বিচিত্র বিষয় নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্য। জীবনকে অঙ্কন করতে গিয়ে কত কিছুই উঠে এসেছে সেখানে। কত মাড়ি ও মড়ক, প্লাবন, দুর্যোগের চিত্র আমরা দেখতে পাই এখানে। বিশ্ব সাহিত্য তো আরও বৈচিত্র্যে ভরপুর। রোগকে কেন্দ্র করেও রচিত হয়েছে মহৎ সাহিত্য। যেমন ‘প্লেগ’।
বাংলা সাহিত্যে অসুখ-বিসুখ, রোগ-তাপকে কেন্দ্র করে বা কোনো দুর্যোগকে বিষয় করে খুব বেশি সাহিত্য রচিত হয়নি। এর একটা কারণ হতে পারে রোগ-তাপ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, তাকে আলাদা করে বিষয় করে তোলার কথা অনেকেরই মনে হয়নি কিংবা জীবনের কথা বলতে গেলে এসব সমস্যা এমনিতেই উঠে আসে, তাই তাকে বিশেষভাবে বিশেষায়িত করার কথা কারও মাথায় হয়তো আসেনি।
নইলে উলা উঠা বসন্ত রোগ নিয়ে আলাদাভাবে হয়তো উপন্যাস লেখা হতো। তা হয়নি। যদিও অনেক উপন্যাসেই বসন্ত রোগ তার বীভৎসতা নিয়ে দেখা দিয়েছে। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে সেই নদীর তীরে পড়ে থাকা সদ্যমৃত বাচ্চাটির কথা কেউ কি ভুলতে পারবে, শিয়ালের মুখ থেকে যাকে শ্রীকান্ত এবং ইন্দ্র তুলে নিয়ে মাঝ নদীতে ভাসিয়ে দেয়? কিন্তু জীবনের অন্যান্য ঘটনার মতোই এসব যেন স্বাভাবিক। আসবে। চলে যাবে। যারা বেঁচে থাকবে, সংগ্রাম করে তাদের এগিয়ে যেতে হবে সামনে। এসব নিয়ে বসে থাকলে চলবে না।
২.
প্রকৃতির সব দুর্যোগের মধ্য থেকে ভূমিকম্পের চারিত্র্য সবচেয়ে আলাদা। কেননা, কখন ভূমিকম্প আসতে পারে, তার কোনো পূর্ব লক্ষণ আবিষ্কার করা এখনও সম্ভব হয়নি। যেকোনো সময় এসে কাঁপিয়ে দিয়ে যেতে পারে ভূকম্পন। আমূল বদলে দিয়ে যেতে পারে সবকিছু। তা ছাড়া ভূমিকম্প এতটাই আকস্মিক যে, বুঝে উঠতেও সময় লাগে তা। রবি ঠাকুরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘প্রথম আলো’তে দেখি তেমনই এক চিত্র। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘...মন দিয়ে শুনতে শুনতে হঠাৎ অবনের হাতের কাপ চলতে উঠে পেল খানিকটা চা। অবন ভাবল, এ কী তার হাত কাঁপল কেন? আরও কাঁপছে, কাপটা ধরে রাখা যাচ্ছে না। তারপর দেখা গেল সবারই হাতের কাপে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে।’
ভূমিকম্প শুরু হলে হঠাৎ করে সবাই বুঝতে পারে না। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা আশপাশের কেউ-ই তা বুঝতে পারেনি। তাই ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পর অবন ঠাকুর যখন চায়ে চুমুক দিচ্ছিল, তখন আবার ভূমিকম্প শুরু হয়। যেন পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘...বিনা মেঘে যেন বজ্রপাত শুরু হলো। চতুর্দিকে বোমা ফাটার মতো বিকট শব্দ। কেউ বাজি পোড়াচ্ছে, না কামান দাগছে? হাতিশালের হাতি আর ঘোড়াশালের ঘোড়াগুলো আর্তচিৎকার শুরু করেছে, মণ্ডপটা দুলছে, মাটি দুলছে, শত শত শাঁখ বেজে উঠল।
এটা যে ভূমিকম্প তা বুঝতে একটু সময় লেগেছিল। তারপরেই দিগিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়। ভূমিকম্প হচ্ছে, এটা বুঝতে যেন কিছুটা সময় লাগেই- তা আমরা প্রেমেন্দ্র মিত্র বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দুজনের ছোট গল্পেই দেখি। দুজনের ছোট গল্পের নামই ‘ভূমিকম্প’। সেই গল্প নিয়ে কথা বলার আগে আমরা ‘প্রথম আলো’ নিয়ে আর দুটো কথা বলব। গত শতকে বাংলাদেশ এবং আশপাশের রাজ্যগুলোতে সবচেয়ে যে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তারই চিত্র এঁকেছেন এখানে। স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প ছিল সেটি। ভূমিকম্প তাণ্ডব ঘটিয়ে গিয়েছিল। হতাহতের পাশাপাশি অনেক মানুষকে গৃহচ্যুত হতে হয়েছিল সেদিন। রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংয়ের বহু বাড়ি একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল, নদীর পানি ফুলে উঠে প্লাবিত করেছিল অনেক গ্রাম। যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। হাজার হাজার গরু-মহিষ-ছাগলের মৃতদেহ পচে গন্ধ ছড়াচ্ছিল এবং ‘আফটার শক’ হিসেবে মাঝেমধ্যেই কেঁপে উঠছিল ভূমি।
যেদিন ভূমিকম্প হলো, সেদিন সন্ধ্যে ৭টায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক কবি-শিল্পী-গায়কেরই নিমন্ত্রণ ছিল দিঘাপতিয়ার রাজবাড়ীতে। ভূমিকম্পের ফলে সেই রাজবাড়ীর প্রাসাদ সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সুনীল লিখেছেন, ‘ভূমিকম্প যদি ৫টার বদলে ৭টায় শুরু হতো, তা হলে বাংলা মায়ের বহু কৃতী সন্তান, প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ, কত কবি-শিল্পী-গায়ক সব একসঙ্গে শেষ হয়ে যেত!’
৩.
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভূমিকম্প’ গল্পে একটা মানুষ কতটুকু আতঙ্কিত হতে পারে, তারই চিত্র আমরা দেখতে পাই। শুধু তাই নয়, ভূমিকম্পের প্রভাব কেবল প্রকৃতি নয়, মানুষকেও কী রকম প্রভাবিত করে, তারই ছবি এঁকেছেন মানিক এই গল্পে। গল্পের শুরুর বাক্যে মানিক লিখেছেন, ‘হঠাৎ বাসুকি একবার মাথা নাড়িলেন।’ হিন্দু পুরাণ মতে বাসুকি নাগ মাথা নাড়ার কারণে পৃথিবী ভূমিকম্প হয়। তবে অনেকে বলেন, পৃথিবীর ভার যে নাগের মাথায় ওপর ন্যস্ত, তার নাম অনন্ত নাগ বা শেষ নাগ। বাসুকি নাগ শিবের গলায় প্যাঁচানো অবস্থায় থাকে। অনন্ত নাগ হচ্ছে বাসুকির বড় ভাই। ভিন্ন মতও আছে, আমরা আপাতত সেদিকে যাচ্ছি না। সাধারণত গল্পে-উপন্যাসে বাসুকির মাথা নাড়া কারণেই ভূমিকম্পের উৎপত্তির দেখানো হয়েছে।
যাই হোক, এক বাক্যের প্রথম স্তবকের পরে দ্বিতীয় স্তবকেই মানিক আমাদের জানাচ্ছেন, প্রসন্ন অঘোরে ঘুমিয়েছিল। গতকাল তার ভালো ঘুম হয়নি। আজ রাত ৯টা থেকেই তার চোখ লেগে আসছিল। তাই খাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু মাঝরাতে চাঁদ যখন ডুবে গেছে, তখন এই কাণ্ড ঘটে। চৌকির দুলুনি, টিনের চালের ঝনঝন শব্দ, শঙ্খের আর্তনাদে তার ঘুম ভাঙে। ভয়ে মশারি থেকে বেরিয়ে সে পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পালাতে চাইলেই পালানো যায় না, অন্তত মাথা যদি বিপদে ঠান্ডা না রাখা যায়। প্রসন্নর হলো সেই দশা। সে ঘর থেকে পালাতে গিয়ে দরজা খুলতে পেল না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘প্রসন্ন দরজা খুঁজিয়া পাইল না। তাহার ধারণামত যেখানে দরজা থাকার কথা, সেখানটা হাতড়াইয়া শুধু দরমার বেড়াই তাহার হাতে ঠেকিল। আজ এই একান্ত অসময়ে সে দরজার অবস্থান ভুলিয়া গিয়াছে।’ যদিও অনেক চেষ্টার পরে মায়ের হাতের বালার ঠকঠক শুনে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে কিন্তু তার মাথায় সমস্যা দেখা দেয় এবং প্রায় দুই বছর পর্যন্ত সেই সমস্যা তার ছিল।
প্রেমেন্দ মিত্রের ‘ভূমিকম্প’ গল্পে তিনি যদিও ভূমিকম্পের একটি বিধ্বংসী রূপের বর্ণনা করেছেন, তারপরেও বলতে হয়, শশাঙ্ক এবং মালতী দাম্পত্য জীবনে যে ফাটল ধরছিল, ভূমিকম্প যেন তা-ই জোড়া লাগাতে তাদের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে উপস্থিত হয়েছিল।
জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির ‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের গল্পগুলোতেও ভূমিকম্পের চিত্র আমরা পাই। এই বইতে মুরুকামির ছয়টি গল্প ঠাঁই পেয়েছে। ১৯৯৫ সালে কোবেতে যে ভূমিকম্প হয়েছিল, সেই ভূমিকম্পের স্মৃতিচারণ, ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে মানুষের যে অবস্থা, অস্থিরতা- তাই এই গল্পগুলোতে ফুটে উঠেছে। কিছু গল্প বেশ ফ্যান্টাসি ঘরনার।
শিশু সাহিত্যিক মেরি পোপ অসবর্নের একটি জনপ্রিয় সিরিজের নাম হলো ‘ম্যাজিক ট্রি হাউস’। সিরিজের নাতিদীর্ঘ উপন্যাসগুলোতে দেখি জ্যাক এবং অ্যানি নামের দুই ভাই বোন মর্গ্যানের সহায়তায় ম্যাজিক ট্রি হাউসে করে বিভিন্ন দেশে, সময়ে তার ঘুরে বেড়ায়। তারা একবার ভূমিকম্প আক্রান্ত এক অঞ্চলে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেই গল্প মেরি পোপ অসবর্ন বলেছেন, ‘আর্থকোয়াক ইন দ্য আর্লি মর্নিং’ উপন্যাসে। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, ভূমিকম্প আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে এবং কীভাবে তাদের প্রতি মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। ‘আর্থকোয়াক ইন দ্য মর্নিং’ শিশু-কিশোরদের ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন এবং মানবিক করে তোলার অত্যন্ত চমৎকার এক প্রয়াস।
৪.
শেষ করার আগে একটি বইয়ের কথা না বললে হয়তো এ লেখাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে বাংলায় একমাত্র উপন্যাস ‘লীন হয়ে যায় প্রিয় নগর’। লিখেছেন শরীফ উদ্দিন সবুজ। চারিত্র্য বিশ্লেষণ করলে একে সায়েন্স ফিকশনই বলতে হবে আমাদের। কেননা, যে ভয়াবহ ভূমিকম্পের ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের আবহাওয়াবিদগণ অনেক দিন ধরে করে যাচ্ছেন, সেই উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হলে আমাদের প্রিয় ঢাকা নগরীর কী অবস্থা হতে পারে, তারই চিত্র এখানে এঁকেছেন ঔপন্যাসিক। শুধু বিধ্বস্ত নগরীর চিত্রই তিনি আঁকেননি, সেই সঙ্গে দেখিয়েছেন, আমরা কতটা বেখেয়ালি, কতটা অসচেতন হয়ে বসে আছি ভূমিকম্প বিষয়ে।
ভূমিকম্প তো ঠেকানো যাবে না, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, আমরা অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পলিথিনের যত্রতত্র ব্যবহার করে ভূমিকম্পকে কীভাবে আরও বিধ্বংসী রূপ দিচ্ছি, তারই কথা বলা হয়েছে এই উপন্যাসে। সেই সঙ্গে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কীভাবে পেতে পারি, তারই একটি নির্দেশনা দিয়েছেন শুভর বিলেতি ইঁদুর পালার মাধ্যমে। কেননা, বলা হয়ে থাকে, ভূমিকম্পের পূর্বে ইঁদুর অস্থির হয়ে পড়ে।
ভূমিকম্প এমনই এক দুর্যোগ যা কিছু মুহূর্তের মধ্যেই অনেক হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই ভূমিকম্প মোকাবিলায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত, সেই হিসাবটাই বারবার থেকে যায়।
সময়ের আলো/কেএইচও