কিন্তু তারা এতে আশ্বস্ত হতে পারেনি।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো হলো- শাহ আমানত বাস কর্তৃপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের পরিবারকে যথার্থ ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার সকল ব্যয়ভার এবং দাবি মেনে নিতে শাহ আমানত বাস কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা, চুয়েট কর্তৃপক্ষকে বাদী হয়ে থানায় মামলা করা, চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়কের দ্রুত প্রশস্থকরণ কার্যক্রম শুরু করা, ওই রুটে দূরপাল্লার বাস ছাড়া সব লোকাল বাস (এবি ট্রাভেলস, শাহ আমানত ও অন্যান্য) চলাচল নিষিদ্ধ করা।
এছাড়াও চুয়েট মেডিকেল সেন্টারে প্যাথলজিকাল পরীক্ষা, এক্সরে, ইসিজি ইত্যাদি আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করা, অ্যাম্বুলেন্সে অক্সিজেনপূর্ণ সিলিন্ডার রাখা, শ্বাস প্রদান যন্ত্রের ব্যবস্থাসহ সকল প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।
গ্রেফতার শাহ আমানত বাসের চালক তাজুল ইসলাম। ছবি: প্রতিনিধি
এ ব্যাপারে রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, দাবি মেনে নিয়ে সড়ক নিরাপদ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আশা করছি পরিস্থিতি দ্রুত সময়ের মধ্যে উন্নতি হবে।
এদিকে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে চুয়েটের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ঘাতক শাহ আমানত বাসের চালকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার (২৪ এপ্রিল) দুপুরে নগরীর কোতোয়ালি তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার নাম তাজুল ইসলাম (৪৮)। চালক গ্রেফতারের খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে অন্য দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
এ ব্যাপারে রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি চন্দন কুমার চক্রবর্ত্তী জানান, শাহ আমানত পরিবহনের পলাতক ঘাতক বাস চালককে গোপন সংবাদে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম নগরী থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। চুয়েট শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় তাকে এবং বাসের হেলপারকে আসামি করে সড়ক দুর্ঘটনা আইনে মামলা দায়ের হয়েছিলো। এই মামলায় চালককে আইনি প্রক্রিয়া শেষে জেল হাজতে পাঠানো হবে। মামলার তদন্তও অব্যাহত আছে।
গত ২২ এপ্রিল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়ার সেলিমা কাদের কলেজ গেট এলাকায় মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন চুয়েটের তিন শিক্ষার্থী। দ্রুতগতির শাহ আমানত পরিবহনের একটি বাস শিক্ষার্থীদের মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলে মারা যান চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত সাহা। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান একই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তৌফিক হোসাইন। নিহত শান্ত সাহা নরসিংদী সদরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাজল সাহার ছেলে এবং তৌফিক হোসেন নোয়াখালী সদর উপজেলার সুধারাম থানার নিউ কলেজ রোডের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের ছেলে। এ ঘটনায় আহত হন জাকারিয়া হিমু। তিনি চুয়েটের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। হিমু বর্তমানে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।