বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আরও বাণিজ্যিক সুবিধা বাড়ানোর জন্য স্থলবন্দর গড়ে তোলা হয় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার শেষ প্রান্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত রামগড় এলাকায়। কিন্তু এরই মধ্যে উদ্বোধনেই কেটে গেছে কয়েক বছর। এখনও শুরুই হয়নি বন্দরের কার্যক্রম। রামগড়-সাব্রুম স্থলবন্দরে যাত্রী ও পণ্য পারাপারের কার্যক্রম চালুর প্রতীক্ষা আর প্রতিশ্রুতির সমাপ্তিই যেন হচ্ছে না। কবেনাগাদ এ স্থলবন্দর চালু হবে সুনির্দিষ্টভাবে দুই দেশের কেউই বলতে পারছে না।
তবে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভারতের অংশে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় চালু করা যাচ্ছে না। অনুরূপভাবে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ যখনই চালু করতে চাইবে তারা প্রস্তুত আছে।
সরেজমিন জানা যায়, পণ্য আমদানি-রফতানি বা পারাপার কার্যক্রম শুরু করতে আরও এক-দেড় বছর লেগে যাবে। কারণ রামগড় স্থলবন্দরের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও নির্মাণ হয়নি। এ ছাড়া স্থলবন্দরের সংযোগকারী বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ শেষ হতে বছর লেগে যাবে।
অন্যদিকে, শুধু যাত্রী পারাপারের কার্যক্রমও চালু করার জন্য রামগড় ও সাব্রুম কোথাও এখনও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ কিংবা সরঞ্জাম স্থাপন সম্পন্ন হয়নি। এদিকে কার্যক্রম চালু নিয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো খবর না থাকায় রামগড় ও সাব্রুমের বাসিন্দাদের মাঝে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের সেভেন সিস্টার্সখ্যাত উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্য ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে রামগড় ও ত্রিপুরার সাব্রুম স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ নেয় দুই দেশের সরকার। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে সে দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এ স্থলবন্দর চালুর যৌথ সিদ্ধান্ত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে এ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার কাজ চলবে।
স্থলবন্দর চালুর লক্ষ্যে রামগড়ে মহামুনি এলাকায় ৪১২ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৪.৮০ মিটার প্রস্থের বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সেতু-১ নামের একটি আন্তর্জাতিক মানের সেতু নির্মাণ করেছে ভারত। ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ সেতুটি ২০২১ সালের ৯ মার্চ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন। এর আগে ২০১৫ সালের ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ মৈত্রী সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে সংযোগকারী নদীর ওপর নির্মিত এটিই প্রথম সেতু। সেতুর পূর্বপ্রান্তে রামগড় পৌরসভার মহামুনি এলাকায় স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন ও বিজিবি আইসিপি ভবন এবং অন্যপ্রান্তে দক্ষিণ ত্রিপুরার সাব্রুম মহকুমার নবীনপাড়ায় সাব্রুম স্থলবন্দরের আইসিপি ভবন। মহামুনিতে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রামগড় স্থলবন্দরের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবনটি গত বছরের ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন। এর ৪ মাসের মাথায় গত ৯ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাব্রুম স্থলবন্দরের কার্গো টার্মিনাল ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন।
সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমনটা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রামগড়ের প্যাসেঞ্জার টার্মিনালটি উদ্বোধন করেন, অনুরূপভাবে ভারতের আসন্ন লোকসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদি সাব্রুমের কার্গো টার্মিনালটি উদ্বোধন করেছেন। এর আগে গত বছরের ২৪ মে স্থলবন্দরের সংযোগকারী বারৈয়ারহা-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প কাজের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
