সফলতার পথ বরাবরই বন্ধুর। ওই অমসৃণ পথ পাড়ি দিয়েই মানুষের হাতে ধরা দেয় সফলতার সোনার হরিণ। তবে নারী হলে এসব প্রতিকূলতা যেন বেশিই হয়ে ওঠে। নানা রকম বাধা তো আছেই একইসঙ্গে প্রাথমিক প্রতিকূলতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে পরিবার ও সমাজের লালিত বহু কুসংস্কার।
দেশজুড়ে আমাদের মেয়েরা এসব বাধা উপেক্ষা করেই নিজেদের বিকশিত করে। তেমনিভাবেই সবকিছু উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন গৃহবধূ জরিনা খাতুন। কাঁথা সেলাই করে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় একজন সফল কর্মী ও উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তার দেখাদেখি গ্রামের অন্তত ৩০ জন গৃহবধূ এখন সংসারের কাজ সামলে বাড়তি টাকা আয় করছেন। এভাবেই হাত থেকে হাতে আলো ছড়ায় বাংলার ঘরে ঘরে।
জরিনা মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ষোলটাকা ইউনিয়নের জুগিরগোফা গ্রামের সাইফুল ইসলামের স্ত্রী। বছর সাতেক আগে জরিনার বাবার বাড়িতে বড় ভাবির কাছ থেকে সেলাইকাজ শেখেন তিনি। ভাবির দেওয়া দুয়েকটি কাঁথা নিয়ে সেলাই করে কিছু টাকা আয় করতেন। সংসারের কাজের পাশাপাশি বাড়তি আয় করার প্রত্যয় নিয়ে শুরু করেন সেলাইকাজ।
সেই থেকে সপ্তাহে একটি করে নকশিকাঁথা সেলাই করেন। প্রতিটি কাঁথার জন্য পান ৭০০ টাকা থেকে শুরু ১ হাজার ৬০০ টাকা। কাঁথার আকার ও নকশা ভেদে সেলাইয়ের মজুরি বাড়ে।
জরিনার কাজ দেখে আশপাশের নারীদের আগ্রহ বাড়ে। তাদের আগ্রহে সাড়া দেন জরিনার বড় ভাবি। তিনি নকশা আঁকা কাঁথা পাঠান জরিনার কাছে। এভাবেই ধীরে ধীরে একজন দুইজন করে বাড়ে কর্মীর সংখ্যা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে দক্ষতা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে মজুরি। এভাবেই উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিবেশী জুমারা, ফেরদৌসি, রোজিনা, সখিনাসহ অন্তত ৩০ জন যুক্ত হন জরিনার দলে।
প্রত্যেকে সপ্তাহে অন্তত একটি করে কাঁথা সেলাই করেন। এতে ঘরে বসেই প্রতি মাসে মাথাপিছু অন্তত ৪-৫ হাজার টাকা আয় করেন।
ফেরদৌসি খাতুন জানান, সকালে সাংসারিক কাজ শেষ হওয়ার পর তেমন কোনো চাপ থাকে না সারা দিন। অলস সময় পার করতাম। অথচ গত সাত বছর ধরেই জরিনা ঘরের কাজ সামলে কাঁথা সেলাই করে আয় করে। তাকে দেখেই আমি অনুপ্রাণিত হই। আমাদের কিছুই কিনতে হয় না। আমাদের কেবল একটি সেলাইয়ের সুচ দরকার। বাদবাকি সবকিছু যেমন বাহারি রঙের সুতা ও কাঁথা জরিনাই সংগ্রহ করে রাখে। সেলাই শেষ করে আমরা আবার জরিনার কাছে কাঁথা জমা দিয়ে আসি।
এই কাজে মাস শেষে হাতে আসে বাড়তি টাকা। এ দিয়ে সংসারকে সহায়তা করা ছাড়াও বাচ্চাদের পড়ালেখার খরচ জোগান দেওয়া সম্ভব হয়। জীবনযাপন সহজ হয়।
গৃহবধূ সখিনা খাতুন জানান, তিনি ও তার মেয়ে এখানে সেলাইয়ের কাজ করেন। একা বরের আয় দিয়ে সংসার চলে না। নিজের কোনো চাহিদা মেটাতে পারতেন না। এখন মা ও মেয়ে মাসে অন্তত ১০ হাজার টাকা আয় করেন। এদিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয় রাখেন। একই কথা জানালেন গৃহবধূ রোজিনা ও জুমারা খাতুন।
সরেজমিন জরিনার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, নারীরা সম্মিলিতভাবে কাঁথা সেলাই আর গল্প করছেন। সবার মুখেই হাসির ঝিলিক।
কেউ বুনছেন নকশিকাঁথা, আবার কেউ ফোঁড়ে ফোঁড়ে কাঁথায় তুলছেন মাছ আর পটোল ডিজাইন। বেশ কয়েক রকমের কাঁথা সেলাই করা হয় এখানে। বিশেষ করে নকশি কাঁথা যথাক্রমে, গোলক ধাঁধা, পুকুর দাগা, বাঁশপাতা, বেকির লতা, মেট্রো হাসি, পদ্ম পাতা প্রভৃতি। এ ছাড়াও শীতের চাদর, শাড়ি, থ্রিপিসসহ অন্যান্য অনুষঙ্গের নকশা সেলাই করা হয়। ডিজাইন ও কাপড় ভেদে পারিশ্রমিকও ভিন্ন।
নারী উদ্যোক্তা জরিনা খাতুন জানান, একসময় স্বাভাবিকভাবে সেলাইকাজ শুরু করা। পরে এটা যে এতটা বিস্তৃত হবে তা ভাবতে পারেনি। ভাবির কাছ থেকে আগে কাঁথা নিয়ে আসা হতো দুয়েকটি করে। এখন তারাই গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়ে যায়, আবার সেলাই শেষে তারাই কাঁথা সংগ্রহ করে। শুধু তাই নয়, জরিনার কাছ থেকে কাঁথার সেলাই মজুরি নির্ধারণ করে অন্যের কাছে সরবরাহ করে মুনাফাও অর্জন করেন এলাকার বেশকিছু নারী।
গাংনী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসিমা খাতুন জানান, জরিনার এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। দক্ষতা বাড়াতে জরিনার মতো নারীদের কাঁথা সেলাইয়ের পাশাপাশি সেলাইয়ের প্রশিক্ষণও দেওয়া যেতে পারে। আর যদি ছোট ছোট দল গঠন করে ঋণের আবেদন করেন তা হলে তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যাপারে মহিলা বিষয়ক অধিদফতর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।