বয়স যত বাড়ছে, শরীর ততই মনে করিয়ে দেয়—‘ভাই, তুমি আর কিশোর নও।’ হাঁটুতে টনটন ব্যথা, প্রেসক্রিপশনে হালকা-গুরুতর ওষুধ, রাতে ঘুম আসতে দেরি—সবকিছুই বলে দেয় বয়স বাড়ছে। বুড়ো হওয়ার দিকে প্রতিদিন একটু একটু করে এগোচ্ছি। কিন্তু আশ্চর্য হলো, মনটা একেবারেই বুড়ো হয় না। চোখের ভেতর আজও সেই পুরোনো ঝিলিক। আর সেই কৈশোরের ঝিলিকই অনেক সময় আমাদের টেনে নিয়ে যায় টিভির পর্দার দিকে। কাজের ক্লান্তি, জীবনের দুশ্চিন্তার ফাঁক গলে একটু বিনোদনের খোঁজে আমরা টিভির সামনে বসি। সেখানে গল্প যেমন থাকে, তেমনই থাকে চরিত্রদের চোখে-মুখে ছড়ানো রঙিন আলো। কখনও মনে হয়, ওই আলো আমাদের পুরোনো দিনগুলোকে আবার টেনে আনে।
আশি-নব্বইয়ের দশকে আমরা যাদের দেখে বড় হয়েছি—অপি করিম, মিতা রহমান, সুবর্ণা মুস্তাফা বা শম্পা রেজা —তারাই তখনকার আমার কাছে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা। তাদের নাটক মানেই আমার টিনএজ হৃদয়ে ঝড়। কিন্তু এখনকার দিনে টিভি খুললেই নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের আরও ঝলমলে রূপ দেখি আর মাঝে মাঝে অজান্তে মুখ ফসকে যায়—‘আহা, কী সুন্দর লাগছে!’
এই একটা লাইন বেরোতেই পাশে বসা স্ত্রী চোখ পাকায়—তার ঝাড়ি ‘অসভ্য বেটা, বুড়া শয়তান—যত বুড়া হচ্ছে, ততই শয়তান হইছে। নিজের মেয়ের বয়সী মেয়েদের দিকে এইভাবে তাকাও? লজ্জা বলে কিছু আছে নাকি?’
আরেকদিন বলে, ‘নাটক দেখছো, নাকি সময়ের আয়নায় নিজের কৈশোরের ছায়া খুঁজছো?’
কখনও তো নির্দয় কটাক্ষ ছুঁড়ে দেয়—‘তোমাদের মতো বুড়োদের চোখ সবচেয়ে বিপজ্জনক—বাইরে ভদ্রলোক, ভেতরে লুকানো শয়তান!’
আমি বা আমার মতো অনেকেই হয়তো তখন শান্ত গলায় ব্যাখ্যা দিই, ‘শোনো, এটা appreciation। সৌন্দর্যকে সুন্দর বলা অপরাধ নয়। মনের তো বয়স হয় না!’
কিন্তু শেষমেশ ঝগড়ার পর যা হয়—আমরা বা আমাদের মতো অনেকেই একসময় টিভি বন্ধ করে বসে থাকি। নাটকের সৌন্দর্য, পর্দার রঙ, সবকিছুরই মুড হারিয়ে যায়। মনে হয়, সৌন্দর্যের আলো দেখার আগেই ঘরের ভেতর ঝড় বয়ে গেল!
আমাদের তখনো দ্বিধা—আমরা কি সত্যিই অন্যায় করছি? নতুন প্রজন্মের মেয়েরা সুন্দর—এটা কি শুধু আমাদের চোখের ভুল? নাকি আধুনিক সাজসজ্জা, ফ্যাশন, ক্যামেরা, মেকআপের কারণে তারা এত ঝলমলে? কে জানে! কিন্তু সত্যিটা হলো—তারা সত্যিই সুন্দর।
সব ঝগড়াঝাঁটির পরও মনে মনে একটা কথাই বাজে—‘নতুন প্রজন্ম যতই ঝলমল করুক, অপি করিম এখনো আমার কাছে নম্বর ওয়ান। তার হাসি আজও কেউ নিতে পারেনি।’
তখন রুমা আবার ব্যঙ্গ রাগী গলায় করে বলে, ‘যাও, ধরতে পারলে ধরো গিয়ে!’
আমি হেসে উত্তর দিতে পারি হয়তো—‘এটা তো ধরাধরির ব্যাপার না। কাউকে ভালো লাগলেই ধরতে হবে, ছুঁতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। যেমন আকাশে চাঁদ দেখি, ভালো লাগে, কিন্তু তাকে ধরতে যাই না। নদীর জলে সূর্যের প্রতিফলন দেখি, মনে শান্তি লাগে, কিন্তু জলে হাত ডুবিয়ে আলোকে ধরতে পারি না। কোকিলের গানের তালে বাগানে ফুল উঠে, আমি থমকে দাঁড়াই—ফুলটাকে কেটে নেব কিনা সেটা না ভাবেই তার সৌন্দর্য গ্রহণ করি। সৌন্দর্য অনেক সময় চোখে ভরে নিলেই যথেষ্ট, তাকে ছোঁয়া বা দখল করা নয়।’
তবুও কোথাও একটাই নিখাদ সত্য—শরীর হয়তো বার্ধক্যের ছাপ নিয়ে যায়, চুলে ছোপ পড়ে, হাঁটাচলার গতি কমে, কিন্তু মনের ভেতর যে তরুণটা ছিল, সে রইল। যৌবনে আমরা সেই সৌন্দর্যকে ছোঁয়ার জন্য দৌড়িয়েছি, আজ হয়তো শুধু দূর থেকে তাকিয়ে ভালোবাসি; পেছনে হাহাকার আছে, সামনে স্মৃতি। হয়তো এটাই বুড়ো বয়সের মিষ্টি দুঃখ–হাতে আর শক্তি নেই, কিন্তু চোখ, মন আর প্রেমের টান আজও একই।
শেষ কথা, সময় আমাদের দেহ থেকে যৌবন কেড়ে নিলে কী গেল? শুধু দেহ; মনের কাছে বসন্ত এখনো আছে। তাই বলি, যৌবন চলে যেতে পারে, কিন্তু মনের তারুণ্য যদি থেকে যায়, তাহলে দূর থেকে একটিবার ‘বাহ’ বলে ফেলা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত কেন?
স্ত্রীর খোঁচার ভেতরেও ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে—তিক্ত হলেও সেই স্বাদেই সংসার টিকে যায়।
আরআর