ঘূর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে ও উজানের পানির সাথে ভেসে আসার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে দেখা মিলছে বিষাক্ত ‘রাসেল ভাইপার’ সাপ। গ্রামগঞ্জের মানুষের মধ্যে বিষধর এই সাপ সম্পর্কে একদমই কোনো ধারণা বা পরিচিতি নেই বললেই চলে। এর আগের নাটোর জেলার পার্শ্ববর্তী জেলা রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় দু’একটি জায়গায় রাসেল ভাইপার প্রজাতির সাপ ধরা পড়লেও তা বনে অবমুক্ত বা পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। সাধারণ জনগণের মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
জেলার লালপুরে পদ্মার চরে বিষধর রাসেলস ভাইপার (চন্দ্রবোড়া) সাপের দেখা মিলাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চরাঞ্চলজুড়ে। শনিবার (২২ জুন) দুপুরে উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নসাড়া চরের বাদামের জমিতে চারটি সাপ দেখতে পান স্থানীয় কৃষকরা।
স্থানীয কৃষকরা জানান, ওই চরে ৭/৮ জন কৃষক বাদাম উঠাতে যান। এসময় তারা বাদামের জমিতে একটি বড় ও তিনটি বাচ্চা সাপ দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং পিটিয়ে মেরে ফেলেন। এনিয়ে পদ্মা নদীর চরাঞ্চল তীরবর্তী বসবাস করা মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন বলে জানান তারা।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে জানা যায়, নাটোর জেলায় ২০১৮ থেকে ২০ সালের পর বিষাক্ত ‘রাসেল ভাইপার’ সাপের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৩ সালে ৪ জন সাপে কাটা রোগীকে অ্যান্টি ভেনেম দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরে ৯ জন রোগীকে অ্যান্টি ভেনেম দেওয়া হয়। সরকারি হাসপাতাল গুলোতে অ্যান্টি ভেনমের কোন সংকট নেই। উপজেলা পর্যায়ে দুইজনকে এবং জেলা সদরে ১০ জনকে অ্যান্টি ভেনেম দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে জেলার লালপুর পদ্মা চরাঞ্চল এবং নদীর তীরবর্তী লোকালয়ে ভয়ঙ্কর রাসেলস ভাইপার সাপের আতঙ্ক বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। রাসেল ভাইপার নামক বিষধর সাপের আক্রমণে আতঙ্কে দিন পার করছেন এসব এলাকার জনসাধারণ। সেখানে পদ্মা চরাঞ্চলে এবং নদীর তীরবর্তী লোকালয়ে রাসেলস ভাইপারের চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কৃষির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে রাসেলস ভাইপার আতঙ্ক। এছাড়াও শুক্রবার দিনভর নাটোর পৌর শহরের বাসাবাড়ি ও চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সব জায়গাতে এই বিষধর সাপ নিয়ে আলোচনা চলছে।
মুক্তার হোসেন নামের স্থানীয় একজন জানান, এই প্রজাতির সাপ খুব ভয়ঙ্কর ও মারাত্মক। তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা খুব চিন্তিত ও ভয়ে আছি। বাড়ির শিশুরা নদীর পাড়ে খেলা করে, সেখানে সাপের ভয়ে নদীতে গোসল করতে নামে না।
এদিকে লালপুর এলাকার সিদ্দিকুর রহমান এক ব্যক্তি বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে আমাদের এলাকায় সাপ দেখে পিটিয়ে মেরেছেন স্থানীয় লোকজন। এটি এখন আমাদের এই অঞ্চলের জন্য আতঙ্ক। প্রশাসনসহ সবাইকে এ বিষয়ে সতর্কতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানো দরকার।
এছাড়াও শহরের বঙ্গজল এলাকার বাসিন্দা শেফালী সাগের ভয়ে কার্বলিক এসিড (ফেনল) কিনেছেন যা ঘরে রাখলে সাপ আসে না বা সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচা যায়।
তথ্য অনুযায়ী উত্তর এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতেই ওই সাপের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। ওই প্রজাতির সাপের সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি ছিল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তবে বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ওই প্রজাতির সাপের উপস্থিতি বেড়ে গেছে।
উত্তরবঙ্গে রাসেল ভাইপার সাপ চন্দ্রবোড়া বা উলুবোড়া নামে পরিচিত। সাপটির গাঁয়ের রং এবং চিত্রাকৃতির হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ ওটিকে নদীতে বাস করা অথবা অজগর সাপের ছদ্মনাম বলেই জানে। বাংলাদেশে যে সকল সাপ দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে ওটিই সবচেয়ে বিষাক্ত সাপ।
বিষাক্ত ‘রাসেল ভাইপার’ বা চন্দ্রবোড়া সাপের দেখা মিলছে যেসব এলাকায়, সেখানকার বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানালেন, সংকট আছে অ্যান্টি ভেনমের। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, জেলার ৭টি উপজেলায় সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টি ভেনেমের কোনো সংকট নেই।
এ বিষয়ে লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএম শাহাবুদ্দিন বলেন, সাপে দংশন করলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত এন্টি ভেনাম রয়েছে। রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহবান জানান তিনি।
রাসেল ভাইপার সম্পর্কে চলনবিল অধ্যাসিত সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. এএসএম আলমাছ বলেন, বর্ষাকালে রাসেল ভাইপার ভারত থেকে পদ্মা নদীর মাধ্যমে দেশে আসতে পারে। তাই সবাইকে সাবধানে চলাচল করতে হবে, বিশেষ করে যারা পদ্মা নদীর তীরে বসবাস করেন।
তিনি আরও বলেন, কাউকে সাপে কাটলে ওঝার কাছে না গিয়ে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে।
নাটোরের সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে দুইজনকে এবং জেলা সদরে ১০ জনকে অ্যান্টি ভেনেম দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। কোন উপজেলায় চাহিদা বেশি হলে জেলা সদর থেকে তা সরবরাহ করা হবে। এছাড়া একজনের ডোজ হাতে থাকতেই আমরা চাহিদা প্রেরণ করে থাকি।
নাটোরের জেলা প্রশাসক আবু নাছের ভুঁইঞা বলেন, রাসেলস ভাইপার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই। আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। এজন্য জেলার স্বাস্থ্য বিভাগকে বলা হয়েছে। তাই সকলকে সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। রাতে চলাচলের সময় টর্চ লাইট ব্যবহার করতে হবে; বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার ও আবর্জনামুক্ত রাখতে হবে। জ্বালানি লাকড়ি, খড় সরানোর সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আর সাপ দেখলে তা ধরা বা মারার চেষ্টা করা যাবে না। প্রয়োজনে জাতীয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে কল করতে হবে বা নিকটস্থ বন বিভাগের অফিসকে জানাতে হবে।
সময়ের আলো/আরআই