সাব্রুমের স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাব্রুম স্থলবন্দরে আইসিপি (ইন্ট্রিগ্রেটেড চেক পোস্ট), কার্গো ও প্যাসেঞ্জার টার্মিনালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। তবে বন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার আবাসন ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়নি। ফলে বিভাগগুলোর অফিসে লোকবল নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপিত হয়নি। অন্যদিকে, রামগড়ে প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ছাড়া আর কোনো অবকাঠামোই তৈরি হয়নি এখনও। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে গত বছরের মে মাসে একজন সহকারী পরিচালককে রামগড়ে পোস্টিং দেওয়া হলেও কার্যক্রম চালু না হওয়ায় তাকে গত সেপ্টেম্বরে অন্যত্র বদলি করা হয়। বর্তমানে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এবং কাস্টমস বিভাগের একজন রাজস্ব কর্মকর্তা পোস্টিং রয়েছে। এ ছাড়া ইমিগ্রেশন বিভাগে ৮-১০ জন স্টাফের মধ্যে এখন ইমিগ্রেশন ইনচার্জসহ আছেন তিনজন। তারা সবাই কর্মহীন অবস্থায় আছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রামগড় স্থলবন্দরের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হতো। কিন্তু ভারতীয় সীমান্তরক্ষীবাহিনী বিএসএফের বাধায় কাজ করা যায়নি। সূত্র জানায়, ২০২২ সালে রামগড়ের মহামুনি এলাকায় অধিগ্রহণকৃত ১০ একর জায়গায় বন্দরের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর মধ্যে আইসিপি, কাস্টমস, প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবন, পোর্ট বিল্ডিং, ট্রান্সশিপমেন্ট শেড, ওয়্যার হাউস, ইয়ার্ডসহ বিভিন্ন অফিস ও আবাসিক ভবন ইত্যাদি নির্মাণের জন্য ১৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মনিকো লিমিটেড নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সমাপ্ত করার পর ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি কাজ শুরু করলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এতে বাধা দেয়। বাধার কারণে দীর্ঘ ১ বছরেও কাজ শুরু বা সমাপ্ত করতে না পারায় বিশ্ব ব্যাংক প্রকল্পের বরাদ্দ বাতিল করে।
সূত্র জানায়, বহু দেনদরবারের পর ভারত বন্ধ প্রকল্পের কাজ করতে সম্মতি জানানোর পর পুনরায় ঠিকাদার নিয়োগ করে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি মাসুদ স্টিল লিমিটেড ও মনিকো লিমিটেড নামের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় ১৮৫ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প কাজের জন্য। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নতুনভাবে ১০ দশমিক ১৪ একর ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, অবকাঠামো তৈরির জন্য ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে।
রামগড় স্থলবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. সরোয়ার আলম বলেন, ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, বিএসএফের বাধা না থাকলে অনেক আগেই প্রকল্পের কাজ শেষ হতো। প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়কে ২৮১ কোটি টাকায় ইতিমধ্যে জাইকার তত্ত্বাবধানে ৮টি ব্রিজ ও ৮টি কালভার্ট এবং রামগড়ের ফেনীরকূল এলাকায় প্রধান সড়কে রোড লোড স্কেল প্রকল্পের কাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে ১ হাজার ১০৭ কোটি টাকার ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বারৈয়ারহাট-হেঁয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজও দ্রুতগতিতে চলছে। তিনি বলেন, পণ্য পারাপার কার্যক্রম শুরু করতে আরও সময় লাগবে। তবে যাত্রী পারাপারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে রামগড় ইমিগ্রেশন। তবে ভারতের অংশে প্রস্তুতি অসম্পন্ন থাকায় যাত্রী পারাপার চালু করতে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারতের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে হয়তো অল্প সময়ের মধ্যে চালুর সম্ভাবনা আছে।
রামগড় স্থলবন্দরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইনচার্জ) মো. আফতাব উদ্দিন বলেন, ‘পণ্য পারাপারের কার্যক্রম শুরুর জন্য এখনও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। তবে যাত্রী পারাপারের জন্য রামগড় ইমিগ্রেশন প্রস্তুত আছে। কবে নাগাদ এ কার্যক্রম চালু হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুই দেশের সরকারই দিন-তারিখ নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে, ভারতের সাব্রুম স্থলবন্দর কর্মকর্তা দেবাশীষ নন্দী বলেন, যাত্রী পারাপারে সাব্রুম স্থলবন্দর পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। তিনি বলেন, দুই দেশেই উদ্বোধনে-উদ্বোধনে তিন বছর চলে গেছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ফোনে প্রশ্ন করছেন কবে এ স্থলবন্দরে যাত্রী পারাপার শুরু হবে। কিন্তু তাদের কোনো জবাবই দেওয়া যাচ্ছে না।