লবণের রেকর্ড উৎপাদনেও কাঁচা চামড়া আড়তে দুশ্চিন্তা

সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম

সারাদেশ

লবণের দাম বাড়ায় চামড়া সংরক্ষণে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা। চট্টগ্রামে ২৫-৩০ হাজার টন লবণ লাগবে

2024-06-12T01:07:49+00:00
2024-06-12T01:07:49+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
লবণের রেকর্ড উৎপাদনেও কাঁচা চামড়া আড়তে দুশ্চিন্তা
কুরবানির কাঁচা চামড়ায় লবণের ব্যবহার
সাইফুদ্দিন তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ১২ জুন, ২০২৪, ১:০৭ এএম 
লবণের রেকর্ড উৎপাদনেও কাঁচা চামড়া আড়তে দুশ্চিন্তা
লবণের দাম বাড়ায় চামড়া সংরক্ষণে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা। চট্টগ্রামে ২৫-৩০ হাজার টন লবণ লাগবে এবার। প্রতিটি গরুর চামড়ার জন্য লবণ লাগে গড়ে ৮-১০ কেজি করে। প্রতিটি ছাগলের জন্য লবণ লাগে ২ কেজি করে। ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা লবণ এক মাস আগেও ছিল ৮৫০ টাকা। এখন ৯৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বস্তা লবণের দাম বাড়ানো হয়েছে ১০০ টাকা করে। সিন্ডিকেট করেই লবণের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করছেন আড়তদাররা।

তারা বলছেন, কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বস্তাপ্রতি ১০ টাকা দাম বাড়লেও ব্যয় বেড়ে যায় অনেক। সেখানে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা করে লবণের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে আড়তদাররা ক্ষতির মুখে পড়বেন।
চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, সারা বছর লবণের দাম স্থিতিশীল থাকলেও কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে অস্থির হয়ে পড়ে। লবণের দাম বাড়তেই থাকে। এক মাস আগে ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা লবণের দাম ছিল ৮৫০ টাকা। আর এখন প্রতি বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ টাকা করে। শুধু প্রতি বস্তা লবণের দাম ৯৫০ টাকা হিসাব করা যাবে না। লবণ পরিবহন করে আড়ত পর্যন্ত আনতে ব্যয় ও মজুরি হিসাব করলে আরও ১০০ টাকা যোগ করতে হবে। তখন প্রতি বস্তা লবণের দাম পড়ে ১ হাজার ৫০ টাকা।

আড়তদাররা জানান, চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হলে তাদের পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পুরো অর্থই গচ্চা যায়। এ জন্য লবণ সঠিক নিয়মে সংরক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই কুরবানির ঈদের আগেই কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে ট্যানারি থেকে বিক্রি পর্যন্ত লবণ একটি বড় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে সঠিক নিয়মে লবণ যুক্ত করা হলে চামড়া নষ্টের আশঙ্কা থাকে না। 

লবণ যুক্ত করতে হেরফের হলে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আড়তদাররা নিজেরা তদারকির মাধ্যমে প্রশিক্ষিত শ্রমিকদের মাধ্যমে চামড়ায় লবণ যুক্ত করেন। সেই লবণ যুক্ত চামড়া ট্যানারির কাছে বিক্রি করতে দীর্ঘ সময় ধরে চলে দর কষাকষি। লবণ বিক্রেতা সিন্ডিকেট কুরবানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো কোনো সময় তারা লবণের দাম বৃদ্ধি করতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। আবার কোনো সময় সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। উদ্দেশ্য একটাই, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লবণের দাম বাড়িয়ে দেওয়া।

মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা দেশে বার্ষিক লবণের চাহিদা ২৫ লাখ টন। শুধু কুরবানির ঈদের মৌসুমে লবণের চাহিদা থাকে ১ লাখ টন। গত বছর কুরবানির ঈদে লবণের চাহিদা ছিল ৮৯ হাজার টন। এবার ১১ হাজার টন চাহিদা বেড়েছে। সব মিলিয়ে বছরে চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি থাকে ৯৫ হাজার টন থেকে ১ লাখ টন। চাহিদার বিপরীতে লবণের উৎপাদন ভালোই হচ্ছে। চট্টগ্রামের মোট ৬০টি সক্রিয় মিলে কাঁচা লবণ প্রক্রিয়াজাত করে বস্তা ভর্তি করা হয়। দেশের বড় বড় লবণ মাঠ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায়। চট্টগ্রামের চেয়ে পরিমাণে কক্সবাজার এলাকায় বেশি লবণ উৎপাদন হয়। এসব জায়গায় লবণ চাষিরা সারা বছর লবণ উৎপাদনের কাজে যুক্ত থাকে।

