প্রকাশ: বুধবার, ২৮ মে, ২০২৫, ১১:৫৬ পিএম
বাংলাদেশ ডায়লগের সেমিনারে বক্তারা। ছবি : সময়ের আলোমানবিক করিডোর নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে তা বাংলাদেশকে যুদ্ধাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ ডায়লগ আয়োজিত একটি সেমিনারের বক্তারা।
তারা বলেন, মানবিক করিডোরের সঙ্গে সামরিক বাহিনী জড়িত। জনগণের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করে পার্লামেন্ট। করিডোর জাতীয় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নিলে সেটি হবে আত্মঘাতী। কারণ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোনোভাবেই সামরিক পদক্ষেপের দিকে যাওয়া উচিত নয়। এতে হয়তো একটি পক্ষকে খুশি করতে পারব। এখানে মানবিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। তবে নিজের দেশকে বিপদে ফেলে আরেকটি দেশকে সহায়তা করবেন, এটি তো জাতি মেনে নিতে পারে না। এখানে জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত। মানবিক করিডোর দিলে সেখানে সহায়তা নিয়ে যাবে। তখন তো হামলা হতে পারে। এখানে আমাদের সামরিক বাহিনীর জড়িত হয়ে পড়বে। তাই এই মানবিক করিডোরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা দেশকে যুদ্ধাবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।
বুধবার (২৮ মে) রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে দ্য বাংলাদেশ ডায়লগ আয়োজিত ‘অন দ্য ডিপ্লোম্যাটিক ফ্রন্ট : সাউথ এশিয়া অ্যান্ড বিঅ্যান্ড’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
নুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দ্য বাংলাদেশ ডায়লগের পরিচালক সাইফ রুবাব। অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক অ্যাম্বাসেডর এম. হুমায়ুন কবির, দ্য রোড টু ডেমোক্রেসির এক্সিকিউটিভ এডিটর সাইমুম পারভেজ, স্বাধীন সাংবাদিক ও শিক্ষক আসিফ বিন আলী। সেমিনারে মিডিয়া পার্টনার ছিল দৈনিক সময়ের আলো ও সারাবাংলাডটনেট।
বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও সাবেক অ্যাম্বাসেডর এম. হুমায়ুন কবির বলেন, গত ১৫ বছর বাংলাদেশে একটা ইন্ডিয়া পলিসি ছিল। যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে : ১. আইডেন্টিটি ২. দেশের নিরাপত্তা ও ৩. অর্থনীতি।
গত ১৫ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ সহায়তা করেছে। যদিও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা যে নিরাপত্তা চাই, সেখানে খানিকটা অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে হয়েছে।
২০০১ সালের পরে পৃথিবীতে যে বিবর্তন হয়েছে, সেখানে খানিকটা দুর্বলতা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিতে বৈশ্বিকভাবে আইডেন্টিটিতে একটা পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশেও এটি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। আমরা এতদিন পর্যন্ত যে নীতিমালা মেনে চলেছি, এর বাইরে কি কোনো কিছু দাঁড় করাতে পেরেছি? আমাদের এখানে দুর্বলতা আছে। এখন আমাদের আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটাকে বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। নীতিগতভাবে রাজনৈতিক মত এবং জনগণের সঙ্গে সংহতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। বাংলাদেশের যে নীতি এখন চলছে, সেটি ইতিবাচক। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পেতে ভারত ও চীনকেই পাবেন দ্রুত। অন্য দেশ অত সহজে আসতে চায় না।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে এম. হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমারে তাদের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিবর্তন হয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সমস্যা সমাধান না হলে আমরা যত চেষ্টাই করি এই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশে তারুণ্যের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। মিয়ানমারে এরকম একটা কিছু হয়তো হবে। তারপরে হয়তো এর সমাধান হতে পারে। আমাদের সক্ষমতার ওপর খেয়াল রাখতে হবে। মিয়ানমারে যে পরিবর্তন হচ্ছে তার সঙ্গে কি আমাদের কোনো সম্পর্ক আছে? আমরা শুধু বাংলাদেশিরা এই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে পারব না। এখানে চীন ও ভারতসহ অন্যান্য দেশেরও রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে হবে। আরাকান আর্মি স্বাধীনতা চাইছে না, তারা বড়জোর কনফেডারেশন চাইছে। মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মিকে আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভারত ও চীনকে এখানে ভূমিকা রাখতে হবে। সেখানে আরাকান আর্মি, মিয়ানমার সরকার, চীন ও ভারতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু বাংলাদেশে আলোচনা করে এর সমাধান সম্ভব নয়। তা হলেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে, তবে খুব চ্যালেঞ্জিং।
সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, সম্মান, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন তিনটা জিনিস একসঙ্গে থাকতে হবে। আমরা একটা যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আছি। আমাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা করা দরকার। ভারতের কেউ কেউ লালমনিরহাটে বিমানবন্দর করার ক্ষেত্রে বলেছে সেটি গুঁড়িয়ে দেবে। সে ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সেখানে কূটনীতি নীতিমালা দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। ২০৫০ সালে চীন হবে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ। এরপরে ভারত। সেখানে আমি কোথায় আছি। আমি যেখানে সামরিক বাহিনী পাচ্ছি না, আমি অর্থনৈতিকভাবেও দুর্বল। আমি যখন দুর্বল থাকি তখন আমি তাদের কাছে ভেসে যাব। আমাকে মর্যাদা নিয়ে থাকতে হবে। এখানে পেশাদার কূটনীতিক হতে হবে। বাংলাদেশের কূটনীতি কোথাও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। পররাষ্ট্রনীতি হবে প্রধান। এ জন্য কূটনীতিতে বিনিয়োগ করতে হবে। ডিফেন্সে যেমন ইনভেস্টমেন্ট করি, ডিফেন্স পলিসিতেও ইনভেস্টমেন্ট করতে হবে।
দ্য রোড টু ডেমোক্রেসির এক্সিকিউটিভ এডিটর সাইমুম পারভেজ বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছি। এই পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছে। গত ১৫ বছর বাংলাদেশে যে ধরনের কূটনৈতিক পলিসি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটি বাংলাদেশের কি না তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে পারি। যারা দূতাবাসে ছিলেন তারা কী দূতাবাসের কর্মকর্তা নাকি রাজনৈতিক দলের কর্মকর্তা সেটি নিয়ে প্রশ্ন আছে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দেখেছি, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নিয়ে কূটনীতিকরা কাজ করেছেন। সেখানে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়টি ছিল না। ৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন হয়নি, আমাদের চিন্তারও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আমাদের দেশের রাজনীতিতে পার্শ্ববর্তী কোনো রাষ্ট্র যাতে ভূমিকা রাখতে না পারে, সে বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কেউ কোনো নাক গলাতে পারবেন না। আমার দেশের ভূমি ব্যবহার করে অন্য দেশের কেউ যেন সুবিধা নিতে না পারে। যেকোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ মেনে নিতে না চাইলে, সেই দেশের পলিসি আমরা মেনে নেব না। বাইরের কোনো দেশ চাপ প্রয়োগ করলে সেটি মোকাবিলার শক্তি থাকতে হবে। আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সেখানে যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হয় সেটি খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশকে ব্যবহার করে কেউ ফায়দা লুটে নেবে সেটি হতে দিতে পারি না। আমাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখব।
সাইমুম পারভেজ বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, যদি রাষ্ট্রের ইচ্ছে থাকে। তাই দেশে রাজনৈতিক সরকার থাকা দরকার। আমরা লক্ষ করছি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দীর্ঘদিন থাকার ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি মানবিক করিডোর নিয়ে কথা উঠেছে। মানবিক করিডোর দিলে দেশের ক্ষতি ছাড়া আর কিছু হবে না। আর মানবিক করিডোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। রোহিঙ্গা সমস্যা কোনোভাবেই সামরিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এখানে জাতীয় ও নিরাপত্তা স্বার্থ জড়িত। আমরা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু ভারত তো জায়গা দেয়নি। চীন রোহিঙ্গাদের জায়গা দেয়নি। কিন্তু আমাদেরই কেন সাহায্য করতে হবে। আমাদেরই কেন যুদ্ধ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের আমরা সাহায্য করব। যত দ্রুত সম্ভব একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা উচিত। এর মধ্য দিয়ে একটি কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।
স্বাধীন সাংবাদিক ও শিক্ষক আসিফ বিন আলী বলেন, আমাদের দেশে কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কী করবে না সেটি বাইরের দেশের লোকজন এসে বলে দেবে, সেটি হতে পারে না। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে কোনো পলিসি নেই। আমাদের বড় শক্তি ন্যাশনাল আইডেন্টিটি। সাউথ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আমরা পলিসি নিয়ে চিন্তা করি না। ৪৭ সাল পর্যন্ত যে বাউন্ডারি ছিল, পরবর্তীকালে ৭১ সালে বাউন্ডারি পরিবর্তন হয়েছে।
জেডও/