কুষ্টিয়ার সাবিনা শারমিন। এ শহরেই তার বেড়ে ওঠা। সাত বছর বয়স থেকে এ শহরকেই আপন করে বড় হয়েছেন তিনি। কুষ্টিয়া শহরের হাটশ হরিপুর ইউনিয়নে পৈতৃক বাড়িতেই কেটেছে তার ছেলেবেলা।
ছেলেবেলায় অন্যসব শিশুর মতো তারও স্বপ্ন ছিল ভিন্নরকম কিছু করবেন। কিন্তু উদ্যোক্তা হয়ে উঠবেন এ কথা ভুলেও ভাবেননি তিনি। নিজের ব্যবসা, সমাজসেবা সবই সামলেছেন এক হাতে। বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি দুপক্ষের লোকেরই অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল তার কাজের প্রতি। সবার ভালোবাসায় বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এত কিছু সত্ত্বেও কাজের প্রতি ভালোবাসা আর একাগ্রতা কমেনি বিন্দুমাত্র। নানা অঙ্গনে কাজ সত্ত্বেও নিজের কাজকেই আপন করে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
উদ্যোক্তা সাবিনা শারমিন কুষ্টিয়া সাইত্তিক মীর মশারফ হোসেন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, কুষ্টিয়া সরকারি গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি এবং কুষ্টিয়া সরকারি গার্লস কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাবিনা শারমিন বলেন, আমার বাবা মরহুম রুস্তম আলী ছিলেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। ছোটবেলা থেকেই তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে আমি বড় হয়েছি। তখন থেকেই নিজে ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হওয়া মাত্রই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সংসার সামলে অনেক বড় পরিসরে ব্যবসা বা এ জাতীয় কিছু করা সম্ভব হয়নি। তারপরও বিয়ের পর যখন আমি গ্রামে থাকতাম তখন আমি হাঁস-মুরগিসহ বিভিন্ন গবাদিপশু লালনপালন করতাম। বর খোকসার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুল ইসলাম দুলালের চাকরির সুবাদে শহরে চলে আসতে হয়। শহরে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করি। পরবর্তীতে সন্তানরা বড় হলে ২০১৫ সালে আমি আমার সাবিনা বুটিক্স হাউসের যাত্রা শুরু হয়।
সাবিনার প্রতিষ্ঠানের মূল পণ্য নকশিকাঁথা। পাশাপাশি নকশি চাদর, কুশন কভার, শাড়ি, ওয়ান পিস-টু-পিস থ্রি-পিস, ওড়না, মশারি, চাদর, ব্লক বাটি, রং ও ডাইসের কাজ। এ ছাড়া সরাসরি তাঁতিদের কাছ থেকে পণ্য এনেও বিক্রি করেন তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন গরিব অসহায় শিশুদের জন্য মাদরাসা। মাদরাসায় শিশুদের তিন বেলা খাবার দেওয়ার দেখভালও সরাসরি নিজে করার চেষ্টা করেন তিনি।
সাবিনা শারমিন ২০১৫ সাল থেকে ব্যবসা শুরু করেন। নকশিকাঁথার আগে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে থ্রিপিসের ব্যবসা ছিল তার। নকশিকাঁথা তার কাজে আলাদা মাত্রা এনে দেয়। ধীরে ধীরে কাজের পরিসর বাড়তে থাকে। সে অনুযায়ী ক্রেতা শুভানুধ্যায়ীর ভালোবাসায় এগোয় সাবিনার উদ্যোগ। সাবিনা সবসময়ই পুরোনো ক্রেতা ধরে রাখার ব্যাপারে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। পুরোনো ক্রেতার সঙ্গে বেড়েছে নতুন ক্রেতাও। তবে হাতের কাজের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে চাইলেও অতিরিক্ত উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয় না। প্রতিটি কর্মী একটি নির্দিষ্টসংখ্যক কাঁথার বেশি সেলাই করার সক্ষমতা রাখেন না। কর্মীর বেতন, কাঁচামালের খরচ, কারখানা ও শোরুমের খরচ শেষে মাসে ১ থেকে দেড় লাখ করেন সাবিনা। তিনি খোকসা উপজেলার নিজের বলার মতো একটা গল্প ফাউন্ডেশনের অ্যাম্বাসেডর এবং সিডিএল ট্রাস্ট ও নারী ফোরামের সদস্য।
সাবিনা বলেন, হাতের কাজের কদর সবসময়ই থাকে এটা বলতেই হয়। কিন্তু আমার এই উদ্যোগ শুরু করার আগে আমি অনেকটা সময় নিয়ে বাজার বিশ্লেষণ করি। যার ফলে উদ্যোগের শুরু থেকেই খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। কেননা ভিন্নধর্মী কাজের সংমিশ্রণ ঘটানোর চেষ্টা ছিল আমার। যার ফলে আমার প্রধান ক্রেতা মূলত নারীরা। বিশেষ করে ১৫-৪০ বছর বয়সি নারী।
নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি সাবিনার পরামর্শ, নারীরা স্বাবলম্বী হলে সবাই ভালো থাকবে। উন্নয়নশীল দেশ গড়তে আমাদের আরও নারী উদ্যোক্তা দরকার। শুরুটা ছোট থেকেই হোক। স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার সার্থকতাটাই আলাদা। আমাদের আগের প্রজন্মের নারীরা এত সুযোগ-সুবিধা পায়নি। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধাও বেশি। নারীর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো প্রয়োজন তার নিজের জন্য তো বটেই, সমাজ ও দেশের জন্য ভীষণ দরকার।
সময়ের আলো/আরএস/