উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর কয়েক দিনের অতিবৃষ্টির কারণে সিলেটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৫ উপজেলার লাখেরও বেশি মানুষ। সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, সারিনদী, ধলাই ও সারিগোয়াইন নদীর পানি ৬ পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। কোথাও কোথাও তলিয়ে গেছে সড়ক-মহাসড়ক। হাওরাঞ্চলের বাড়িঘরের মানুষ এখন পানিবন্দি দিন কাটাচ্ছেন।
বন্যাকবলিত গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলার জন্য শুকনো খাবার, চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দ করেছে জেলা প্রশাসন।
পাহাড়ি ঢলের কারণে সারিঘাট-গোয়াইনঘাট সড়কের দুটি পয়েন্ট এবং গোয়াইনঘাট-রাধানগর-জাফলং সড়কের শিমুলতলা পয়েন্ট প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর, লেংগুড়া, ডৌবাড়ি, নন্দীরগাঁও ইউনিয়ন, পূর্ব ও পশ্চিম আলীরগাঁও, পশ্চিম জাফলং ও মধ্য জাফলংয়ে প্লাবনের পরিমাণ বেশি হয়েছে। জৈন্তাপুর উপজেলার ৪-৫টি ইউনিয়নসহ কানাইঘাট ও কোম্পানীগঞ্জের বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি দিন কাটাচ্ছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারাসহ সব নদীর পানি বৃহস্পতিবার সকালের দিকে বাড়লেও দুপুরের পর থেকে কিছুটা কমতে থাকে। পওে বেলা ৩টা থেকে আবারও বাড়তে থাকে নদ-নদীর পানি। সুরমা, কুশিয়ারা, সারিনদী, ধলাই ও সারিগোয়াইন নদীর পানি কানাইঘাট, আমলসিদ, শেওলাম সারিঘাট ও সারিগোয়াইন পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বেশ কয়েকটি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে নদীর তীর রক্ষা বাঁধ।
এদিকে বন্যার পানি বাড়ায় সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের বেশ কয়েকটি স্থান তলিয়ে গেছে। ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে এ সড়কে। পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় অভ্যন্তরীণ সড়ক তলিয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। পাঁচ উপজেলার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। এদিকে পানি বাড়ায় পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্র।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজিত কুমার চন্দ সময়ের আলোকে বলেন, অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ধলাই নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলো পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সাদাপাথর পর্যটনঘাটসহ সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি কমলে আবারও পর্যটন কেন্দ্রগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এদিকে বুধবার রাত থেকে পানি আকস্মিকভাবে বাড়ায় পানিবন্দি মানুষ বিপাকে পড়েন। তারা বিভিন্নভাবে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৌকাযোগে উদ্ধারের আকুতি জানান। এদিকে হঠাৎ করে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নৌকার মাঝিরাও ইচ্ছেমতো দরদাম হাঁকিয়ে হয়রানি করেন ভুক্তভোগীদের। এদিকে রাতেই নৌকা নিয়ে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে নামেন পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।
কানাইঘাট সদরের আমিনুল ইসলাম বলেন, কানাইঘাটের মুলাগুলসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। হঠাৎ বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছেন। অনেক স্থানে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের রাস্তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
জৈন্তাপুর উপজেলার সাব্বির জানান, আমার বাড়িতে হাঁটু পানি। পানি আরও বাড়ছে। ময়নাহাটি খেয়াঘাট এলাকাসহ উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা ডুবে গেছে। গত রাতে অনেককে নৌকাযোগে উদ্ধার করা হয়।
এদিকে বন্যার্তদের জন্য সিলেটের গোয়াইনঘাটে ৫৬টি, কোম্পানীগঞ্জে ৩৫টি, জৈন্তাপুরে ৪৮টি ও কানাইঘাটে ১৮টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যার্তরা এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছেন।
সিলেট আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ শাহ মো. সজীব হোসাইন বলেন, সিলেটের প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। বুধবার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৪৬ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলতি মে মাসের ২৯ দিনে ৭০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা মে মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের তুলনায় বেশি। মে মাসের গড় বৃষ্টিপাত ৫৭০ মিলিমিটার বলে জানিয়েছেন তিনি।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, উপজেলার অধিকাংশ এলাকা বন্যায় তলিয়ে গেছে। ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে। আমরা পানিবন্দি ও বন্যার্তদের সহযোগিতায় প্রতিটি মুহূর্তে কাজ করে যাচ্ছি। জেলা প্রশাসক বৃহস্পতিবার গোয়াইনঘাটের পানিবন্দি মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন ও ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক শেখ রাসেল হাসান বন্যার্তদের অবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
তিনি জানান, বন্যাকবলিত লোকজনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২০০ বস্তা করে মোট ১ হাজার বস্তা শুকনো খাবার, ১৫ টন করে ৭৫ টন চাল, ৫০ হাজার টাকা করে আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এদিকে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। জরুরি প্রয়োজনে যাতে বিপদাপন্ন সবাই যোগাযোগ করতে পারেন, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোবাইল নম্বর উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/আরএস/