চট্টগ্রাম নগরীর মাঝিরঘাট এলাকার লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির সময়ের আলোকে বলেন, লবণের দাম বাড়েনি। লবণের কোনো সংকট নেই। আমরা শুধু কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে মিল গেটে প্রতি কেজি লবণ ১০ টাকায় বিক্রি শুরু করেছি। যার যত প্রয়োজন তা সরবরাহ করার মতো লবণ মজুদ আছে চট্টগ্রামের লবণ মিলগুলোতে।

চট্টগ্রামে কুরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে ৪০ হাজার টন লবণ লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি গবাদিপশুর চামড়া সংরক্ষণে সর্বোচ্চ ৮০ টাকার লবণ লাগে। সেই লবণ চামড়ার আড়তদাররা যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারেন না। শুধু চামড়া সংরক্ষণে লবণের যথাযথ ব্যবহার না থাকায় প্রতি বছর প্রচুর চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এতে শুধু চামড়া সংগ্রহকারীই নন দেশের অর্থনীতিরও ক্ষতি হয়।

চট্টগ্রাম লবণ মিল মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত যুগ্ম সম্পাদক মোহাম্মদ বখতেয়ার সময়ের আলোকে বলেন, লবণের সিন্ডিকেট ব্যবসা কোনো সময়ই ছিল না। বর্তমানে ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা ৯০০-৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে চামড়া সংরক্ষণের জন্য যে মানের লবণ ব্যবহার করা হয় তা পর্যাপ্ত মজুদ আছে। আড়তদাররা যত চাইবে তত সরবরাহ করার মতো মজুদ আছে। সংকটের কোনো কারণ নেই।

বিসিকের দাবি সর্বোচ্চ লবণ উৎপাদন : গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ৬২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লবণ উৎপাদন হয়েছে। চলতি মৌসুমের এপ্রিল পর্যন্ত রেকর্ড ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫৮ টন লবণ উৎপাদন হয়েছে বলে জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ৬২ বছরের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে লবণ উৎপাদনের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২২ লাখ ৩২ হাজার ৮৯০ টন। তবে চলতি লবণ মৌসুমের ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫৮ টন লবণ উৎপাদনের মাধ্যমে আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে।

বিজ্ঞপিতে লবণ চাষে জমির পরিসংখ্যান দিয়ে বলা হয়, চলতি লবণ মৌসুমে লবণ চাষ করা মোট জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৩৫৭ একর। গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ৪২৪ একর। গত বছরের তুলনায় এ বছর লবণ চাষের জমি বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ একর। চলতি লবণ মৌসুমে লবণ চাষির সংখ্যা ৪০ হাজার ৬৯৫ জন। যা গত বছর ছিল ৩৯ হাজার ৪৬৭ জন। গত বছরের তুলনায় এ বছর লবণ চাষির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১ হাজার ২২৮ জন। বর্তমানে লবণ মাঠ পর্যায়ে মণপ্রতি অপরিশোধিত বা কাঁচা লবণের গড় মূল্য ৩১২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৪২০ টাকা।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের উপ-মহাব্যবস্থাপক ও লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, লবণের কোনো সংকট নেই। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৬২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লবণ উৎপাদন হয়েছে। বরং উৎপাদন বেশি হওয়ায় লবণ মিল মালিকরা ক্রেতা সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, আমরা চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মনিটরিং টিম পাঠিয়েছি লবণের উৎপাদন বিক্রি সরবরাহ তদারক করার জন্য। তাদের কাছ থেকে আমরা প্রতিদিন তথ্য সংগ্রহ করে আসছি। তাতে বেশ সন্তোষজনক তথ্য পাচ্ছি। কোথাও কোনো সংকটের তথ্য নেই।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: